সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পেছনের প্রেক্ষাপট, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে লবিংয়ের প্রভাব এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে এই সময়ে বিশ্লেষণ খুব জরুরী। সেইসাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথকে বোঝার জন্য অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমাদের সামনের কিছু খন্ড-ঘটনাপ্রবাহকেও বিশ্লেষণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
যেমন, চলতি বছরের (২০২৬ সালের) ২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফরও এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। সফরে তাকে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। দুই দিনের এই সফরে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট কনেসেটে ভাষণ এবং ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের মতো কর্মসূচি ছিল।
কনেসেটে দেওয়া ভাষণে মোদি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলাকে “বর্বর সন্ত্রাসী আক্রমণ” বলে আখ্যা দেয় এবং বলে, “কোনো কারণই বেসামরিক মানুষের হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।” সে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সমন্বয়ের আহ্বান জানায়। তবে গাজায় চলমান সংঘাত, যেখানে ইতোমধ্যে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, সেই মানবিক সংকটের বিষয়ে অবশ্য সে সরাসরি কিছু বলেনি। আর ঠিক এর কিছুক্ষণ পরই ইরানের হামলার ঘটনা ঘটায় বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এবার আসা যাক, মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতির পেছনের এর বাস্তবতা কী? গত শতাব্দিতে স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি প্রায়ই সন্ত্রাসবাদ দমন, গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিস্তার রোধ কিংবা গণতন্ত্র রপ্তানির মতো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনাম (১৯৬৫–১৯৭৩), ইরাক (২০০৩–২০১১) এবং আফগানিস্তান (২০০১–২০২১) যুদ্ধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব অভিযানের কৌশলগত লাভ সীমিত ছিল এবং এর মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।
এই যুদ্ধগুলোতে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং নতুন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্লাসিক বাস্তববাদী ধারণা, রাষ্ট্র সব সময় নিজের স্বার্থকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করে আর সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইসরায়েল লবির প্রভাব
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় অংশ প্রভাবিত হয় একটি শক্তিশালী জোটের মাধ্যমে, যাকে প্রায়ই “ইসরায়েল লবি” বলা হয়। এতে রয়েছে AIPAC, খ্রিস্টান জায়নিস্ট সংগঠন, নব্য-রক্ষণশীল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং কংগ্রেসের তাদের মিত্ররা।
রাজনীতি বিশ্লেষক জন মিয়ারশাইমার ও স্টিফেন ওয়াল্টের মতে, এই লবির লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে ইসরায়েলপন্থী করে তোলা। নির্বাচনী অনুদান, ভোটার সংগঠিত করা এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে “ইসরায়েলবিরোধী” বা “ইহুদিবিদ্বেষী” তকমা ব্যবহার, এসবই তাদের প্রভাব বিস্তারের উপায়।
ইরান প্রসঙ্গ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রায়ই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই বর্ণনা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপকভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। এর ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক হুমকির নীতি অনুসরণ করে।
তবে বাস্তব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কোনো সামরিক হুমকি নয়। বরং সম্ভাব্য হামলা হলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা এবং নতুন জিহাদি তৎপরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নেতৃত্ব পরিবর্তন ও মার্কিন নীতি
ইতিহাসে দেখা যায়, অপছন্দের নেতাদের সরিয়ে দেওয়া বা তাদের বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তিকে সমর্থন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অংশ ছিল এবং আছে। উদাহরণ হিসেবে ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ও সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় ইরানের রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে।
বর্তমানেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে বিরোধী নেতাদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভীর নামও আলোচনায় আসে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করেন।
আফ্রিকার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক
১৯৮৯ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পশ্চিমবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন।
১৯৯২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তেহরান সফর করেন এবং খামেনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ম্যান্ডেলা তখন ইরানকে বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান। এই ঘটনাকে ইরান প্রায়ই “নিপীড়িত জাতিগুলোর ঐক্য” ধারণার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
এছাড়া বুরকিনা ফাসোর বিপ্লবী নেতা থমাস সাঙ্কারার সঙ্গে খামেনির যুবক বয়সের সাক্ষাতের কথাও উল্লেখ করা হয়, যা পশ্চিমা আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ অনেকটা ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের ধারাবাহিকতার মতো। এতে প্রায়ই জাতীয় স্বার্থের চেয়ে একটি বিশেষ মিত্র, ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও অগ্রাধিকার পেয়েছে।
মিয়ারশাইমার ও ওয়াল্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় অভ্যন্তরীণ লবির প্রভাবে পরিচালিত হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ কৌশলগত লাভের তুলনায় রাজনৈতিক প্রভাবের ফল বলেই মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশলগত ব্যয়-লাভের অসামঞ্জস্য দেখা যায়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা সময়ই বলে দেবে।