ভারতে প্রতিবার জাতীয় কিংবা প্রাদেশিক নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই এক পুরোনো তবে খুবই প্রভাবশালী এক ইস্যু আবার সামনে এসে দাঁড়ায়; তা হলো হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা। এই বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা জনমত, নির্বাচনী কৌশল এবং সামাজিক পরিবেশ সবকিছুকেই প্রভাবিত করে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের সবচেয়ে উত্তপ্ত রাজ্যগুলোর একটি হলো আসাম।

৯ই এপ্রিল আসামের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, যা বেশ কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এবারের নির্বাচন একক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২৬টি আসনে একই দিনে ভোট গ্রহণ করা হয় এবং ৪ মে ভোট গণনা সম্পন্ন হবে। ২০২১ সালের তিন দফায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের তুলনায় এটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন, যা রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়েও বেশি আলোচিত হচ্ছে আরেকটি বিষয় তা হচ্ছে “মিয়া মুসলমান” ইস্যু, যা আবারও ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রচারণার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল এবারও।
বিগত সময়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা নির্বাচনী ভাষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে “মিয়া মুসলমানদের” বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই সৃষ্টি করেনি, বরং একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তৈরি হওয়া এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের ইঙ্গিতও বহন করছে।
“মিয়া মুসলমান” আসলে কারা?
রাজনৈতিক পরিভাষায় “মিয়া মুসলমান” বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। আসামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি প্রায়শই স্থানীয় বাঙ্গালি মুসলমানদের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, এমনকি অনেক সময় আসামে বসবাসরত প্রায় সব শ্রেণির মুসলমানদেরই এই পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। ফলে এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বোঝানোর চেয়ে একটি বিস্তৃত ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ট্যাগে পরিণত হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি বনাম বাস্তবতা
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ১৯৫১ সালে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১২%, যা বর্তমানে বেড়ে ৪০%-এ পৌঁছেছে এবং এর জন্য তিনি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের দায়ী করেন।
কিন্তু সরকারি তথ্য এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ২২.৬% থেকে ২৪.৬৮%। বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৫১ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ২৪.৬৮%, ১৯৯১ সালে ২৮.৪৩% এবং ২০১১ সালে ৩৪.২২%। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রীর উত্থাপিত ১২% পরিসংখ্যানটি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।

বিরোধী নেতা আসাদুদ্দীন ওয়াইসি এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৫১ সালের আসাম বর্তমানের চেয়ে অনেক বড় ছিল। তখনকার আসামের মধ্যে নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ এবং মেঘালয়ের মতো অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোতে হিন্দু ও খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বেশি ছিল। সুতরাং সেই বৃহৎ ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটেও মুসলিম জনসংখ্যা কখনোই ১২% ছিল না।
আসামে বাঙ্গালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক শিকড়
আসামে বাঙালি মুসলমানদের উপস্থিতি কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়; এর শিকড় বহু পুরোনো। ১৮৭৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার্থে আসামকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে আলাদা করে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলার গোয়ালপাড়া, কাছাড়, সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চল আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক বাংলাভাষী মানুষ; হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই স্বাভাবিকভাবেই আসামের অংশ হয়ে যান।
বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল, যা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র ভূমি হিসেবে পরিচিত, এই ঐতিহাসিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হলেও, বরাক উপত্যকা (কাছাড়, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি) এবং বৃহত্তর গোয়ালপাড়া আসামের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। এই অঞ্চলগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য, যা প্রমাণ করে যে আসামের বাঙালি মুসলমানরা এই ভূখণ্ডের বহু পুরোনো বাসিন্দা।

