একসময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মিসরকে পাশ কাটিয়ে কোনো বড় হিসাব কষা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কায়রো ছিল আরব বিশ্বের “রাজনৈতিক হৃদয়” যাকে বলে, সেইসাথে সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক সংকটে একটি স্বাভাবিক মধ্যস্থতাকারী। এমনকি নাসেরের সময়ও মিসর ছিল আরব জাতীয়তাবাদের প্রধান কণ্ঠস্বর। পরবর্তী সময়ে সেই বিপ্লবী ভাষা বদলে গেলেও মিসরের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো অংশেই হারায়নি। বরং আনোয়ার সাদাতের আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক দেশটির মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত করে।
কিন্তু আজ সেই মিসর আর আগের মিসর নেই। এজন্য প্রশ্নটি শুধু মিসরের শক্তি কমে যাওয়া বা খানিকটা দূর্বল হয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোই কি এমনভাবে বদলে যাচ্ছে, যেখানে মিসরের ঐতিহাসিক গুরুত্বও আর আগের মতো থাকবেনা?

আসলে গত পাঁচ দশকের ইতিহাসের দিকে তাকালেও পরিবর্তনটি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় নাসেরের মিসর গোটা আরব বিশ্বকেই নিজেদের রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে দেখতো। ১৯৭৯ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর মিসর সেই অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসে স্রেফ আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনের বা একটা স্থিতাবস্থার রক্ষকের ভূমিকায় চলে যায়। ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনাও কমে যায়, আর মিসর পশ্চিমা শিবির ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদারেও পরিণত হয়।
বিশেষ করে ইরানি বিপ্লব, ইরাক-ইরান যুদ্ধ এবং পরে সাদ্দাম হোসেনের আঞ্চলিক শক্তি সম্প্রসারণের সময়ে মিসরের বিশাল সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং আল-আজহারের মতো জ্ঞান তাত্বিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দেশটিকে এনে দেয় বাড়তি গুরুত্ব। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও মিসর তখন ছিল এক ধরনের কৌশলগত বীমার নাম। অর্থাৎ, তাদের নিরাপত্তার জন্য মিসরের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা নিজেই ছিল একটি অমূল্য সম্পদ। সেই সময় বিনিময়ে কায়রোও পেয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি আর্থিক সহায়তা, অনুদান, আমানত, যাকাত ও ব্যবসায়ীক বিনিয়োগও।
কিন্তু আরব বসন্তের পর এই পুরোনো সমীকরণেই বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান শুধু হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনের অবসানই ঘটায়নি, গোটা মিসরেরই রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সক্ষমতাকেও দীর্ঘস্থায়ী চাপে ফেলে। এরপর দেশটির রাজনীতি ক্রমেই অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, বড় রকমের অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে আঞ্চলিক নেতৃত্বের জায়গায় মিসরের অবস্থান অনেকটাই নিজের দেশের দিকেই বেশী মনোযোগী হতে হয়।
আর ঠিক এখানেই উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শুরু হয়। তাদের কাছে তখন একটাই প্রশ্ন দানা বাঁধে, মিসর কি সত্যিই আগের মতো এখনো উপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা দিতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা রাখে?

পরবর্তীতে ইরানের প্রভাব সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে বিস্তৃত হয়েছে। লোহিত সাগরেও ইরান-সমর্থিত হুথিদের প্রভাব নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশ গুলোর স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে মিসরের ভূমিকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সীমিত ছিল। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে মিসরের অংশগ্রহণও রিয়াদের প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত ছিল। অন্যদিকে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধে মিসর সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ক্ষেত্রে কায়রোর অনীহাও ছিল স্পষ্ট। এই ঘটনাগুলো অবশ্য মিসরের দুর্বলতার একমাত্র প্রমাণ নয়, কিন্তু আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে একটি বার্তা অবশ্যই দিয়েছে যে মিসর এখন আর আগের মতো সামরিকভাবে সক্রিয় নিরাপত্তা-প্রদানকারী শক্তি নেই।
সম্প্রতি মক্কা চুক্তি ঘিরে মিসরের সম্ভাব্য অনুপস্থিতি নিয়ে যে আলোচনা সামনে এসেছে, তা এই পরিবর্তনকে আরও তরান্বিত ও স্পষ্ট করে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনার সময় মিসরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও কিন্তু নিছক একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন ঐতিহাসিক মর্যাদা বা জনসংখ্যার আকারের চেয়ে বাস্তব সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, দ্রুত মোতায়েনের ক্ষমতা এবং সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

