মুসলিম পোর্ট

১২ শতাব্দীর একজন মুসলিম উদ্ভাবক, ইসমাঈল আল জাজারী, যাকে রোবটিকসের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

রোবটিকসকে যখন বিজ্ঞানের তূলনামূলক নবতর শাখা হিসেবে বিবেচবা করা হয়, এবং এটি যে বিংশ শতাব্দীর একটি আবিষ্কার সে হিসেবে গণমত চালু আছে যে সময়ে, তখন এটা জানা বিস্ময়করই বটে যে প্রায় হাজার বছর পূর্বেই রোবটিকসের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আল জাজারি তার অসাধারণ এবং বিস্ময়কর সব আবিষ্কারের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তার উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে ছিল মেহমানকে তোয়ালে সরবরাহকারী যন্ত্রমানব, ফোয়ারা চালু এবং বন্ধ করার জন্য প্রোগ্রামযোগ্য সুইচ, স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ঘড়ি এবং অন্যান্য।

আল জাজারির ‘ময়ূর ফোয়ারা’ ছিল বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন একটি হাত ধোয়ার যন্ত্র যেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীকে সাবান এবং তোয়ালে সরবরাহ করত। তার আরও কিছু উচ্চ প্রকৌশলগুণ সমৃদ্ধ এবং বাস্তবিক যন্ত্র ধনীদের বিলাস এবং খেলনা সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরী করা হত। প্রায়োগিক ব্যবহারের জন্যও আল জাজারি কিছু যন্ত্র তৈরি করেন যার ফলে সাধারণ মানুষ লাভবান হয়। তাঁর এমন একটি যন্ত্র হল পানিসেচের কল‚ কৃষকরা যার উপর কয়েকশ বছর নির্ভরশীল ছিল।

আল জাজারি, পূর্ণনাম বাদিউজ্জামান আবু আল ইজ্জ ইসমাঈল ইবনে আল রাজ্জাজ আল জাযারী, ১১৩৬ সালে মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আর্তুকি প্রাসাদ, দিয়ারবাকির (তুরস্ক) এর প্রধান প্রকৌশলী।

২৫ বছরের সৃজনশীল এক উদ্ভাবনী যুগের পর, তিনি তার সমস্ত সৃষ্টিকর্মগুলো নিয়ে ১২০৬ সালে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন, যাকে সেসময় ইসলামী বিশ্বের যন্ত্রকৌশলের উপর লিখিত সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ রচনাগুলোর একটি বিবেচনা করা হয়।

এই সমৃদ্ধ সংকলনটি “The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices” নামে পরিচিত (আরবি ‘কিতাব ফি মারিফাত আল হিয়াল আল হানদাসিয়া’)। এখানে তার আবিষ্কারগুলোর অন্তর্নিহিত প্রকৌশলত দিক সম্বন্ধে সচিত্র, বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
৫০ টিরও অধিক যন্ত্রের বিবরণ নিয়ে লিখিত এই গ্রন্থে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, পানি ঘড়ি, ফোয়ারা, বাদ্যযন্ত্র এবং বিভিন্ন ধরণের যান্ত্রিক কলের বিস্তারিত আলোচনা।

যদিও বইয়ের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে, তবুও বইটির একাধিক কপি এখনো বর্তমান যার একটি ইস্তাম্বুলের তোপকাপি সারায়ি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই নির্দিষ্ট সংস্করণটি তার আকর্ষণীয় শৈল্পিক আত্মপ্রকাশ এবং নান্দনিক মোহনীয়তার জন্য বিখ্যাত।

আল জাজারি সৃষ্ট যন্ত্রগুলো শুধুমাত্র ক্রিয়ামূলকই ছিল না বরং কখনো কখনো সেগুলো ছিল নিখুঁত কারূকর্ম এবং শৈল্পিক উপকরণ সমৃদ্ধ। তিনি প্রকৌশলবিদ্যার সাথে নান্দনিকতার সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছিলেন দৃষ্টিনন্দন সব যন্ত্র।

তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি উদ্ভাবন হচ্ছে ‘হাতি ঘড়ি’। এই ঘড়িটি ছিল মূলত একটি যান্ত্রিক হাতি যার মাথায় বসা থাকত একজন মাহুত। হাতিটি নড়াচড়া করতে পারত, যার বিভিন্ন অংশে সময় নির্দেশ করত। সাথে ছিল একটি ঝুলন দোলক এবং ঘূর্ণায়মান বল।

তার আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিকদের কাছে খুবই গুরূত্ব বহন করে যেহেতু এটিকে ইতিহাসের প্রাচীনতম নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোবট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কার্যপ্রণালীর দিক থেকে অনেকটা বাদ্য বাক্সের মত, এই যন্ত্রটি চারজন বাদক নিয়ে একটি নৌকার আকার ধারণ করে, একজন বীণাবাদক, একজন বাঁশিবাদক এবং দুইজন ড্রামার যারা গান পরিবেশন করেন। ড্রামারের ক্রিয়াশীলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে তার ছন্দবদ্ধ শব্দময়তা।

আল জাজারির সুপরিচিত উদ্ভাবনগুলোর আরেকটি হল সিন্দুক বা বাক্সের জন্য ব্যবহৃত প্রথম চতুস্তরী বিন্যাস তালা। ত্রয়োদশ শতাব্দীর চতুস্তরী বিন্যাস তালাগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র ৫ টিই এখন পর্যন্ত টিকে আছে বলে জানা যায়।

আল জাজারির আবিষ্কার শুধুমাত্র স্বয়ংচল যন্ত্র এবং ঘড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এছাড়াও তিনি তৈরী করেছিলেন পানিউত্তোলনের জন্য সুকার্যকর যন্ত্র, পানির পাম্প এবং বিভিন্ন জলবাহী প্রযুক্তি। তার পানিউত্তোলন যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সাকিয়া’ এবং ‘আর্কিমেদিয়ান স্ক্রু’, দুইটাই পানি উঠানোর কাজে ব্যবহৃত হত সেচকাজের জন্য।

মহান এই বিজ্ঞানীর এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরবর্তী প্রজন্মের প্রকৌশলী এবং আবিষ্কারকদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, তাঁর যান্ত্রিক নকশাসমূহ পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে অনুকরণ এবং বিকশিত হয়।

আল জাজারি রোবটিকসের উন্নতিসাধনে খুবই গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং স্বয়ংচল যন্ত্রের বিকাশ সাধনে তার অবদান অবিসংবাদিত। তাঁর উদ্ভাবনের মাধ্যমেই আধুনিক যন্ত্রকৌশল এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিগত বিদ্যার ভিত্তি রচিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আল জাজারির কাজ পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিল না যতদিন পর্যন্ত না তাঁর পান্ডুলিপিগুলো ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়।

লেখক- আব্দুল্লাহ আল মারজুক