গোয়ালপাড়া: ভাষার নীরব পরিবর্তনের ইতিহাস
গোয়ালপাড়ার ইতিহাস ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি গভীর উদাহরণ। ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, তৎকালীন আসাম অঞ্চলে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল ২৪.২৫ লাখ, যেখানে আসামীয়াভাষী ছিল মাত্র ১৩.৬১ লাখ। গোয়ালপাড়া ছিল এই বাংলাভাষী জনসংখ্যার একটি প্রধান কেন্দ্র।
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গোয়ালপাড়ার পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাষা ছিল রাজবংশী যা বাংলারই একটি উপভাষা। পূর্বাংশে ব্যবহৃত ভাষা ছিল আসামীয়া ও রাজবংশীর মিশ্র রূপ।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে আসাম সরকার একটি নির্দেশ জারি করে, যেখানে আসামীয়াকে বাধ্যতামূলক দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে গোয়ালপাড়ার ধুবড়ি অঞ্চলে ২৫০টি বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র তিন বছরের মধ্যে প্রায় সবই বিলুপ্ত হয়ে যায়, মাত্র তিনটি টিকে থাকে।
১৯৪৮ সালের এক প্রশাসনিক সার্কুলারে আরও বলা হয়, “আসামীয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করো, জমি পাবে।” এই ধরনের চাপ ও প্রণোদনার ফলে বহু বাঙালি মুসলমান ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে নিজেদের মাতৃভাষা পরিবর্তন করে আসামীয়া হিসেবে নথিভুক্ত করতে বাধ্য হন। এর ফলে আসামীয়াভাষীর সংখ্যা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়, যা প্রকৃতপক্ষে একটি কৃত্রিম পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন ছিল।
২০১১ সালের আদমশুমারিতে গোয়ালপাড়ায় আসামীয়াভাষী দেখানো হয়েছে ৫১.৭৮% এবং বাংলাভাষী মাত্র ২৮.৮৩%। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ বহু মানুষ এখনও চাপের কারণে নিজেদের ভাষাগত পরিচয় গোপন রাখেন।
বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন
গোয়ালপাড়ার বিপরীতে বরাক উপত্যকার মানুষ এই ভাষাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৬১ সালের ১৯ মে সেখানে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়, যেখানে ১১ জন মানুষ প্রাণ হারান। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে, ভাষাগত অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম কতটা তীব্র হতে পারে।

সহিংসতা ও গণহত্যার অধ্যায়
আসাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর ত্রিপুরায় মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, কারণ বিপুলসংখ্যক মানুষ বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি; নেলি গণহত্যা। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২,০০০-এরও বেশি বাঙ্গালি মুসলমান নিহত হন। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২,১৯১ হলেও স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আজ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি।

এছাড়াও “বঙ্গাল খেদা” আন্দোলনসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় বহু মানুষ আসাম ছেড়ে যেতে বাধ্য হন, যার অনেকটাই সরকারি নথিতে প্রতিফলিত হয়নি।
NRC ও বাস্তব চিত্র
আসামের নাগরিকপঞ্জি (NRC) নিয়ে বিতর্কও কম নয়। ২০২০ সালের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়েন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬%। বেসরকারি অনুমান অনুযায়ী, এদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ৪–৫ লাখের বেশি নয়, যা মোট মুসলিম জনসংখ্যার খুবই সামান্য অংশ।
এছাড়া NRC প্রক্রিয়ায় অসংখ্য অসংগতি দেখা গেছে—একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ নাগরিক, কেউ নয়—এমন ঘটনাও ঘটেছে। সমালোচকদের মতে, এই ত্রুটিগুলো বিশেষভাবে মুসলিম পরিবারগুলোকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

উপসংহার
সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, আসামের “মিয়া মুসলমান” ইস্যুটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়; এটি ইতিহাস, ভাষা, পরিচয় ও রাজনীতির জটিল সমন্বয়। পরিসংখ্যান ও ইতিহাস বলছে, বাঙালি মুসলমানরা আসামের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। জনসংখ্যা নিয়ে প্রচলিত অনেক দাবি তথ্যভিত্তিক নয়, এবং NRC-তে বাদ পড়া মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম।
গোয়ালপাড়ায় ভাষার পরিবর্তন, বরাক উপত্যকায় রক্তের বিনিময়ে ভাষার স্বীকৃতি, নেলির হত্যাযজ্ঞ; সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের চিত্র ফুটে ওঠে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি পরিচয়, ইতিহাস ও মানবিকতারও এক গভীর পরীক্ষা।
লিখেছেনঃ মুয়াজ বিন মুসলিম