সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের এখন এক মৃত্যুর নগরী। ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে শহরটি অবরুদ্ধ রাখার পর, আরব আমিরাত -সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) সেখানে চালিয়েছে ভয়াবহ গণহত্যা। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, শহরটি পরিণত হয়েছে রক্তে রঞ্জিত মরুভূমিতে।
এই ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেই পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতা ও দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘অসীম অর্থ’ — ট্রাম্পের মন্তব্য ও এর তাৎপর্য
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের মালিক শেখ মানসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান-এর হাত ধরে হাসতে হাসতে বলেন, “Unlimited cash” — তখন তা নিছক মজা মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল গভীর সত্য।
পশ্চিমা বিশ্ব আরব আমিরাতের বিপুল অর্থনৈতিক প্রভাবের কাছে কতটা নত, সেটিই যেন সেই মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আর এর ফলেই, আমিরাতের অর্থায়নে দারফুরে চালানো গণহত্যার নেপথ্যে থাকা শক্তিগুলো আজও অক্ষত রয়ে গেছে।
এল-ফাশের: আধুনিক যুগের স্রেব্রেনিৎসা
দীর্ঘ অবরোধের পর এল-ফাশের শহরটি এখন মৃত্যুপুরী। মানবাধিকার সংস্থাগুলো মাসের পর মাস ধরে সতর্ক করেছিল, “একটি নতুন স্রেব্রেনিৎসা আসছে।” এবং অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্য হলো।
আরএসএফ যোদ্ধারা পালাতে চাওয়া সাধারণ মানুষকে গুলি করছে, মানবিক সহায়তাকারীদের নির্যাতন করছে, এমনকি নিজেদের অপরাধের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে—যেমনটি দেখা গেছে গাজার গণহত্যায়ও।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে—রক্তে ভেজা রাস্তা, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, বিধ্বস্ত শহর।
ইউএই-র ভূমিকা: অস্ত্র, ঘাঁটি ও স্বার্থ
আরএসএফ বাহিনী মূলত সেই জাঞ্জাউইদ মিলিশিয়া থেকে উদ্ভূত, যারা একসময় দারফুরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আজ এই বাহিনী ইউএই-এর সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউএই-এর দুটি ঘাঁটি রয়েছে সুদানে—একটি দক্ষিণ দারফুরের নিয়ালা, অন্যটি আল-মালহা, যা এল-ফাশের থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে। এখান থেকেই চাদ, লিবিয়া, উগান্ডা ও সোমালিয়ার উপকূল হয়ে আরএসএফ-কে অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়।
আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেদতি) ইউএই-কে সরবরাহ করছে স্বর্ণ, ভাড়াটে সৈন্য ও আফ্রিকার কৌশলগত ভূমিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। ইউএই (আরব আমিরাত)-এর কাছে এটি শুধু যুদ্ধ নয়—এটি হলো আফ্রিকার সম্পদ ও ভূ-রাজনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ।
পশ্চিমাদের নীরবতা ও ভণ্ডামি
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও পশ্চিমা নেতাদের প্রতিক্রিয়া নিস্তেজ ও শূন্য।
- যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বোলস শুধু আহ্বান জানিয়েছেন “নাগরিকদের সুরক্ষার” জন্য—যে আরএসএফ-কে নিজ সরকারই “গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত” করেছে।
- ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী জেনি চ্যাপম্যান বলেছেন, তিনি “উদ্বিগ্ন” এবং আশা করেন আরএসএফ “তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে।”
এমন প্রতিক্রিয়াগুলো কেবল ভণ্ডামি নয়, বরং একটি নৈতিক দেউলিয়া অবস্থার প্রতিচ্ছবি।
যখন পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের গণহত্যা রক্ষায় কূটনৈতিক ঢাল তৈরি করছে, তখন ইউএই-এর মতো অংশীদার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা কিছুই করছে না—কারণ “অসীম অর্থ” তাদের বন্ধ করে রেখেছে।
দারফুরের মাটি রক্তে ভিজে, কিন্তু বিশ্ব নীরব
সুদানে চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। কিন্তু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক বিবৃতি, মানবিক উদ্বেগ আর “আন্তর্জাতিক নিন্দা”—সবই এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
যেমন লেখক অস্কার রিকেট লিখেছেন,
“যখন ট্রাম্প ‘অসীম অর্থ’-এর কথা বলে হাসছিলেন, তখন এল-ফাশেরের মানুষরা ছিল মৃত্যুর ফাঁদে আটকে।”
এবং আজ, যখন স্যাটেলাইট ছবিতে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে, যখন RSF যোদ্ধারা গর্বের সঙ্গে অপরাধের ভিডিও বানাচ্ছে, তখনো পশ্চিমা বিশ্ব মুখে মানবতা আর সহযোগিতার বুলি আওড়াচ্ছে।
দারফুরের এই হত্যাযজ্ঞ শুধু আফ্রিকার নয়—এটি গোটা বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
এল-ফাশেরের রক্তের দাগ এখন শুধু সুদানের নয়, বরং তাদের হাতেও লেগে আছে যারা “অসীম অর্থের” বিনিময়ে ন্যায়বিচার বিকিয়ে দিয়েছে।