১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কিউবা থেকে ১৪ হাজারের বেশি শিশুকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর একটি ব্যাপক কর্মসূচি পরিচালিত হয়, যা ইতিহাসে ‘অপারেশন পেদ্রো প্যান’ নামে পরিচিত। এই কর্মসূচিকে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর পেছনে সিআইএ, ক্যাথলিক চার্চ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন নথি, গবেষণা ও সাবেক অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিউবার তৎকালীন নেতা ফিদেল কাস্ত্রো শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে যাবেন—এমন গুজব পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর ফলে হাজার হাজার বাবা-মা সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেন। অনেক পরিবার ভেবেছিল, সাময়িক এই বিচ্ছেদ কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে বহু পরিবার বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন থেকে যায়; শত শত শিশু আর কখনোই তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি।

একটি ‘দানবীয় মিথ্যা’র সূচনা
১৯৬০ সালের ২৬ অক্টোবর। কিউবার উদ্দেশে সম্প্রচারিত সিআইএর নিয়ন্ত্রিত রেডিও স্টেশন ‘রেডিও সোয়ান’ একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা প্রচার শুরু করে।
সম্প্রচারে কিউবার মায়েদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল, নতুন সরকার একটি আইন করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। মায়েদের সন্তানদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে প্রচারে দাবি করা হয়, ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার ‘সর্বোচ্চ মা’ হয়ে উঠবেন এবং শিশুদের পুনঃশিক্ষার জন্য শ্রমশিবিরে পাঠানো হবে।
হন্ডুরাসের উপকূলের কাছে সোয়ান দ্বীপ থেকে সম্প্রচারিত এই রেডিও স্টেশনটি সিআইএর মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। এর কার্যক্রম পরিচালনা করতেন সিআইএ কর্মকর্তা ডেভিড অ্যাটলি ফিলিপস। লাতিন আমেরিকায় গোপন রাজনৈতিক অভিযান পরিচালনায় তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন এবং ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার বৈধ সরকার উৎখাতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রচারণা কৌশল ব্যবহারের সঙ্গে তার নাম জড়িত।
শুধু রেডিও প্রচারেই থেমে থাকেনি এই প্রচারণা। কিউবার বিভিন্ন এলাকায় একটি ভুয়া ‘Parental Authority Law’ বা ‘পিতামাতার কর্তৃত্ব আইন’ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ছাপানো ওই জাল নথিতে দাবি করা হয়, কাস্ত্রো সরকার ২০ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে নিয়ে যাবে।

সিআইএ এজেন্ট হোসে পুজালস মেদেরোস ওই নথি কিউবায় পাচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে এই জাল আইন তৈরির সঙ্গে যুক্ত সিআইএ এজেন্ট অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ ভারেলার ছেলে প্রকাশ্যে জানান, তার বাবা স্বীকার করেছিলেন যে তিনিই সেই ভুয়া আইন লেখার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। এই নথিই কিউবায় ‘পিতামাতার কর্তৃত্ব বিলুপ্ত’ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ছড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
কারা ছিলেন পরিকল্পনার নেপথ্যে?
এই পুরো কর্মকাণ্ডে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সামনে আসে।
ডেভিড অ্যাটলি ফিলিপস, সিআইএ কর্মকর্তা ও ‘বিশপ’ ছদ্মনামের ব্যক্তি, রেডিও সোয়ানের মাধ্যমে পরিচালিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন। এর আগে ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় বৈধ সরকার উৎখাতের ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মনসিনিয়র ব্রায়ান ও. ওয়ালশ, মিয়ামিভিত্তিক ক্যাথলিক ওয়েলফেয়ার ব্যুরোর প্রধান, ‘Unaccompanied Cuban Children’s Program’ বা ‘অভিভাবকহীন কিউবান শিশু কর্মসূচি’ সংগঠিত করেন। কর্মসূচিটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও সিআইএর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে পালমেটো বেতে একটি শিশু নিবাসের নাম তার নামে রাখা হয়।
লিওপোলদিনা ‘পোলিতা’ গ্রাউ, কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রামোন গ্রাউ সান মার্টিনের ভাতিজি, কিউবার ভেতরে ‘Rescate’ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। এই নেটওয়ার্ক শিশুদের দেশত্যাগ, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৩ সালে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আর্কাইভে দেওয়া বক্তব্যে গ্রাউ স্বীকার করেন বলে দাবি করা হয় যে তারা ভুয়া আইনটি ছাপিয়েছিল এবং শিশুদের কেড়ে নেওয়ার গুজব ছড়িয়ে ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি’ করেছিল।
সিআইএ এজেন্ট আন্তোনিও ভেসিয়ানাও তার স্মৃতিকথা Trained to Kill-এ ভুয়া আইন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে লিখেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি পরিচিত এক হিসাবরক্ষকের কাছে যান। ওই ব্যক্তি দুজনকে দিয়ে সরকারি নথির মতো দেখতে একটি আইন তৈরি করান। পরে হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে তা গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কিউবার রাস্তায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
১৪ হাজার ৪৮টি বিচ্ছিন্ন জীবন
১৯৬০ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬২ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত কিউবা থেকে ধারাবাহিকভাবে শিশুদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। বাবা-মায়েরা সন্তানদের অজানা ভবিষ্যতের দিকে পাঠানোর সময় বিশ্বাস করেছিলেন, এই বিচ্ছেদ সাময়িক হবে এবং খুব দ্রুত তারা আবার একত্রিত হতে পারবেন।
কিন্তু ১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের কারণে এই বিমানযাত্রা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সীমান্তও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

মোট ১৪ হাজার ৪৮ জন শিশু এই কর্মসূচির মাধ্যমে কিউবা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যায়। তাদের বয়স ছিল ৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। প্রত্যেক শিশুকে সর্বোচ্চ ১৮ কেজি ওজনের একটি স্যুটকেস নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অনেক শিশুই সঙ্গে নিয়েছিল কেবল কিছু অতিরিক্ত পোশাক।
বিমানবন্দরে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় অধিকাংশ শিশুই জানত না, তারা আবার কখনো তাদের বাবা-মাকে দেখতে পাবে কি না।
২০১১ সালে কেরা নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোসে আজেল তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। ১১ বছর বয়সে তিনি কিউবা ছেড়েছিলেন। বিমানবন্দরে তার বাবা তাকে বলেছিলেন, এই বিচ্ছেদ সাময়িক এবং শিগগিরই তারা আবার একসঙ্গে হবে। কিন্তু আজেল আর কখনো তার বাবাকে দেখতে পাননি। তার বাবা ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি কিউবাতেই মারা যান এবং জীবদ্দশায় দেশ ছাড়ার অনুমতি পাননি।
যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও শেষ হয়নি দুর্ভোগ
১৪ হাজারের বেশি শিশুর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরও তাদের অনেকের জন্য দুর্ভোগের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
মোট ১৪ হাজার ৪৮ শিশুর মধ্যে প্রায় অর্ধেক—প্রায় ৮ হাজার ৩০০ শিশু—যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আত্মীয় বা পরিচিতজন ছাড়াই পৌঁছেছিল। তাদের অনেককে ক্যাথলিক ওয়েলফেয়ার ব্যুরোর পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র ও ক্যাম্পে রাখা হয়।
শিশুদের যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫টি অঙ্গরাজ্যের ১৮৭টি শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে কিউবা থেকে একসঙ্গে আসা শিশুদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জন এ. গ্রনবেক-টেডেস্কোর ২০২২ সালের বই Operation Pedro Pan-এ বলা হয়েছে, এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। প্রশাসনিক নথিতে এমন সুপারিশও ছিল যে কোনো ছেলে শিশুর আচরণে ‘মেয়েলি বৈশিষ্ট্য’ দেখা গেলে তাকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে।
একটি ঘটনায় চার ভাইকে পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল এবং তাদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়। তাদের বাবা তখন কিউবার ভূগর্ভস্থ প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সন্তানদের লেখা বাবার কাছে চিঠিও সেন্সর করা হতো।
অনেক শিশু বছরের পর বছর পালক পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে। তাদের স্প্যানিশ ভাষা ও কিউবান সংস্কৃতি ভুলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে সাবেক অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
যৌন নির্যাতনের অভিযোগও
অপারেশন পেদ্রো প্যানের সাবেক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কয়েক ডজন বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে পুরোহিতদের হাতে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
১৯৬১ সালে ১৪ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা রবার্ট রদ্রিগেজ মনসিনিয়র ব্রায়ান ওয়ালশের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। তবে মামলাটি তামাদি আইনের কারণে খারিজ হয়ে যায়।
আরেক সাবেক অংশগ্রহণকারী, যাকে শুধু ‘আর.ই.’ আদ্যক্ষরে শনাক্ত করা হয়েছে, অভিযোগ করেন যে মিয়ামির কেন্ডাল ক্যাম্পে ফাদার জোয়াকিন গেরেরো তাকে ছয় মাস ধরে যৌন নির্যাতন ও হয়রানি করেছিলেন।
সান সেন্টিনেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ভুক্তভোগী আদালতে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য যাকে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তিই তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল।
বিচ্ছেদ যখন স্থায়ী হয়ে গেল
অপারেশন পেদ্রো প্যান ১৯৬২ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে আসা হাজার হাজার শিশুর পরিবারে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রায় ৪ হাজার শিশু যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যায় এবং তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকে। অধিকাংশ পরিবার ১৯৬৫ সালে শুরু হওয়া ‘ফ্রিডম ফ্লাইটস’-এর মাধ্যমে পুনর্মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়।
তবে সবার ভাগ্যে পুনর্মিলন জোটেনি। প্রায় ৪২০ শিশু আর কখনো তাদের বাবা-মাকে দেখতে পায়নি।
অপারেশন পেদ্রো প্যান তাই কেবল একটি শরণার্থী বা শিশু স্থানান্তর কর্মসূচির ইতিহাস নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন রাজনৈতিক প্রচারণা, গুজব, গোয়েন্দা তৎপরতা ও মানবিক সহায়তার কাঠামো একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে হাজার হাজার পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়।
যে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিরাপদে রাখার আশায় তাদের অচেনা দেশে পাঠিয়েছিলেন, তাদের অনেকের জন্য সেই সাময়িক বিদায়ই শেষ বিদায়ে পরিণত হয়।
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান