মুসলিম পোর্ট

দীর্ঘদিনের খরায় ভুগতে থাকা ইরানে যখন হঠাৎ বৃষ্টি ও তুষারপাত দেখা যাচ্ছে, তখন আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অনেকেই দাবি করছেন, চলমান মার্কিন-ইরান  সংকটে আরব আমিরাতের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ইরানের হামলার পর ইরান, ইরাক ও জর্ডানে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। তাদের দাবি- “বৃষ্টির চোরেরা” আর মেঘ আটকে রাখতে পারছে না।

এই ধরনের ধারণা ইরানের সামরিক মহলে আগে থেকেই প্রচলিত একটি অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে বহুদিন ধরে বলা হয়, শত্রুরা ইরানের বিরুদ্ধে “আবহাওয়া যুদ্ধ” চালাতে পারে।

পারস্য উপসাগরের বিশেষ ভৌগোলিক বাস্তবতা:

আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্রতায় ভরা মেঘ সাধারণত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে আসে। এই মেঘগুলো অনেক সময় আরব আমিরাতের অঞ্চলের ওপর দিয়ে এগিয়ে ইরানের দিকে যায়। এরপর ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালায় ধাক্কা খেয়ে উপরে উঠে এবং ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়।

কিন্তু ২০১৮ সালে ইরান ভয়াবহ খরার মুখোমুখি হয়। তখন ইরানের সিভিল ডিফেন্স অর্গানাইজেশনের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম-রেজা জালালি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ও একটি প্রতিবেশী দেশ ইরানের এই মেঘ “চুরি” করছে।

অনেকের ধারণা ছিল, তিনি যে প্রতিবেশী দেশের কথা বলেছেন সেটি আরব আমিরাত, কারণ দেশটি আবহাওয়া পরিবর্তন প্রযুক্তিতে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

মেঘ কি সত্যিই “চুরি” করা যায়?

দখলদার ইসরায়েল ১৯৬০-এর দশক থেকেই বিমান ব্যবহার করে ক্লাউড সিডিং বা কৃত্রিমভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছিল। এই পদ্ধতিতে মেঘের মধ্যে সিলভার আয়োডাইডের মতো কণা ছড়ানো হয়, যা জলীয় বাষ্পকে একত্রিত হতে সাহায্য করে।

এ নিয়ে একসময় ধারণা ছড়িয়েছিল যে, ইসরায়েল হয়তো জর্ডান বা সিরিয়ার দিকে যাওয়া মেঘ আটকে দিচ্ছে।

তবে পরে ইসরায়েলের এই কর্মসূচি বন্ধ করা হয়, কারণ দেখা যায় এই প্রযুক্তিতে বৃষ্টি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১.৮ শতাংশ, যা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে বিবেচিত হয়নি।

এরপর ১৯৯০-এর দশকে আরব আমিরাত ও ইসরায়েল “বায়ু থেকে পানি” প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতা শুরু করে।

২০২০ সালের শেষ দিকে আরব আমিরাতের আল দাহরা হোল্ডিং এবং ইসরায়েলি কোম্পানি ওয়াটারজেন-এর মধ্যে বায়ু থেকে পানি সংগ্রহ প্রযুক্তি নিয়ে বড় চুক্তি হয়। এই সহযোগিতা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর আরও এগিয়ে যায়।

পরবর্তীতে “ডেজার্ট-টেক” বা মরুভূমি প্রযুক্তি সহযোগিতা গড়ে ওঠে, যেখানে পানির সংকট মোকাবিলায় ক্লাউড সিডিং, বায়ু থেকে পানি সংগ্রহসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়।

আজ মধ্যপ্রাচ্যে ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তিতে সবচেয়ে সক্রিয় দেশগুলোর একটি হলো আরব আমিরাত। মরুভূমির কঠিন পরিবেশ এবং দীর্ঘস্থায়ী পানির সংকট মোকাবিলায় তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

এক্ষেত্রে আরব আমিরাতের আবহাওয়াবিদরা রিয়েল টাইমে মেঘের গঠন ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। যখন বৃষ্টির উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন বিশেষ বিমান মেঘের ভেতরে নির্দিষ্ট পদার্থ ছড়িয়ে দেয়—যেমন সিলভার আয়োডাইড বা নতুন ধরনের ন্যানো-লবণ।

এসব কণা জলীয় বাষ্পকে একত্রিত করে বড় জলকণায় পরিণত করতে সাহায্য করে। এরপর জলকণাগুলো ভারী হয়ে গেলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে বৃষ্টি হিসেবে নিচে নেমে আসে।

আরব আমিরাত এই প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। নাসা ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক রিসার্চের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশটি বছরে ১,০০০ ঘণ্টার বেশি ক্লাউড সিডিং ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

তবে প্রশ্ন হলো— এটি কি শুধুই পানির সংকট মোকাবিলার প্রযুক্তি, নাকি ভবিষ্যতে এটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে?

লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান