মুসলিম পোর্ট

গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি—বলছেন ফিলিস্তিনি নারী মানার জেনদিয়া।

গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকার এই বাসিন্দা এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন দেইর আল-বালাহতে। ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও তার এলাকা এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে।

যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহের মাথায় ইসরায়েলি বাহিনী দেইর আল-বালাহ এলাকায় ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালায়, যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন মানার। সেই হামলায় নিহত হন তার বোন।

“তার স্বামী আগেই যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। সন্তানদের নিয়ে তিনি একাই ছিলেন,” বলেন মানার। “গাজা সিটিতে যখন হামলা বেড়ে গেল, তিনি সন্তানদের বাঁচাতে দেইর আল-বালাহতে একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানেই প্রাণ হারান।”

মানারের ভাষায়—

“গণহত্যা শুধু সংবাদমাধ্যমেই থেমেছে, কিন্তু আমাদের জন্য তা এখনো চলছে।”

গাজাবাসীর অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম। তাদের মতে, দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি গণহত্যা বাস্তবে এখনো শেষ হয়নি। প্রতিদিনই বোমাবর্ষণ, গোলাবর্ষণ, এবং ড্রোনের আতঙ্কে তারা কাটাচ্ছেন দিন।

অব্যাহত হামলা ও অবরোধ

গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই নতুন করে ধ্বংস হচ্ছে ঘরবাড়ি। খাবার ও ওষুধের সংকটও ক্রমেই বাড়ছে অবরোধের কারণে।

মানারের স্বামীও মারা গিয়েছিলেন গত বছর “ময়দার গণহত্যা” নামে পরিচিত এক ঘটনায়—যেখানে সাহায্য নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী।

এখন তিনি সন্তান ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে গাজা সিটির একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। “যেখানেই থাকি, নিরাপত্তা নেই,” বলেন তিনি। “প্রতিদিন সকালে পূর্ব দিক থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনি।”

যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন

১১ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে।
ইসরায়েল রাফাহ সীমান্তও এখনো বন্ধ রেখেছে, ফলে গুরুতর আহতদের মিশরে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অবরোধও প্রায় আগের মতোই চলছে—চুক্তি অনুযায়ী যেখানে দৈনিক ৬০০ ট্রাক সাহায্য প্রবেশের কথা ছিল, সেখানে গড়ে ১৫০ ট্রাকের বেশি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

গাজা সিটির বাসিন্দা আনাস মোঈন জানান, যুদ্ধবিরতির সময়েও ইসরায়েলি ড্রোনগুলো রাতে ভয়ঙ্কর শব্দ ও বিকৃত বার্তা সম্প্রচার করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।

“ড্রোন থেকে হঠাৎ বিকৃত শব্দ, অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বা বার্তা শোনা যায়—যেন মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্যই,” বলেন তিনি।

ইসরায়েলি সেনারা এমনকি “হামাসকে দেহ হস্তান্তর করো” বা “যুদ্ধবিরতি মেনে চলো”–এরকম বার্তা সম্প্রচার করছে, যা সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়।

“এই বার্তাগুলোর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায়—আমরা এখনো তোমাদের ওপর নজর রাখছি,” বলেন মোঈন।

‘হিস্টেরিক’ গুলিবর্ষণ

মোঈনের ভাষায়, “কখনও কখনও একজন সৈন্য ১৫ মিনিট ধরে ট্রিগারে আঙুল চেপে ধরে রাখে।”

১৯ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর গাজায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ আরও তীব্র হয়। ওইদিন রাফাহতে দুই ইসরায়েলি সৈন্য নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ভয়াবহ প্রতিশোধ নেয়, যাতে ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত১৫০ জন আহত হন।

“ইসরায়েলি সামরিক যান এখনো আমার বাড়ি থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে,” বলেন তিনি। “এটা আর সাময়িক হামলা নয়, এটা প্রতিদিনের বাস্তবতা।”

গাজায় যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাদের জন্য যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। তাদের চোখে—

“গণহত্যা থেমেছে শুধু সংবাদে, বাস্তবে তা এখনো চলছে।”


মুসলিম পোর্ট ডেস্ক