অবশ্য আজকের রাজনীতিতে মিসরকে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় ভাবারও সুযোগ নেই। মিসরের জনসংখ্যা, সেনাবাহিনী, সুয়েজ খাল, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে অনিবার্য ভূমিকা তাকে এখনও গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। গাজা সংকটের ক্ষেত্রে কায়রোকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সমাধান কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো- মিসরের গুরুত্ব এখন আর স্বয়ংক্রিয় অবস্থায় নেই; তাকে সেই গুরুত্ব প্রতিনিয়ত নিজের সক্ষমতার আলোকে প্রমাণ করতে হচ্ছে।
ধারণা করা যায়, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্কে। একসময় উপসাগরীয় অর্থনীতি মানে মিসরের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাই যে ছিল এমনও না, এর পেছনে দেশটির এক কৌশলগত অবস্থানও ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থ দেবে, আর মিসর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে; সম্পর্কটির ভেতরে এমন একটি অলিখিত সমঝোতা কাজ করতো।
আজ সেই সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অর্থ-সম্পদ মিসরে প্রবাহিত হলেও তার চরিত্র হতে পারে আরও বাণিজ্যিক ও শর্তনির্ভর। অনুদানের বদলে বিনিয়োগ, সম্পদ অধিগ্রহণ, লাভজনক প্রকল্প এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রতিদানের হিসাব বড় হয়ে উঠতে পারে। আপাতত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মিসরের জন্য এটিই শ্রেয়। বিশেষ করে মিসরের ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ইতোমধ্যে বড় চাপ তৈরি করেছে। ফলে পুরোনো কৌশলগত সম্পর্ক যদি ধীরে ধীরে বিনিয়োগনির্ভর বাণিজ্যিক সম্পর্কে পরিণত হয়, তাহলে কায়রোর দর-কষাকষির ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।
পাশাপশি, আজ মিসরের জাতীয় নিরাপত্তা শুধুমাত্র আরব বিশ্বকে ঘিরে আবর্তিত নয়। নীল নদের পানি, ইথিওপিয়ার নীলনদ প্রকল্প, সুদান, সোমালিয়া, লিবিয়া এবং হর্ন অব আফ্রিকার অস্থিরতাও সরাসরি মিসরের নিরাপত্তার সঙ্গে সংযুক্ত। সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তাও এখন কায়রোর জন্য আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মিসর চাইলে এখনো আফ্রিকা, লোহিত সাগর এবং আরব বিশ্বের মধ্যে একটি নতুন কৌশলগত সেতু হয়ে উঠতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, এই নতুন ভূমিকা তৈরি করতে হলে মিসরকে তার পুরোনো অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়ে তো আর আঞ্চলিক নেতৃত্ব ধরে রাখা যায় না। নাসেরের সময়ে দেশটির যে রাজনৈতিক ইতিবৃত্তি, আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক প্রভাব কিংবা বিশাল জনসংখ্যা আজও গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু এগুলো একা বা স্বতন্ত্রভাবে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যে যে রাষ্ট্র অস্ত্র তৈরি করতে পারে, দ্রুত সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে পারে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করতে পারে, তার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। সেইসাথে, মুসলিম দেশ সমূহের মধ্যকার জোট তৈরী ও তার ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারার সক্ষমতাও মক্কাচুক্তির ঘোষণা মিশরকে হারে হারে বুঝিয়ে দিলো।
এই জায়গায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের আগমনও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নতুন ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে মিসর যে আর এককভাবে নিরাপত্তার কেন্দ্র নেই তা স্পষ্ট, বরং একটি বৃহত্তর ও বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে দেশটি।

এর পাশাপাশি আরেকটি সম্ভাব্য সমীকরণও সামনে আসছে। সেটি হলো- সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও মিসরের মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও যোগাযোগভিত্তিক সহযোগিতা। দখলদার দেশটির সাথে বাকি দুই দেশের সক্ষমতা পরস্পরের জন্য কিছু ক্ষেত্রে পরিপূরক। কিন্তু এই সম্ভাবনাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফিলিস্তিন প্রশ্নে মিসরের জনগণের সংবেদনশীল অবস্থান বা দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও ইরানের মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা এই ধরনের জোটকে ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, মিসরের সামনে এখন কোনো একক পথ নেই। আবার তাকে যে আরব বিশ্ব ছেড়ে আফ্রিকার দিকে যেতে হবে, বিষয়টি এমনও নয়। আবার শুধু পুরোনো আরব নেতৃত্বের স্মৃতি আঁকড়ে থাকলেও চলবে না। বরং মিসরের ভবিষ্যৎ নিহিত থাকতে পারে এই দুই ভূগোলকে একসঙ্গে ধারণ করার মধ্যে। নীলনদ থেকে সুয়েজ, সুদান থেকে গাজা, লিবিয়া থেকে লোহিত সাগর; এই পুরো অঞ্চলকে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিসর হিসেবে দেখতে হবে কায়রোকে।
লিখেছেনঃ মুশফিকুর রহমান