ভারতবর্ষ শাসনের ২০০ বছরে ইংরেজদের দ্বারা লুট করা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ উৎসা পাটনায়েকের গবেষণায় ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন ও বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে স্থানান্তরিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। এই হিসাবকে বর্তমান মূল্যে ধরলে অঙ্কটি প্রায় ৪,৯৫০ ট্রিলিয়ন টাকা।
অঙ্কটি কতটা বিশাল, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশের একটি তুলনা করা যায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজেটগুলোর একটি ছিল ২০২৩–২৪ অর্থবছরের প্রায় ৭.৬ ট্রিলিয়ন টাকা। সেই হিসাবে ৪,৯৫০ ট্রিলিয়ন টাকা দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ৬৫০ বছরের বেশি সময়ের বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ দাঁড়ায়।
অর্থাৎ বিষয়টি নিছক কয়েকটি জাহাজে করে পণ্য নিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি উপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ভারতের রাজস্ব, বাণিজ্য ও উৎপাদন থেকে সৃষ্ট সম্পদের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ অর্থনীতি ও সাম্রাজ্যের কাজে চলে যেত। আর এখানেই ব্রিটিশ শাসনের প্রচলিত “উন্নয়ন” গল্পের সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে।
ব্রিটিশরা কি সত্যিই ভারতকে উন্নত করতে এসেছিল?
ব্রিটিশরা নিজেদের ইতিহাসে ভারতবর্ষে তাদের শাসনকে অনেক সময় আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের যুগ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের যুক্তির তালিকায় থাকে, ভারতে রেলপথ চালু করা হয়েছে, বড় বড় সেতু ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং নানা ধরনের আইনকানুন প্রবর্তন করা হয়েছে।
এসবের কিছুই যে ঘটেনি, তা নয়। ব্রিটিশ আমলে ভারতে রেলপথ, টেলিগ্রাফ, বন্দরসহ নানা অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব কাজের পেছনে অর্থ কোথা থেকে এসেছিল এবং এগুলোর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
ভারতের কাঁচামাল দ্রুত বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, সৈন্য ও প্রশাসনকে দ্রুত এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরানো এবং ব্রিটিশ বাণিজ্যকে আরও কার্যকর করা; এসবও ছিল সেই অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
তাই শুধু রেললাইন, সেতু কিংবা সরকারি ভবনের তালিকা দেখিয়ে ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য একটি নিঃস্বার্থ উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করলে গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই বাদ পড়ে যায়।
কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে—
ব্রিটিশরা কি সত্যিই নিজেদের সম্পদ ভারতে ঢেলে দিয়েছিল, নাকি ভারতের সম্পদ ব্যবহার করেই নিজেদের সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে।
পলাশীর পর বদলে গেল অর্থের পথ
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বেড়ে যায়। এরপর ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে মির কাসিম ও তাঁর মিত্রদের পরাজয়ের পর কোম্পানির ক্ষমতা আরও শক্ত হয়।
১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা পায়। এখান থেকেই ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ বাণিজ্যের চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসে।
এর আগে ভারত থেকে পণ্য কিনতে ব্রিটিশদের রূপা বা অন্য মূল্যবান ধাতু নিয়ে আসতে হতো। অর্থাৎ ভারতীয় পণ্যের বিনিময়ে ভারতেই মূল্য পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু কোম্পানি যখন ভারতীয় রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা হাতে পেল, তখন পরিস্থিতি আমূল বদলে গেল।
এখন ভারতের কাছ থেকে কর আদায় করা হচ্ছে, আর সেই করের অর্থের একটি অংশ দিয়েই ভারতীয় পণ্য কেনা হচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় পণ্য কেনার জন্য ব্রিটিশদের নিজেদের পকেট থেকে নতুন করে অর্থ ঢালার প্রয়োজন থাকল না।
করের টাকা দিয়ে করদাতার পণ্য কেনা
বিষয়টি খুব সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। ধরা যাক, একজন কৃষক সরকারের কাছে কর দিলেন। সেই করের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলো। এরপর সেই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে একজন ভারতীয় উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য কেনা হলো।
পণ্যটি শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের হাতে চলে গেল। অর্থাৎ যে অর্থ দিয়ে পণ্যটি কেনা হলো, তার উৎসও ছিল ভারতের মানুষের কাছ থেকে আদায় করা রাজস্ব। এই ব্যবস্থায় ভারতের পণ্য নেওয়ার জন্য ব্রিটিশদের আগের মতো রূপা নিয়ে ভারতে আসতে হচ্ছিল না। এই প্রক্রিয়াটিই উপনিবেশিক সম্পদ স্থানান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ভারতের কৃষক ও তাঁতির কাছ থেকে একদিকে কর আদায় করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই অর্থের মাধ্যমেই তাদের উৎপাদিত পণ্য ব্রিটিশ বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে চলে যাচ্ছে।
বিনামূল্যের পণ্য, আবার সেই পণ্য থেকেই মুনাফা
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, ব্রিটিশদের একই অর্থ দিয়ে দুবার লাভ করার সুযোগ তৈরি হয়। ভারতীয় রাজস্ব দিয়ে ভারতীয় পণ্য সংগ্রহ করা হলো। তারপর সেই পণ্যের একটি অংশ ব্রিটেনে নেওয়া হলো, আর অন্য অংশ তৃতীয় কোনো দেশের বাজারে বিক্রি করা হলো।
অর্থাৎ যে পণ্য সংগ্রহ করতে ব্রিটিশদের নিজেদের নতুন মূলধন খরচ করতে হয়নি, সেটিই আবার আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে মুনাফা করা সম্ভব হলো। এটি কার্যত “পুঁজি ছাড়া ব্যবসা” করার মতো একটি ব্যবস্থা। আর এখানে বিষয়টি শুধু ভারত থেকে ব্রিটেনে পণ্য নিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই বাণিজ্য থেকে পাওয়া সম্পদ ব্রিটিশ অর্থনীতির অন্য ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। লোহা, কাঠ, পিচসহ শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য কেনা এবং ব্রিটিশ অর্থনীতির সম্প্রসারণে এই সম্পদ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থাৎ ভারতের সম্পদ শুধু ব্রিটিশদের ভোগের জন্য ব্যবহৃত হয়নি; তা ব্রিটেনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও শিল্পশক্তি গড়ে তুলতেও কাজে লেগেছে। ঘটনা এই যে, ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের অন্যতম বড় কারণও ছিল এই ভারত। ভারতের কাছ থেকে উপনিবেশিক পদ্ধতিতে সংগৃহীত সম্পদ ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উৎস ছিল।
১৮৫৮ সালে শাসক বদলাল, কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক কি বদলাল?
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারতের শাসন সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়। শুরু হয় ব্রিটিশ ক্রাউনের সরাসরি শাসন, যাকে আমরা সাধারণভাবে ব্রিটিশ রাজ বলে জানি।
এ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুরোনো একচেটিয়া বাণিজ্যিক ক্ষমতার অবসান ঘটে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সরাসরি পণ্য রপ্তানির সুযোগ আগের তুলনায় বাড়ে। দেখতে মনে হতে পারে, তাহলে হয়তো ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও বাড়ল। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল ছিল না। ভারতের রাজস্ব, সরকারি অর্থ এবং ব্রিটেনে অর্থ পাঠানোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা তখনও ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেল। আর এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা Council Bills।
Council Bills: বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা
Council Bills সাধারণ কাগুজে মুদ্রা ছিল না। এগুলো ছিল মূলত ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রিত এক ধরনের বিনিময় বিল বা আর্থিক দলিল, যার মাধ্যমে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর করা হতো। ব্যবস্থাটি ছিল বেশ চতুর।
ধরা যাক, ইউরোপের কোনো ব্যবসায়ী ভারত থেকে পণ্য কিনতে চান। সাধারণ নিয়মে তাকে ভারতীয় রপ্তানিকারককে অর্থ দিতে হতো। কিন্তু ব্রিটিশ ব্যবস্থায় সেই বিদেশি ক্রেতা লন্ডনে ভারতের জন্য দায়িত্বরত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে অর্থ জমা দিয়ে Council Bill কিনতে পারতেন।
এরপর সেই বিল ভারতে পাঠানো হতো। ভারতীয় রপ্তানিকারক সেই বিল স্থানীয় সরকারি কোষাগারে জমা দিলে তার বিনিময়ে ভারতীয় রুপিতে অর্থ পেতেন।
দেখতে মনে হয়, সবকিছু স্বাভাবিক। বিদেশি ক্রেতা টাকা দিয়েছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীও টাকা পেয়েছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো; বিদেশি ক্রেতার দেওয়া আসল অর্থটি কোথায় গেল?
সেটি ভারতে আসেনি। সেটি লন্ডনেই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতে থেকে গেল। আর ভারতীয় রপ্তানিকারককে যে রুপি দেওয়া হলো, সেটি এল ভারতের সরকারি কোষাগার থেকে। অর্থাৎ ভারতের নিজস্ব রাজস্ব ও সরকারি অর্থের ভাণ্ডার থেকে। ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারক রুপি পেলেও বিদেশে বিক্রি করা পণ্যের বৈদেশিক মুদ্রার আয় ভারতের অর্থনীতিতে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করল না।
ভারতের পণ্য গেল; অর্থও গেল
এখানেই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপস্থিত। স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো দেশ পণ্য রপ্তানি করলে তার বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। সেই অর্থ দিয়ে দেশ আমদানি করতে পারে, শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারে, সঞ্চয় করতে পারে কিংবা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু উপনিবেশিক ব্যবস্থায় ভারতের রপ্তানি থেকে পাওয়া বৈদেশিক অর্থের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। ভারতীয় রপ্তানিকারককে দেওয়া রুপি আবার আসত ভারতেরই কোষাগার থেকে।
অর্থাৎ বিদেশি ক্রেতার অর্থ লন্ডনে থাকল, আর ভারতীয় উৎপাদককে অর্থ দেওয়া হলো ভারতের নিজস্ব অর্থ থেকে। এই কারণে ভারতের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতীয় অর্থনীতিতে স্বাভাবিকভাবে জমা হয়নি। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে ভারতের সম্পদ পাচার-এর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাহলে ভারত উদ্বৃত্ত করেও ঘাটতিতে পড়ল কেন?
এখানে এসে একটি অদ্ভুত বিষয় দেখা যায়। ভারত বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ ভারত যত অর্থের পণ্য আমদানি করছে, তার চেয়ে বেশি মূল্যমানের পণ্য রপ্তানি করছে। স্বাভাবিকভাবে এতে ভারতের অর্থনীতির লাভবান হওয়ার কথা। কিন্তু সেই রপ্তানি উদ্বৃত্তের অর্থ যদি ভারতের হাতে না থেকে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়।
ভারত পণ্য দিল। বিদেশি ক্রেতা অর্থ দিল। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ ভারতীয় অর্থনীতিতে ফিরে এল না। ফলে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি করেও ভারত সেই রপ্তানির পূর্ণ বৈদেশিক আয় ভোগ করতে পারল না।
ব্রিটিশরা একদিকে বলত ভারতকে শাসন করতে তাদের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের রাজস্ব ও রপ্তানি থেকে তৈরি হওয়া সম্পদের একটি বড় অংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই বৈপরীত্যই ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস
এই পুরো ব্যবস্থাকে একটি উপমায় বোঝানো যায়। ভারত ছিল যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস।
ভারতের কৃষক উৎপাদন করছে, তাঁতি কাপড় তৈরি করছে, ব্যবসায়ী পণ্য রপ্তানি করছে, জনগণ কর দিচ্ছে; আর সেই উৎপাদন ও রাজস্বের ওপর দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াচ্ছে। ভারতের সম্পদ থেকে ব্রিটিশরা বারবার আয় করেছে। কিন্তু যে অর্থ ভারতের নিজস্ব শিল্প, ব্যবসা ও অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারত, তার একটি বড় অংশ দেশের বাইরে চলে গেছে। এই অর্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যেন সেই শিকারির মতো, যে সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতিনিয়ত তার ডিম নিয়ে যাচ্ছে।
সম্পদ বেরিয়ে যাওয়ার আরেক ফল: ঋণ ও নির্ভরতা
এই সম্পদ নিষ্কাশনের আরেকটি প্রভাব ছিল ভারতের অর্থনীতিতে অর্থের সংকট ও বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভরতা।
একদিকে ভারতের সম্পদ ও রপ্তানি আয় বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে শিল্প ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ঋণ ও মূলধনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
এভাবে যে অর্থ ভারতের ভেতরে সঞ্চিত হয়ে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ হতে পারত, তার একটি অংশ বাইরে চলে গেল; আবার প্রয়োজনের সময় ভারতকে বিদেশি মূলধনের ওপর নির্ভর করতে হলো। অর্থাৎ একদিকে সম্পদ বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নির্ভরতাও বাড়ছে।
আজকের ব্রিটেন দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সম্পদের উপর
ভারত থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্পদের ব্যবহার শুধু ব্রিটিশ জনগণের জীবনযাত্রা উন্নত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই অর্থ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশাল প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো চালাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
ভারতের রাজস্ব ও সম্পদ ব্যবহার করে ব্রিটিশরা বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
ভারতের বাইরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ডেও ভারতীয় অর্থ ও ভারতীয় সৈন্য ব্যবহারের নজির রয়েছে। অর্থাৎ ভারত থেকে সংগৃহীত সম্পদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই তৈরি করেনি; সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামরিক শক্তি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাহলে ব্রিটিশদের “উন্নয়নের” গল্প কোথায় দাঁড়ায়?
