প্রতি বছর ২৯ নভেম্বর পালিত হয় ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস। ১৯৭৭ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে দিনটি পালন করা হচ্ছে। এ বছরও দিনটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শিকড় অবশ্য সাম্প্রতিক দশকে নয়। এর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাম্রাজ্যবাদী নীতি, অভিবাসন, ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস। এই দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হলো ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা।

বেলফোর ঘোষণা: একটি চিঠি, যার প্রভাব এক শতাব্দীজুড়ে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। সে সময় ফিলিস্তিনে আরবরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ইহুদিরা ছিল সংখ্যালঘু। পরবর্তীতে লীগ অব নেশনসের অধীনে ফিলিস্তিন ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অঞ্চলে পরিণত হয়।
১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন—জায়নবাদের সমর্থক আর্থার জেমস বেলফোর ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা লায়নেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠিই ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত।
চিঠিতে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে “ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি” প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে ঘোষণায় বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনের অ-ইহুদি জনগোষ্ঠীর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করা হবে না। কিন্তু ঘোষণাটির সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই।
ফিলিস্তিনের আরব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সেখানে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। তাদেরকে মূলত ‘non-Jewish communities’ বা ‘অ-ইহুদি জনগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, যে ভূখণ্ডে আরবরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে ঘোষণাটি ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এর ভাষা। ঘোষণায় ইহুদি জনগণের ‘জাতীয় আবাসভূমি’র কথা বলা হলেও সেই আবাসভূমির সুনির্দিষ্ট সীমানা কোথায় হবে, তা বলা হয়নি। এই অস্পষ্টতাই পরবর্তী কয়েক দশকে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
ব্রিটিশ ম্যান্ডেট: জনসংখ্যার ভারসাম্যে পরিবর্তন
১৯২৩ সালের মধ্যে লীগ অব নেশনসের আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট ব্যবস্থার অধীনে ফিলিস্তিনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের হাতে চলে যায়। এই সময় ব্রিটিশ নীতির অধীনে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, ভূমির মালিকানা ও জমি হস্তান্তরের ফলে বহু ফিলিস্তিনি আরব তাদের জমি হারাতে শুরু করেন। ১৯৩৯ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ ইহুদি হয়ে যায়।

জনসংখ্যার এই দ্রুত পরিবর্তন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে একটি বড় আরব বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ব্রিটিশ বাহিনী কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে সেই বিদ্রোহ দমন করে। এ সময়ের ঘটনাগুলো ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদি জাতীয়তাবাদের সংঘাতকে আরও গভীর করে তোলে।
১৯৪৭: জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- প্রায় ৫৬ শতাংশ ভূখণ্ড ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য;
- প্রায় ৪৩ শতাংশ ভূখণ্ড আরব রাষ্ট্রের জন্য;
- আর জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে রাখার প্রস্তাব করা হয়।
তখন ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল ইহুদি। আরব দেশগুলো জাতিসংঘের এই বিভাজন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। ব্রিটেন ভোটদানে বিরত থাকে এবং ঘোষণা করে যে তারা ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করবে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
১৪ মে ১৯৪৮: ইসরায়েলের জন্ম
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসানের ঠিক আগে ইহুদি নেতারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর পরপরই শুরু হয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। মিশর, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ চলে ১৯৪৯ সালের শুরু পর্যন্ত। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনার মানচিত্র আর বাস্তবে থাকেনি।
ইসরায়েল ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইনের প্রায় ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়—জাতিসংঘের পরিকল্পনায় ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দ করা ৫৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর একটি।
নাকবা: একটি জাতির গণবাস্তুচ্যুতি
১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আনুমানিক ৭ থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি আরব নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন অথবা বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’, অর্থাৎ ‘মহাবিপর্যয়’ নামে অভিহিত করে।

হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। অনেক পরিবার ভেবেছিল, যুদ্ধ শেষ হলে তারা নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন অধিকাংশের ক্ষেত্রেই আর সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের একটি বড় অংশ জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও গাজায় আশ্রয় নেয়। একই সময়ে ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে শত্রুতা আরও গভীর হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশকে একের পর এক যুদ্ধের পথ তৈরি হয়।
১৯৬৭: ছয় দিনের যুদ্ধ
ইসরায়েল-আরব সংঘাতের আরেকটি বড় বাঁক আসে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে।
মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ইসরায়েল দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জন করে।
এই যুদ্ধে ইসরায়েল দখল করে—
- গাজা উপত্যকা;
- পশ্চিম তীর;
- পূর্ব জেরুজালেম;
- গোলান মালভূমি।
যুদ্ধের ফলে আরও প্রায় ৫ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয় বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকা আন্তর্জাতিকভাবে Occupied Palestinian Territories বা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসে দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন, ভূমির নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি
১৯৮৮ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী কয়েক দশকে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে ১৫৭টি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে ফিলিস্তিনি পক্ষের হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তবে ফিলিস্তিন এখনো জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র নয় এবং এর রাষ্ট্রত্ব, সীমানা, জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অধিকার এবং ইসরায়েলি বসতিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
এক শতাব্দীর সংঘাতের শুরু কোথায়?
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে কেবল ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর আগে ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের পতন, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, বেলফোর ঘোষণা, ইউরোপ থেকে ইহুদি অভিবাসন, আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং দুই সম্প্রদায়ের নিজ নিজ জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা সেই দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়। ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার সমর্থন করেছিল। কিন্তু একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি আরবদের জাতীয় ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে ঘোষণাটি স্পষ্ট কোনো কাঠামো দেয়নি। পরবর্তী ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, ইহুদি অভিবাসন, ভূমি নিয়ে বিরোধ, ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনা, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ ও নাকবা, ১৯৬৭ সালের দখল—সবকিছু মিলে যে সংঘাতের জন্ম দিয়েছে, তা আজও শেষ হয়নি। এক শতাব্দী আগে লেখা একটি চিঠি হয়তো একা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সৃষ্টি করেনি। কিন্তু সেই চিঠি এমন এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা ও বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যার পরিণতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংঘাতগুলোর একটি তৈরি হয়েছে।
বেলফোরের সেই ঘোষণার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরও ফিলিস্তিন প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়ে গেছে একই মৌলিক প্রশ্ন—একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী দুই জনগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকার, রাষ্ট্রের দাবি এবং ভূমির মালিকানা কীভাবে সমাধান করা হবে?
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান