দখলদার ও সন্ত্রাসী ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শহীদ হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। তার মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ধর্মীয় পরিষদ Assembly of Experts নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে তার ছেলে মুজতবা খামিনির নাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইরানের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিশেষত, ইরানকে নেতৃত্ব শূন্য করার যে চেষ্টায় নেমেছিল সন্ত্রাসী ইসরায়েল ও সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী, তা মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে।
১৯৬৯ সালে ইরানের মাশাদ শহরে জন্ম নেওয়া মুজতবা খামেনি ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার মা ছিলেন মনসুরে খোজাস্তে বাঘেরজাদে।

মুজতবা খামেনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, যখন ইরান শাহ মোহাম্মদ রেজা পেহলেভি–এর শাসনের অধীনে ছিল। পরে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে সেই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং নেতৃত্বে উঠে আসেন তাঁর বাবা আলী খামেনি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুলুল্লাহ খমিনি।

মুজতবার কৈশোর কেটেছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের উত্তাল সময়ে। এই দীর্ঘ সংঘাতে প্রায় দশ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেসময়। সেসময়ই কিশোর মুজতবা যুদ্ধের শেষ দিকে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)–এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে তিনি হাবিব ইবনে মাজাহির ব্যাটালিয়নের সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। শৈশব থেকে জ্ঞানের প্রতি ভীষণ অনুরাগী মুজতবার সামরিক বিদ্যার হাতেখড়ি সেখান থেকেই ।
পরবর্তীতে তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য আরো মরিয়া হয়ে ওঠেন। Qom– অঞ্চলে যান এবং দীর্ঘদিন শিক্ষকতাও করেন। প্রকাশ্যে তিনি তুলনামূলকভাবে নীরব ও নিম্নপ্রচারিত জীবনযাপন করলেও, পর্দার আড়ালে তার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমতার করিডোরে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন।
২০০০–এর দশকের শুরুতে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আহমেদিনেজাত–এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান বিশ্বমন্ডলে। ২০০৯ সালে নির্বাচনকে ঘিরে ইরান জুড়ে বিক্ষোভ দানা বাধতে শুরু করলে তা শক্ত হাতে দমনের পেছনে মুজতবা খামিনির নাম অনেকেই বলে থাকেন। বিরোধীরা অভিযোগ করেন, নির্বাচন জালিয়াতি ও পরবর্তী বিক্ষোভ দমনে তার প্রভাব ছিল অনেক বেশি। যদিও সরকারিভাবে এসব অভিযোগ কখনো প্রমাণিত হয়নি।

যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সম্প্রতি মুজতবা খামিনিকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ক্ষমতায় আসার ধরন নিয়ে। বলা হচ্ছে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে। তাই একজন সর্বোচ্চ নেতার ছেলে আবার সেই পদে বসায় অনেকেই এটিকে “বংশানুক্রমিক ক্ষমতা”র উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি সমালোচকরা বলছেন, তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না, ফলে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে, ইরানের সাধারণ জনগন কর্তৃক মুজতবার প্রতি অকাট্য আনুগত্যের নিদর্শন এসব বিতর্ককেই উড়িয়ে দিচ্ছে। সেই সাথে ইরানের রাষ্ট্রীয় শুরা কমিটি এবং বিপ্লবী গার্ড কর্তৃক নতুন এই নেতাকে সবচেয়ে যোগ্য, তরুন ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে- যুদ্ধকালীন সংকট মোকাবেলায় মুজতবা খামিনির নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির টুঁটি চেপে ধরার পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল ইরান।
সেইসাথে বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়াকে অনেক বিশ্লেষক প্রতীকী সিদ্ধান্তও মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও সন্ত্রাসী ইসরায়েলের চাপের মুখে ইরান যে আপস নয় বরং প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে পারে, এই বার্তাই এতে স্পষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে এগোবে। অভ্যন্তরীণ বিতর্ক, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপ, সবকিছুর মাঝেই তার নেতৃত্বের প্রথম অধ্যায় শুরু হলো। ইরানের শত বছরের ত্যাগ ও সংগ্রামের পথচলায়ও যুক্ত হলো নতুন এক নুকতা, যার নাম- মুজতবা আলী খামেনি।