আয়াতুল্লাহ খোমেনি
বিপ্লবের অগ্নিপুরুষ ও ইরানের আধ্যাত্মিক বলয়
ইসলামী বিপ্লব, রাষ্ট্রদর্শন, সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় মেলবন্ধন এবং এক যুগান্তকারী উত্তরাধিকার
ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে এয়ার ফ্রান্সের বিমানে ইরানে প্রত্যাবর্তনের পথে খোমেনি। চারপাশে তরুণ ধর্মগুরুরা। এই ফ্লাইটটিকে ইতিহাসবিদরা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম পরিবর্তনকারী যাত্রা হিসেবে গণ্য করেন।
বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা সমকালীন বিশ্বকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে, ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামী বিপ্লব তার মধ্যে অগ্রগণ্য। আর এই বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক অসামান্য মানুষ — আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি। ১৯০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইরানের খোমেইন শহরে জন্মগ্রহণকারী এই ধর্মীয় পণ্ডিত কেবল একটি সরকারের পতন ঘটাননি; বরং তিনি রাষ্ট্র, ধর্ম ও সমাজের মধ্যে এমন এক অভূতপূর্ব সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যা আধুনিক ইতিহাসে তুলনারহিত।
সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য
- জন্ম
- ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯০২, খোমেইন, ইরান
- মৃত্যু
- ৩ জুন ১৯৮৯, তেহরান (বয়স ৮৯)
- ক্ষমতায়
- ১৯৭৯–১৯৮৯ (সর্বোচ্চ নেতা)
- মূল তত্ত্ব
- ভেলায়েতে ফকিহ
- নির্বাসন
- তুরস্ক → নাজাফ (ইরাক) → নউফলে-লো-শাতো (ফ্রান্স)
- মৃত্যুর কারণ
- ১০ দিনে ৫টি হার্ট অ্যাটাক
প্রথম পর্বভেলায়েতে ফকিহ — একটি বৈপ্লবিক রাষ্ট্রদর্শন
খোমেনির রাজনৈতিক দর্শনের মূল স্তম্ভ ছিল ‘ভেলায়েতে ফকিহ’ বা ফকিহের অভিভাবকত্বের তত্ত্ব। এই মতবাদ অনুযায়ী, ইমাম গায়েব বা লুক্কায়িত ইমামের অনুপস্থিতিতে একজন যোগ্য ইসলামী আইনবিদই রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যায্য অধিকারী। এটি শুধু একটি ধর্মতাত্ত্বিক অনুমান ছিল না — এটি ছিল এক বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি।
ইসলামী সরকার মানে ফকিহের শাসন — যেখানে ঐশী বিধান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা একই সত্তায় মিলিত হয়।
— খোমেনির ‘ভেলায়েতে ফকিহ’ গ্রন্থ থেকে
ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বেশিরভাগ সময়ই আলাদা সত্তা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। খোমেনি প্রথমবারের মতো এই দুই ধারাকে একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একীভূত করলেন। ১৯৭৯ সালে প্রণীত ইরানের সংবিধানে এই তত্ত্ব সর্বোচ্চ আইনি মর্যাদা পায়, যা আজও বলবৎ।
দ্বিতীয় পর্বনির্বাসন থেকে বিপ্লব — ক্যাসেট টেপের রাজনীতি
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামক পশ্চিমীকরণ প্রকল্পটি বহিরাবরণে আধুনিক হলেও অভ্যন্তরে ছিল গভীরভাবে স্বৈরতান্ত্রিক। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ওয়াক্ফ সম্পত্তি ও ধর্মগুরুদের সামাজিক প্রভাবকে সংকুচিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে শাহের বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার ও নির্বাসন — এই কঠিন পথ পেরিয়েও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি।
নির্বাসনে — তুরস্ক, ইরাকের নাজাফ, এবং সবশেষে ফ্রান্সের নউফলে-লো-শাতোতে — খোমেনি তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তাকে আরও শাণিত করেছিলেন। ক্যাসেট টেপে রেকর্ড করা তাঁর বক্তৃতা ইরানের মসজিদে মসজিদে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপকে পাশ কাটানো এক অভূতপূর্ব যোগাযোগ কৌশল — ইতিহাসবিদরা একে ‘ক্যাসেট বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেন।
তৃতীয় পর্ব১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ — প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য
পনেরো বছরের নির্বাসন শেষে এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমানে যখন খোমেনি তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করলেন, সেদিন রাস্তায় নেমেছিল অনুমানিক পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ। একজন সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ইরানে ফিরে আপনার অনুভূতি কী?” খোমেনির উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত ও শীতল: “কিছু না।” এই একটি উত্তরেই তাঁর চরিত্রের গভীরতা স্পষ্ট — এটি দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল এক অটল দৃঢ়তার প্রকাশ যা ব্যক্তিগত আবেগকে ঐতিহাসিক মিশনের নিচে চাপা দিয়েছিল।
এয়ার ফ্রান্সের সেই ফ্লাইটে যখন তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন, নিচে দেখলেন আলোর সমুদ্র — লক্ষ মশাল জ্বলছে, লক্ষ মানুষ অপেক্ষা করছে। বিশ্বের সামনে তখন উন্মোচিত হল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।
চতুর্থ পর্বকারবালার পুনর্ব্যাখ্যা — আধ্যাত্মিক বলয়ের নির্মাণ
পারসি সংস্কৃতির গভীরে শিয়া ইসলামের যে ঐতিহ্য প্রোথিত — ইমাম হোসেনের কারবালার স্মৃতি, আশুরার শোকাচার, জিয়ারতের পরম্পরা — খোমেনি এই সবকিছুকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তরিত করলেন। কারবালার শাহাদাত কেবল অতীতের ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; তাঁর ব্যাখ্যায় তা হয়ে উঠল প্রতিটি যুগে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক।
কোম শহরকে তিনি আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন। এখানকার হাওজায়ে ইলমিয়্যা বা ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠল নতুন রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। মসজিদ ও হোসেইনিয়্যাগুলো হল জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু — উপাসনা, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংগঠনের মিলনক্ষেত্র।
পঞ্চম পর্বআশুরা থেকে রাষ্ট্র — ধর্মীয় সংস্কৃতির রাজনৈতিক রূপান্তর
শিয়া ইসলামের আশুরা পালন ইরানে সবসময়ই ছিল গভীর সামাজিক অনুষ্ঠান। কিন্তু খোমেনির নেতৃত্বে এই শোকানুষ্ঠান একটি নতুন মাত্রা পেল। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে আশুরার মিছিলগুলো পরিণত হল বিশালতম রাজনৈতিক প্রতিবাদে — পুরো ইরান জুড়ে কোটি মানুষ রাস্তায় নামল শাহবিরোধী স্লোগান দিয়ে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সুরক্ষাকবচ ব্যবহার করে একটি গণআন্দোলন গড়ে তোলার এই কৌশল ছিল অত্যন্ত চতুর ও কার্যকর।
বিপ্লবের পর সরকারিভাবে আশুরা, ইমামদের জন্মবার্ষিকী ও শাহাদাত দিবসগুলো জাতীয় ছুটিতে পরিণত হল। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সম্প্রচার, পাঠ্যক্রমে ইসলামী নীতিশাস্ত্রের সংযোজন, সরকারি ভবনে ইসলামী স্থাপত্যের পুনরুজ্জীবন — এই সবকিছু মিলিয়ে ইরানীদের দৈনন্দিন জীবন রাষ্ট্রের মতাদর্শের সঙ্গে একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ল।
ষষ্ঠ পর্বইরান-ইরাক যুদ্ধ ও ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’র আখ্যান
১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক যখন ইরান আক্রমণ করল, খোমেনি এই যুদ্ধকে কেবল ভূখণ্ড রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করলেন না। তিনি একে ‘দিফাআয়ে মোক্কাদ্দাস’ বা পবিত্র প্রতিরক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করলেন — কারবালার চেতনার আধুনিক পুনরাবৃত্তি। এই আখ্যান লক্ষ লক্ষ তরুণ ইরানীকে স্বেচ্ছায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে অনুপ্রাণিত করেছিল। আট বছরের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় পাঁচ লক্ষ ইরানী প্রাণ হারান, কিন্তু এই অভিজ্ঞতা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সামাজিক পরিচয়কে আরও গভীরে প্রোথিত করে দেয়।
যুদ্ধের শহীদরা হয়ে উঠলেন জাতীয় বীর, তাঁদের সমাধিগুলো পরিণত হল তীর্থক্ষেত্রে। শাহাদাতের সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেল।
সপ্তম পর্ববৈপ্লবিক টাইমলাইন
শাহের ‘শ্বেত বিপ্লব’-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বক্তব্য; গ্রেপ্তার ও নির্বাসন শুরু।
নাজাফ থেকে ভেলায়েতে ফকিহ তত্ত্বের বিকাশ; ক্যাসেট বিপ্লব চলমান।
আশুরার মিছিল বিশাল রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপান্তরিত; শাহের পতন ত্বরান্বিত।
ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন; পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের অভ্যর্থনা।
গণভোটে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা; বিশ্বের প্রথম থিওক্রেটিক রিপাবলিক।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ; ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’র আখ্যান নির্মাণ।
তেহরানে প্রয়াণ; এক কোটিরও বেশি মানুষের শেষ যাত্রায় উপস্থিতি।
অষ্টম পর্বউত্তরাধিকার — বিতর্ক ও ইতিহাসের মূল্যায়ন
আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে নিয়ে মূল্যায়ন একরৈখিক নয় এবং কখনও ছিলও না। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুসলিম বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে পশ্চিমা চাপের সামনে মাথা নত না করেও টিকে থাকা সম্ভব। সমালোচকদের কাছে তিনি একটি নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদের প্রতিষ্ঠাতা, যেখানে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছিল।
কিন্তু যে বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই, তা হল তাঁর অতুলনীয় ঐতিহাসিক প্রভাব। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আধুনিক বিশ্বে ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত আস্থার বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখার পশ্চিমা ধারণাটি সর্বজনীন নয়। ইরানের লক্ষ কণ্ঠের জয়ধ্বনিতে তিনি দেখিয়েছিলেন — আধ্যাত্মিকতা ও রাজনীতির মেলবন্ধনে একটি জাতি কীভাবে নতুন করে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। সেই সংজ্ঞার রেখা আজও ইরানের সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীরে অঙ্কিত।
৩ জুন ১৯৮৯-এ তেহরানে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পর জানাজায় উপস্থিত এক কোটিরও বেশি মানুষের জনসমুদ্র এক যুগান্তকারী আধ্যাত্মিক নেতা ও তাঁর মতাদর্শকে সম্মিলিতভাবে শেষ বিদায় জানিয়েছিল।
রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি
(১৯০২–১৯৮৯)
ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা
মৃত্যুবার্ষিকী: ৩ জুন