এখানে আবার ফিরে আসতে হয় সেই পুরোনো দাবিতে, ব্রিটিশরা নাকি ভারতকে উন্নত করেছে! হ্যাঁ, ব্রিটিশ আমলে রেলপথ তৈরি হয়েছে। সেতু, বন্দর, টেলিগ্রাফ, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন আইন তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের তালিকা দেখানোর আগে আরও কিছু প্রশ্ন করা দরকার।
এই উন্নয়ন কার স্বার্থে হয়েছিল?
এর অর্থ কে দিয়েছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
যে দেশের রাজস্ব ও সম্পদ ব্যবহার করে সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়েছে, সেই দেশকে উন্নত করার দাবিটি কি নিঃস্বার্থ উন্নয়নের গল্প হিসেবে বলা যায়?
ইতিহাসের উত্তর এতটা সরল নয়। ব্রিটিশরা ভারতের জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো তৈরি করেছে, এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে, যাতে ভারতীয় সম্পদের সম্পূর্ণ অংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, এটিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সত্য।
তাই প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস শুধু রেললাইন, সেতু, আইন বা প্রশাসনিক সংস্কারের ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে সম্পদ আহরণ, রাজস্ব আদায়, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ পাচারের ইতিহাস।
১৭৬৫ সালের পর কোম্পানির হাতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা আসার ফলে ভারতীয় রাজস্ব ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হয়। সেই পণ্য ব্রিটেনে নেওয়া হয়েছে, আবার তৃতীয় দেশের বাজারেও বিক্রি করা হয়েছে। ফলে ভারতের সম্পদ থেকে ব্রিটিশরা নতুন পুঁজি তৈরি করেছে।
১৮৫৮ সালে শাসন কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যাওয়ার পর বাণিজ্যিক কাঠামো বদলালেও সম্পদ স্থানান্তরের মূল সমস্যা শেষ হয়নি। Council Bills-এর মতো আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থেকে যায় এবং ভারতের নিজস্ব রাজস্ব ব্যবহার করে ভারতে রপ্তানিকারকদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে ভারত বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত অর্জন করেও সেই উদ্বৃত্তের কোনো সুবিধাই পায়নি।
এই অর্থ দিয়ে ব্রিটেন তার অর্থনীতি, শিল্প, প্রশাসন ও সাম্রাজ্যিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছে। একই সময়ে ভারতীয় অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে সম্পদের ঘাটতি, মূলধনের সংকট এবং বিদেশি অর্থের ওপর নির্ভরতা। তাই ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসকে শুধু “ইংরেজরা ভারতকে আধুনিক করেছে” এই একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
ভারতকে তারা কতটা দিয়েছে, আর ভারত থেকে কতটা নিয়েছে?
উৎসা পাটনায়েকের গবেষণায় উঠে আসা প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাব সেই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে আনে।
ব্রিটিশরা ভারতে রেল বানিয়েছে, এটি ইতিহাসের একটি অংশ। কিন্তু সেই রেলপথের পাশাপাশি ভারত থেকে ব্রিটেনে বয়ে যাওয়া সম্পদের স্রোতটিও ইতিহাসের অংশ। আর সেই স্রোত না বুঝলে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র কখনোই সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না।
কাজেই ইংরেজরা ভারতবর্ষ উন্নত করার যে গল্প দিয়ে থাকে, তা তাদের একতরফা দাবি। সেখানে সত্যতার উপস্থিতি নেই; বরং ভারতের ধনসম্পদেই তাজা হয়েছে আজকের ব্রিটেন।
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান