মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণ দেখছে, একজন প্রেসিডেন্ট দখলদার ইজরাইলের অনুরোধে কিংবা চাপে ইরানে বোমা হামলা চালাচ্ছে। এমনকি অতীতে জিম্মি সংকটের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গেলেও সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৪৪৪ দিন ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে রাখা হয়। ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি, Ronald Reagan ক্ষমতা গ্রহণের দিন এবং Jimmy Carter-এর শেষ দিনে জিম্মিদের মুক্তির মধ্য দিয়ে সংকটের সমাপ্তি ঘটে। এরপর ৪৫ বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে শত্রু হিসেবে দেখলেও সরাসরি যুদ্ধে যায়নি। কিন্তু ডোনাল্ট ট্রাম্প-এর দ্বিতীয় মেয়াদে এসে ইরানে হামলা বাস্তব রূপ নেয়, এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত এখন বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েল সম্পর্কের জন্য এক ধরনের ‘লিটমাস টেস্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর থেকে চলে আসা নিঃশর্ত জোট নিয়ে এখন আমেরিকান রাজনীতি ও সমাজে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। গাজায় গণহত্যা ও ইরান যুদ্ধ উসকে দেওয়ার জন্য দখলদার ইজরায়েলকেই দায়ী করা হচ্ছে—এমন ধারণা জোরালো হওয়ায় “ইজরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র” সম্পর্ক এখন জাতীয় নিরাপত্তা বিতর্কে পরিণত হয়েছে। “ইজরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন আমেরিকার জন্য ক্ষতিকর”—এই মত এখন একাডেমিয়া, শিল্প ও মিডিয়ার প্রান্তিক আলোচনা থেকে মূলধারায় চলে এসেছে।
এই পরিস্থিতি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রে ইজরাইলপন্থী ও খ্রিস্টান ইভানজেলিক্যাল-জায়নিস্ট লবির জন্য আগের মতো সবকিছু সহজ থাকবে না। যারা এতদিন এই সম্পর্ককে “অপরিহার্য”, “অটল” ও “জীবন-মরণ প্রশ্ন” হিসেবে তুলে ধরেছে, তাদের অবস্থান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
ফলে, “ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্য কৌশলগত মিত্র”—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর যুগ হয়তো শেষের দিকে। বরং জনমত জরিপ বলছে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে ইজরাইলকে অগ্রাধিকার দিয়েছে—এমন বিশ্বাসে আমেরিকানরা ক্ষুব্ধ, এবং এর রাজনৈতিক মূল্য তাকে দিতে হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৮০-এর দশক থেকে শীতল যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলকে ন্যাটোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখা হতো। সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ে, এবং বছরে ৩–৪ বিলিয়ন ডলার শর্তহীন সহায়তা দিয়ে সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
তবে ট্রাম্প আমলে পার্থক্য হলো—৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা, মিডিয়া ও অর্থনৈতিক খাতে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ইসরাইলি লবি একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে রাজি করাতে পেরেছে। অর্থাৎ, প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র দপ্তর, সামরিক নেতৃত্ব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছে—যার পেছনে রয়েছে লবি ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক চাপ।
একই সঙ্গে, ২০১০ সালের পর নতুন প্রজন্মের মধ্যে “ইসরাইল অপরিহার্য নয়” ধারণা শক্তিশালী হয়েছে। John Mearsheimer ও Stephen Walt-এর বই The Israel Lobby and American Foreign Policy এই বিতর্ককে অনেক আগে থেকেই সামনে এনেছিল। তাদের মতে, ইসরাইলকে সমর্থন করা একসময় কৌশলগত সুবিধা দিলেও এখন তা বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধের পর এই বিতর্ক চূড়ায় পৌঁছেছে। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ব্যর্থতা, এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী অস্থিরতা তৈরিতে ইসরাইলের ভূমিকা—এসবই এখন নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে, মার্কিন জনমতে “অটল সমর্থন” ধারণাটি প্রায় ভেঙে পড়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গ্যালাপ জরিপে দেখা যায়, ৪৬% আমেরিকান ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে, যেখানে ইসরাইলকে সমর্থন করে ২৬%। আর ইরান যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আরও কম।
সবশেষে বলা যায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল “অটল জোট”-এর অবসান ঘটাবে কি না—তা নির্ভর করবে যুদ্ধের ফলাফল ও এর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক খরচের ওপর। তবে এতটুকু স্পষ্ট যে, বহু বছর ধরে মার্কিন রাষ্ট্র ও রাজনীতির গভীরে প্রভাব বিস্তার করা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবার সরাসরি যুদ্ধের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখায়, এই সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন সমাজে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভবত, এই যুদ্ধের পরিণতিই স্পষ্ট করে দেবে—ইসরাইল শুধু গাজা বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের নিরাপত্তার জন্যও কতটা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।