Skip to main content

মুসলিম পোর্ট

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে একটি গভীর আর্থিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে। সামরিক ব্যয়, যুদ্ধের খরচ এবং ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে সাম্রাজ্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় ১৮৫৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথমবারের মতো বড় আকারে ইউরোপীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে। এই ঋণদাতাদের মধ্যে ব্রিটিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংক ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ পরিচালনার খরচ মেটানো। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে কয়েক দশকব্যাপী একটি ঋণ সংকটের সূচনা করে, যা সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

১৮৫৪ সাল থেকে ১৮৭০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত উসমানীয় সরকার প্রায় ১৫টি বৈদেশিক ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। শুরুতে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল উন্নয়ন ও সামরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য, কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করা এবং বাজেট ঘাটতি পূরণ করা শুরু হয়। অর্থাৎ, সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে এমন এক ঋণচক্রে আটকে যায়, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৮৭৫ সালের মধ্যে উসমানীয় সাম্রাজ্য তার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। তখন মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি পাউন্ডে। এই ঋণের সুদ ও পরিশোধের চাপ এত বেশি ছিল যে, শুধু ঋণ পরিশোধের ব্যয়ই সাম্রাজ্যের বার্ষিক আয়ের অর্ধেকেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।

এরপর ইউরোপীয় ঋণদাতারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৮৮১ সালে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি অটোমান পাবলিক ডেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (OPDA) প্রতিষ্ঠা করে।

এটি ছিল একটি ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার কাজ ছিল বিদেশি ব্যাংক ও ঋণদাতাদের টাকা ফেরত নিশ্চিত করা। এজন্য OPDA সরাসরি উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কর, শুল্ক এবং রাজস্ব উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে OPDA এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, এটি সাম্রাজ্যের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিল এবং উসমানীয় অর্থব্যবস্থার বড় অংশ কার্যত বিদেশি তত্ত্বাবধানে চলে যায়।

ইতিহাসবিদরা এই সময়কে প্রায়ই আর্থিক নির্ভরতার যুগ হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ ইউরোপীয় শক্তিগুলো সরাসরি সামরিক দখল ছাড়াই উসমানীয় সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।

উসমানীয় সাম্রাজ্য এই ঋণ সংকটের পরও আরও কয়েক দশক টিকে ছিল। কিন্তু তার আর্থিক স্বাধীনতা আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ইউরোপীয় ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল ঋণকে ব্যবহার করে একটি রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ।

এখন প্রশ্ন আসে — এটি কি আধুনিক যুগের ঋণনির্ভর ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রথম উদাহরণের একটি???

কেননা আধুনিক ভূরাজনীতিতে ঋণনির্ভর নিয়ন্ত্রণ (debt-based geopolitical influence) বলতে এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে শক্তিশালী দেশ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অর্থনৈতিক জোট অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে বড় অঙ্কের ঋণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

প্রথমে এসব ঋণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও, কোনো দেশ যদি অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে এবং ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়ে, তখন ঋণদাতা পক্ষ তার ওপর নীতিগত বা কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই প্রভাব কখনো অবকাঠামো, বন্দর, খনিজ সম্পদ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আসে। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর প্রকল্প, আফ্রিকার বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামো ঋণ প্রকল্প এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের ঋণ সংকট উল্লেখযোগ্য।

একইভাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংক (World Bank)–এর ঋণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত সংকটে থাকা দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়, কিন্তু অনেক সময় ঋণের সঙ্গে কিছু শর্ত যুক্ত থাকে—যেমন সরকারি ব্যয় কমানো, ভর্তুকি কমানো, মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার বা বাজারমুখী নীতি গ্রহণ।

অনেক ক্ষেত্রে এসব শর্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা সীমিত করে। তাই এটিকে এক ধরনের “ঋণের ফাঁদ” বা debt dependency হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

তাই বলা যায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঘটনা থেকে আজকের বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত দেখায়, একটি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সবসময় সামরিক দখল প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো অর্থনৈতিক নির্ভরতাই একটি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। আধুনিক যুগে তাই ঋণ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সহায়তা শুধু উন্নয়নের মাধ্যম নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতারও অংশ বটে।

লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান