একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্র আর কেবল ট্যাংক, ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের পৃথিবীতে প্রতিটি বড় সংঘাতের সমান্তরালে চলে আরেকটি যুদ্ধ, যে যুদ্ধের লক্ষ্য মানুষের মন, বিশ্বাস এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে তাদের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যুদ্ধের ময়দানে হয়তো বড় একটি শহর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টায়, কিন্তু সেই ধ্বংসের অর্থ কী, কে ভুক্তভোগী, কে দায়ী, কার কণ্ঠ বিশ্ব শুনবে আর কার কণ্ঠ চাপা পড়ে যাবে; সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় স্রেফ তথ্যের উপর ভিত্তি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare) এবং ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার (Narrative Warfare)। তথ্যযুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তথ্য বাছাই করা ও প্রচার করা, বিভ্রান্তি তৈরি করা কিংবা প্রতিপক্ষের তথ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। আর ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার আরও সূক্ষ্ম এক লড়াই; এখানে অস্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক ঘটনাটি। প্রায়ই যা মিথ্যা বানোয়াট তথ্যই হয়ে থাকে।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য আমাদের গাজা যুদ্ধের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। সেখানে যেমন আকাশ থেকে বোমা পড়েছে, তেমনি একই সময়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মোবাইল ফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছে ভিডিও, ছবি, পরিসংখ্যান, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং অসংখ্য পরস্পরবিরোধী দাবি। যদিও ইজরায়েল সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছে মিথ্যা তথ্যের যুদ্ধে এগিয়ে থাকতে, কিন্তু স্পষ্ট গণহত্যামূলক আগ্রাসনের ফলে এক্ষেত্রে তাদের চেষ্টা আর ধোপে টিকছেনা। ধরুন- একটি শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে, এটি একটি ঘটনা। কিন্তু সেই ঘটনাটিকে “গাজা যুদ্ধের অনিবার্য ক্ষতি”, “হামাসের বিরুদ্ধে (তাদের ভাষায়- সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে) অভিযান”, অথবা “গাজার নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচার হামলা”; কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে? সেটিই ন্যারেটিভের প্রশ্ন।

চলমান যুদ্ধে গাজার মানুষেরা শুধু বোমা ও গণহত্যার মুখোমুখিই হচ্ছেনা, তারা এক বৈশ্বিক তথ্যযুদ্ধেরও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং স্বাধীন সাংবাদিকেরা যে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন, তার পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী প্রচেষ্টা চলেছে সেই বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ফলে সাধারণ পাঠকদের সামনে একই ঘটনার একাধিক সংস্করণও হাজির হয়েছে। সত্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়তো সব সময় সম্ভব নয়, কিন্তু সত্যের প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়া, অগ্রাধিকার পরিবর্তন করা কিংবা মানুষের আবেগকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া; এগুলোই আধুনিক তথ্যযুদ্ধের কার্যকর ও প্রধান একটি কৌশল।
একই চিত্র আমরা সুদানের ক্ষেত্রেও দেখতে পাই। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত, দুর্ভিক্ষ ও সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে; তবু বৈশ্বিক সংবাদচক্রে সুদান খুব কম সময়ই প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠেছে। কোনো কোনো সংকট আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রতিদিন আলোচিত হয়, আবার কোনো কোনো সংকট মাসের পর মাস লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। এই বৈষম্য কেবল সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতাই আমাদের সামনে প্রাসঙ্গিক করে তোলেনা, বরং এর পেছনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং তথ্যপ্রবাহের অসম কাঠামোর জটিলতাও আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে। যাদের কষ্ট ও দুর্দশার চিত্র ক্যামেরার সামনে আসে, তাদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই সহানুভূতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি; আর যাদের দূর্দশা দৃশ্যমানই হয় না, তারা তো ধীরে ধীরে বৈশ্বিক বিবেক থেকেই মুছে যেতে থাকে।
উইঘুর মুসলমানদের প্রসঙ্গও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। শিনজিয়াং অঞ্চলে নজরদারি প্রযুক্তি, পুনঃশিক্ষা কেন্দ্র, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক বহু বছর ধরে চলছে। কিন্তু এই ইস্যুতেও তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। একদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন, গবেষণা ও সাক্ষ্য; অন্যদিকে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার যুক্তি কাজ করছে। ফলে একজন সাধারণ পাঠক যখন তথ্য সংগ্রহ করতে যান, তখন তিনি কেবল স্রেফ তথ্য ছাড়াও পরস্পর বিরোধী ন্যারেটিভের মুখোমুখিও হন।
এই কারণেই আধুনিক যুদ্ধ বোঝার জন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র দেখলে হবে না, দেখতে হবে তথ্যের মানচিত্রও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কী দেখাচ্ছে, কোন ভাষার সংবাদ বেশি প্রচার পাচ্ছে, কোন ধরনের ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, কী ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে; এসবই এখন রাজনৈতিক শক্তির অংশ। গবেষক ম্যানুয়েল কাস্তেলস (Manuel Castells) তাঁর Network Society ধারণায় দেখিয়েছেন, তথ্যপ্রবাহের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা মানে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস নিয়ন্ত্রণ করা। আবার জোসেফ নাই (Joseph Nye)-এর Soft Power ধারণায় আমরা দেখেছি, মানুষকে জোর করে প্রভাবিত করার চেয়ে বিশ্বাস করিয়ে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত কার্যকর।
তবে এখানে একটি সতর্কতাও জরুরি। তথ্যযুদ্ধের যুগে নিজের পছন্দের ন্যারেটিভকে অন্ধভাবে গ্রহণ করাও বিপজ্জনক। কারণ প্রতিটি পক্ষই আবেগ, ধর্ম, জাতীয়তাবোধ কিংবা নিরাপত্তার ভাষা ব্যবহার করে জনমত গঠনের চেষ্টা করে। এজন্য একজন সচেতন পাঠকের কাজ হলো- নিজের মনুষ্যবোধ ও সহানুভূতি হারিয়ে না ফেলে বরং সহানুভূতির সঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে যুক্ত করা। গাজার শিশুদের কান্না, সুদানের ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ কিংবা উইঘুরের পরিবারগুলোর বিচ্ছেদের বেদনা; এসবকে তো গুরুত্ব দেওয়া মানবিক দায়িত্ব। একইসঙ্গে তথ্যের উৎস, প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য যাচাই এমনকি এসব ঘটনাকে আড়ালে ঠেলে দেওয়ার জন্য উদ্ভূত মিথ্যা ন্যারেটিভ সমূহ চিহ্নিত করতে পারাও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই এই প্রবন্ধে আমরা তথ্যযুদ্ধের বিভিন্ন দিক ও প্রক্রিয়া নিয়ে আলাপ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরী করার চেষ্টা করবো।
তথ্য থেকে ন্যারেটিভ সৃষ্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি
আধুনিক তথ্যযুদ্ধকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, তা হলো- তথ্য (Information) এবং ন্যারেটিভ (Narrative) এক জিনিস নয়। তথ্য হলো কোনো ঘটনা, সংখ্যা, ছবি, ভিডিও বা প্রত্যক্ষ বিবরণের মতো কাঁচা উপাত্ত; কিন্তু ন্যারেটিভ হলো সেই তথ্যগুলোকে একটি নির্দিষ্ট অর্থ, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে এমনভাবে সাজানো, যাতে মানুষ ঘটনাটিকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শুরু করে। অর্থাৎ তথ্য আমাদেরকে জানায় যে ঠিক কী ঘটেছে, আর ন্যারেটিভ ব্যাখ্যা করে যে কেন ঘটেছে, কারা নায়ক বা খলনায়ক, কার প্রতি সহানুভূতি জন্মানো উচিত, এবং ঘটনার নৈতিক অর্থ কী; এসব।
এই পার্থক্যটিই আধুনিক তথ্যযুদ্ধের কেন্দ্রীয় ভিত্তি। কারণ আজকের বিশ্বে তথ্যের অভাব নেই, বরং একই ঘটনাকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ তথ্য মুহূর্তের মধ্যে মানুষের সামনে পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই তথ্যের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি প্রেক্ষাপটসহ উপস্থাপিত হবে, কোনটি আড়াল থাকবে এবং কোন ব্যাখ্যাটি মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলবে; এসবই নির্ধারণ করে ন্যারেটিভ।
এই বিষয়ে গবেষক ও কৌশলবিদ অজিত মান (Ajit Maan) গুরুত্বপূর্ণ একটি তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি (Narrative Identity) এই ধারণাই ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ারের মূল ভিত্তি। মানুষ নিজের পরিচয়, ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং পৃথিবীতে নিজের অবস্থানকে যেসব গল্পের মাধ্যমে বোঝে, সেগুলিই তার ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি গঠন করে। তাই কোনো ব্যক্তি বা সমাজের বিশ্বাস ও আচরণ পরিবর্তন করতে চাইলে কেবল তথ্য সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেই মানুষের পরিচয় ও আত্মবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলোকেও প্রভাবিত করতে হয়।

অজিত মান আরও যুক্তি দেন যে, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare), তথ্য অপারেশন (Information Operations), প্রভাব বিস্তারমূলক কার্যক্রম (Influence Operations) কিংবা স্থিতিশীলতা অভিযান (Stability Operations); এসব আলাদা আলাদা কৌশল হলেও এগুলো ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ারের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। অর্থাৎ এগুলো নিজে চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং একটি বৃহৎ ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায়। তাঁর ভাষায়, যেমন সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের অংশ, তেমনি তথ্য ও প্রভাব বিস্তারের নানা কার্যক্রমও মূলত একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়।
একই ধরনের বিশ্লেষণ পাওয়া যায় মডার্ন ওয়ার ইনস্টিটিউটের গবেষণায়। তাদের মতে, তথ্যযুদ্ধকে শুধু “সত্য বনাম মিথ্যা” বা “তথ্য বনাম বিভ্রান্তি”র সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। বাস্তবে এটি অনেক বেশি গভীর। একই ঘটনার তথ্য বিভিন্ন পক্ষের কাছে একই রকম থাকতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যকে ঘিরে নির্মিত গল্প, ব্যাখ্যা এবং নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্নও হতে পারে। ফলে একটি সংঘর্ষের মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়- কোন তথ্য বা ঘটনাটি মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে এবং কোন ব্যাখ্যাটি জনমতকে প্রভাবিত করবে।
এই ধারণাকে আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মার্কিন কৌশলবিশ্লেষক পল কোবার (Paul Kober)। তাঁর মতে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই অর্থ-অনুসন্ধানী প্রাণী। পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, কিন্তু মানুষ সেই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা তথ্য হিসেবে মনে রাখে না, বরং সেগুলোকে একটি অর্থপূর্ণ গল্পের মধ্যে সাজিয়ে নিজের বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে। তাই কোনো ন্যারেটিভ যখন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন নতুন তথ্যও মানুষ প্রায়ই সেই বিদ্যমান ন্যারেটিভের আলোকে ব্যাখ্যা করতে থাকে। অন্য কথায়, মানুষ অনেক সময় তথ্যের ভিত্তিতে ন্যারেটিভ গড়ে না তোলে বরং আগে থেকে বিশ্বাস করা ন্যারেটিভের ভিত্তিতে তথ্যকে নিজের মতো করে একটি অর্থ দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
পল কোবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একটি সফল ন্যারেটিভ প্রচারণার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সরবরাহ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না, বরং এমন একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করা, যার মধ্যে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্দিষ্ট অর্থ গ্রহণ করতে শুরু করে। তখন আর প্রচারণার লক্ষ্য মানুষকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত বলে দেওয়া থাকে না; উলটো এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেই একটি কাঙ্ক্ষিত উপসংহারে পৌঁছে যায়।
এই কারণেই ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ারকে কেবল গণমাধ্যম বা প্রচারণার বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সিভিল অ্যাফেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন তাদের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছিল, তথ্য নিজে নিরপেক্ষ হতে পারে; কিন্তু যখন সেই তথ্যকে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের মধ্যে বসানো হয়, তখন সেটি সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। একটি কার্যকর ন্যারেটিভ জনগণের নিকট থেকে রাষ্ট্র, আইন, গণমাধ্যম কিংবা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা পুরোপুরি দুর্বল করে দিতে পারে; আবার একইভাবে জনগণকে কোনো রাষ্ট্র, আন্দোলন বা আদর্শের পক্ষে ঐক্যবদ্ধও করতে পারে। এজন্য, একটি সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শুধু তথ্যই থাকেনা, বরং সেই তথ্যের অর্থ সমূহকে কে নির্ধারণ করবে, এই প্রশ্নও বিদ্যমান থাকে।
পশ্চিমের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন ও সফট পাওয়ার
আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে জোসেফ নাই (Joseph S. Nye Jr.)-এর “সফট পাওয়ার” (Soft Power) ধারণা একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্র সব সময় সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে না যেয়েও শুধুমাত্র কোনো বিষয়ে আকর্ষণ (attraction), বৈধতা (legitimacy) এবং গ্রহণযোগ্যতা (credibility) তৈরি করেও অন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা জনগণের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ, যদি কোনো রাষ্ট্র তার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মূল্যবোধ, শিক্ষা, কূটনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির মাধ্যমে অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে বলপ্রয়োগ ছাড়াই সে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করতে সক্ষম হতে পারে।
এই ধারণা পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন (Strategic Communication) চিন্তাধারার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফলে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গটি আর শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, গণকূটনীতি (Public Diplomacy), হলিউড, বৈশ্বিক বিনোদনশিল্প, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম; সবই ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর যোগাযোগ-পরিবেশের অংশে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র তার মূল্যবোধ, অগ্রাধিকার ও বিশ্বদৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করে থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সফট পাওয়ারকে কেবল “ইতিবাচক আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু” হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। কারণ বাস্তবে আকর্ষণ, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নৈতিক বৈধতা- এসবই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার উৎস। যে রাষ্ট্র বৈশ্বিক জনমতকে নিজের পক্ষে আনতে পারে, সে অনেক সময় সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেও কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ কারণেই আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তথ্যপ্রবাহ, সংবাদ কাভারেজ, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং ডিজিটাল যোগাযোগকে ক্রমবর্ধমানভাবে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এই ধারণা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয় বটে। বিভিন্ন সমালোচনামূলক গবেষণাও আছে এর বিপরীতে। যারা যুক্তি দেন, বাস্তবে স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন এবং সফট পাওয়ার-এর মধ্যে অনেক সময় সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকে না। কোনো রাষ্ট্র যখন নিজের অবস্থানকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ধারাবাহিক যোগাযোগ, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক উপস্থাপন কিংবা ডিজিটাল প্রচারণা ব্যবহার করে, তখন সেটি কোথায় জনকূটনীতি (Public Diplomacy), কোথায় ন্যারেটিভ নির্মাণ (Narrative Building), আর কোথায় কৌশলগত প্রভাব বিস্তার (Strategic Influence), এই প্রশ্ন সহজে নির্ধারণ করা যায় না।
পপুলিজম স্টাডিজ-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে তথ্যযুদ্ধকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যবস্তুর অজান্তেই তার নির্ভরযোগ্য তথ্যের পরিবেশকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়, যাতে সে শেষ পর্যন্ত নিজের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে প্রভাব বিস্তারকারী পক্ষের কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সংজ্ঞাটি আবার কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা জোটের জন্য প্রণীত হয়নি; বরং তথ্যপ্রভাবের একটি সাধারণ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বলা যায় একে।
তবে বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি লক্ষণীয় প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়। পশ্চিমা নিরাপত্তা ও কৌশলগত গবেষণায় তথ্যযুদ্ধ বা ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ারের ধারণা সেখানে রাশিয়া, চীন কিংবা ইরানের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণেই অধিক ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব যোগাযোগ-কার্যক্রমকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রচার, তথ্যস্বচ্ছতা, পাবলিক ডিপ্লোমেসি বা স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ফলে প্রশ্ন করা হয়, একই ধরনের যোগাযোগ-কৌশল ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ার পেছনে কি কেবল উদ্দেশ্যের পার্থক্য কাজ করে, নাকি বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোও ভাষা ও পরিভাষার এই ব্যবহারে ভূমিকা রাখে? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। তবে তথ্যযুদ্ধ নিয়ে সমসাময়িক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যবহৃত প্রতিটি ন্যারেটিভ, প্রতিটি কৌশলগত বার্তা এবং প্রতিটি তথ্যপ্রবাহকে তার উৎস, উদ্দেশ্য, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
গাজা যুদ্ধ: এক জীবন্ত কেস স্টাডি
তথ্যযুদ্ধ ও ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ারের তাত্ত্বিক আলোচনা বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য গাজায় চলমান দখলদার ইজরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের চেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ খুব কমই রয়েছে। এই সংঘাতে যুদ্ধক্ষেত্র এবং তথ্যক্ষেত্র এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে যে, অনেক সময় মনে হয় একই যুদ্ধ দুটি ভিন্ন মঞ্চে একযোগে পরিচালিত হচ্ছে। একদিকে ধ্বংসস্তূপ, বিমান হামলা, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয়; অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কূটনৈতিক বিবৃতি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমান্তরালভাবে চলছে ন্যারেটিভের লড়াই। কে ভুক্তভোগী, কে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে, কে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং কার প্রতি বৈশ্বিক সহানুভূতি জন্মানো উচিত; এসব প্রশ্নের উত্তর এখন যুদ্ধক্ষেত্র ছাপিয়ে তথ্যপ্রবাহের মধ্যেও নির্ধারিত হচ্ছে।
হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মেহদি রিয়াজি বিষয়টি নিয়ে এভাবে মন্তব্য করেছেন যে, গাজার যুদ্ধ একই সঙ্গে দুটি অবিচ্ছেদ্য ফ্রন্টে পরিচালিত হচ্ছে। বাস্তবের রণাঙ্গনে এবং গণমাধ্যমের অঙ্গনে। তাঁর মতে, এই দ্বিতীয় ফ্রন্টে মূল অস্ত্রই হলো ন্যারেটিভ। কারণ জনমত, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বৈশ্বিক সহানুভূতি এবং রাজনৈতিক বৈধতা অনেকাংশেই নির্ভর করে কোন ব্যাখ্যাটি মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তার উপর। ফলে যুদ্ধের ফলাফলও শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত না হয়ে বরং তথ্য ও ব্যাখ্যার প্রতিযোগিতার মাধ্যমেও প্রভাবিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দখলদার ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের “হাসবারা” (Hasbara) কৌশল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। হিব্রু ভাষায় Hasbara শব্দের অর্থ “ব্যাখ্যা” বা “ব্যাখ্যা প্রদান”। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইজরায়েলের নীতিকে ব্যাখ্যা ও সমর্থন করার জন্য এই যোগাযোগ-কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের কাছে ইজরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, সামরিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
কিন্তু গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধ এই কৌশলের কার্যকারিতা পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দিয়েছে। এখন পশ্চিমা নীতিবিশ্লেষকদের একটি অংশও মনে করেন যে, গাজায় এতোবেশী ধ্বংসযজ্ঞ ইজরায়েল চালিয়েছে যে, তাদের প্রচলিত হাসবারা আর আগের মতো কার্যকর থাকার অবস্থা নেই। আমেরিকান ফরেন পলিসি কাউন্সিল-এর এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে হামাস আন্তর্জাতিক জনপরিসরে একটি শক্তিশালী জনপ্রিয় ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে গাজার মানবিক বিপর্যয়, বেসামরিক হতাহত এবং সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা নিয়ে বৈশ্বিক মনোযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইজরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানও আগের তুলনায় এখন অধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতার পর ইজরায়েলও তার তথ্য-কৌশলে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে আসছে, রাষ্ট্র পরিচালিত আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি, ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক, দ্রুত প্রতিক্রিয়াভিত্তিক বার্তা প্রচার এবং অনলাইন বয়ান ব্যবস্থাপনার ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এখন। ইজরায়েলের এই নতুন প্রবণতাকে অনেকে “নলেজ ওয়ার” বা জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে লক্ষ্য শুধুমাত্র তথ্য প্রকাশ ছাড়াও তথ্যের ব্যাখ্যা ও জনমতের গতিপথকে প্রভাবিত করা।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরব বিশ্বের গণমাধ্যম, বিশেষ করে আল জাজিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, গাজা যুদ্ধের সময় আল জাজিরা ধারাবাহিকভাবে মানবিক বিপর্যয়, বেসামরিক মানুষের জীবন, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির এবং অবরুদ্ধ জনগণের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে প্রতিবেদনের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এর ফলে আরব বিশ্ব ছাড়াও আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশে গাজার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দৃশ্যমান হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা মূলধারার সংবাদ কাভারেজের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবেই ভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি করে। তুলনামূলক মিডিয়া গবেষণাগুলোও এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। অনেক গবেষণায় দেখা যায়, পশ্চিমা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত ইজরায়েলকে নিরাপত্তা-হুমকির মুখে থাকা একটি রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে হামাসের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিপরীতে, আরব ও গ্লোবাল সাউথের অনেক সংবাদমাধ্যম এই সংঘাতকে প্রকৃতপক্ষেই দখলদারিত্ব, মানবিক সংকট এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ভোগান্তির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে। ফলে একই ঘটনার তথ্য অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন হলেও, তার ব্যাখ্যা, ভাষা এবং নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠেছে।
উদাহরণস্বরূপ, সিএনএন এবং আল জাজিরা ইংলিশ-এর সংবাদ কাভারেজ নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, আল জাজিরা হামাসের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থান দেয়, অন্যদিকে সিএনএন নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, সামরিক অভিযান এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অধিক গুরুত্ব দেয়। এর ফলে সংবাদ নির্বাচন, শব্দচয়ন, সাক্ষাৎকারের উৎস এবং ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন; সবকিছু মিলিয়ে দুই গণমাধ্যম একই যুদ্ধের দুটি ভিন্ন বাস্তবতা নির্মাণ করছে।
তবে গাজার তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই যে, এই সংঘাতে প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্র্যাডিশনাল সংবাদমাধ্যমের একচেটিয়া প্রভাবকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া শিশু, হাসপাতালের করিডরে চিকিৎসাহীন রোগী, ক্ষুধায় কাতর পরিবার কিংবা বাস্তুচ্যুত অসহায় মানুষের ভিডিও; এসব দৃশ্য কোটি কোটি মানুষ সরাসরি মোবাইল ফোনে দেখেছে। ফলে রাষ্ট্র বা বড় সংবাদমাধ্যমের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের ধারণা গঠনেও প্রত্যক্ষ দৃশ্য, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল সাক্ষ্যের ভূমিকা অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
এই কারণেই গাজা যুদ্ধকে কেবল একটি সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ চিত্র আমাদের কাছে অপরিপূর্ণ থেকে যাবে। এটি একই সঙ্গে একটি ন্যারেটিভের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রতিটি ছবি, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পরিসংখ্যান এবং প্রতিটি সংবাদ শিরোনাম আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের বৃহত্তর এক লড়াইয়ের অংশ। আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা হলো- আজ একটি ক্ষেপণাস্ত্র যেমন একটি ভবন ধ্বংস করতে পারে, তেমনি একটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের উপলব্ধি, সহানুভূতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। আর গাজার অভিজ্ঞতা আমাদের দেখাচ্ছে, বর্তমান যুগে এই দুই যুদ্ধই, অর্থাৎ সামরিক যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধ আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
তথ্যযুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট হলো অ্যালগরিদম, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ
একসময় যুদ্ধের সময় তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন। রাষ্ট্র চাইলে একটি সংবাদ প্রকাশে বাধা দিতে পারত, কোনো সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে পারত কিংবা নির্দিষ্ট বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে সেই বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষই একই সঙ্গে তথ্যের ভোক্তা (consumer) এবং তথ্যের উৎপাদক (producer)। একটি স্মার্টফোন হাতে থাকলেই একজন সাধারণ নাগরিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভিডিও ধারণ করে মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
আসলে এই পরিবর্তন তথ্যপ্রবাহকে গণতান্ত্রিক করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে আরও জটিলও করেছে। কারণ এখন তথ্যের প্রবাহ শুধু রাষ্ট্র একাই নিয়ন্ত্রণ করেনা, বরং অ্যালগরিদমও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অ্যালগরিদমই নির্ধারণ করে কোন পোস্ট বেশি মানুষের সামনে যাবে, কোন ভিডিও সুপারিশ করা হবে, কোন হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করবে এবং কোন বিষয় ধীরে ধীরে মানুষের নিউজফিড থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। ফলে তথ্যযুদ্ধের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সেই অদৃশ্য অবকাঠামোটি। এর কার্যপ্রণালি সম্পর্কেও অধিকাংশ ব্যবহারকারীরই খুব কম ধারণা রয়েছে।
আজ মেটা (Facebook ও Instagram), ইউটিউব, টিকটক, এক্স কিংবা অন্যান্য বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সমূহ কি স্রেফ প্রযুক্তি কোম্পানি? না। তারা বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী। প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন কনটেন্টের মধ্যে কোনটি দৃশ্যমান হবে, কোনটি কম মানুষের কাছে পৌঁছাবে, কোনটি সতর্কবার্তা পাবে কিংবা কোনটি সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হবে; এসব সিদ্ধান্ত মানুষের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) কনটেন্ট মডারেশন সিস্টেমও গ্রহণ করে। তাত্ত্বিকভাবে এই কনটেন্ট মডারেশনের উদ্দেশ্য হলো সহিংসতা উসকে দেওয়া, সন্ত্রাসবাদ, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া একদমই বিতর্কমুক্ত নয়। বিশেষ করে যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সবসময়ই আমাদের সামনে আসে- কোন কনটেন্ট আসলেও নিরাপত্তার জন্য সরানো হচ্ছে, আর কোন কনটেন্ট রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের কারণে সীমিত হয়ে যাচ্ছে?
গাজা যুদ্ধ এই বিতর্ককে বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বহু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক সমাজও আজ অভিযোগ করছেন যে, ফিলিস্তিন-সম্পর্কিত যেকোনো পোস্টের দৃশ্যমানতা কেন কমে যাচ্ছে, কিছু কনটেন্ট উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রোজই অপসারণ করা হচ্ছে, অথবা বড় একটি সংখ্যার পাবলিক অ্যাকাউন্ট এসব তথ্য প্রচারের জন্য প্রায়ই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বলেছে, তারা তাদের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সহিংস বা নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন, তা হলো- একই নীতিমালা কি সব ভাষা, সব অঞ্চল এবং সব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আদৌ সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত (Algorithmic Bias) নিয়ে গবেষণাগুলো দেখি। অ্যালগরিদম তো আর কোনো শূন্যস্থানে কাজ করে না! এটি মানুষের তৈরি তথ্য, ভাষা, নিয়ম এবং প্রশিক্ষণ-ডেটার ওপর নির্ভর করেই ফাংশন করছে। ফলে কোনো ভাষায় পর্যাপ্ত ডেটা না থাকা, কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সীমিত বোঝাপড়া অথবা নীতিমালার অস্পষ্টতা অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত বৈষম্য তৈরি করতে পারে। তবে অধিকাংশক্ষেত্রেই মালিকপক্ষের সেট করে দেওয়া তত্ত্ব ও তথ্যের বিপরীতে ইচ্ছাকৃতভাবেই এ্যালগরিদম রেস্পন্স করেনা। গবেষকরা এটিকে “অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত” বলে অভিহিত করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্যাডো ব্যানিং (Shadow Banning), অর্থাৎ কোনো ব্যবহারকারীর কনটেন্ট সম্পূর্ণ মুছে না দিয়েও তার সেই পোস্টটি রিচের পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সব সময় এই শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার না করলেও বিভিন্ন সময়ে ব্যবহারকারীরা, সাংবাদিক এবং গবেষকদের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। কারণ কোনো পোস্ট মুছে ফেলা হলে ব্যবহারকারী অন্তত তা বুঝতে পারেন; কিন্তু অ্যালগরিদম যদি নীরবে তার দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়, তাহলে সেই পরিবর্তন শনাক্ত করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যযুদ্ধের একটি বিপরীত বাস্তবতাও তৈরি করেছে। রাষ্ট্র বা বড় সংবাদমাধ্যম যেসব ঘটনা হয়তো পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না, সেগুলো সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৈশ্বিক আলোচনায় উঠে আসতে পারে। গাজার যুদ্ধের সময় হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির, ধ্বংসস্তূপ কিংবা ক্ষুধার্ত শিশুদের অসংখ্য ভিডিও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের কাছে পৌঁছেছে মূলত নাগরিক সাংবাদিকতা (Citizen Journalism) এবং স্বাধীন সাংবাদিকদের মাধ্যমেই। এর ফলে তথ্যপ্রবাহের ওপর প্রথাগত প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তবে এই একই প্রযুক্তি আবার ভুয়া তথ্য, সম্পাদিত ভিডিও, পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার, বট-নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানোর সুযোগও তৈরি করেছে। ফলে আধুনিক তথ্যযুদ্ধের একটি বড় বৈপরীত্য হলো- যে প্রযুক্তি সত্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, সেই প্রযুক্তিই আবার মিথ্যাকে নজিরবিহীন গতিতে বিস্তার লাভের সুযোগ করে দেয়।
এই বাস্তবতায় তথ্যযুদ্ধ আর কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রযুক্তি কোম্পানি, অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নাগরিক সাংবাদিকতা, স্বাধীন গবেষণা, প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং সাধারণ মানুষ; সবাই কোনো না কোনোভাবে এই বৈশ্বিক তথ্য-পরিবেশের অংশ। তাই আধুনিক যুদ্ধের প্রশ্নে “কে গুলি চালিয়েছে?” এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে: “কে নির্ধারণ করছে আমরা কী দেখব?”
একবিংশ শতাব্দীর তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। আগে বলা হতো, যে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে, সে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। ডিজিটাল যুগে সেই কথাটি আরও এক ধাপ এগিয়েছে- যে অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করে, সে মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে; আর যে মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে, সে অনেক ক্ষেত্রেই জনমত, নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই তথ্যযুদ্ধের এই নতুন যুগে কেবল তথ্য যাচাই করাই যথেষ্ট নয়; আমাদের বুঝতে হবে সেই তথ্য আমাদের সামনে কীভাবে, কেন এবং কার মাধ্যমে পৌঁছাচ্ছে।
মানবিক সংকটের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যারেটিভের রাজনীতি
আমাদের সামনে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আধুনিক সময়ের যুদ্ধবিগ্রহ আর শুধু ভূখণ্ডের দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভাষারও যুদ্ধ। একটি সংঘাতকে কী নামে ডাকা হবে, সেটিই অনেক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। একটি রাষ্ট্র যে ঘটনাকে “আত্মরক্ষার অধিকার” (Self-Defense) বলে ব্যাখ্যা করে, অন্য পক্ষ সেটিকে “দখলদারিত্ব” (Occupation), “সম্মিলিত শাস্তি” (Collective Punishment) বা “যুদ্ধাপরাধ” (War Crime) হিসেবে বর্ণনা করতে পারে। একইভাবে, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কেউ “সন্ত্রাসী সংগঠন” (Terrorist Organization) বলে, আবার কেউ যৌক্তিকভাবেই “প্রতিরোধ আন্দোলন” (Resistance Movement) বলে অভিহিত করে। এই শব্দগুলো আমাদের সামনে কেবল ভাষাগত পার্থক্য নির্ধারণ করে না; এগুলো আন্তর্জাতিক জনমত, কূটনীতি এবং আইনি অবস্থানকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এজন্য আন্তর্জাতিক আইন মূলত নিরপেক্ষ নীতিমালার ওপর দাঁড়ালেও, সেই আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। জেনেভা কনভেনশন, রোম সংবিধি (Rome Statute), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law); সবগুলোই বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষা, অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগের সীমা এবং যুদ্ধের নৈতিক নিয়ম নির্ধারণের চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সংঘাতে এসব আইনের লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের প্রশ্নে প্রায়ই রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়।
গাজা যুদ্ধ এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। যুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা, খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সীমিত প্রবেশাধিকার এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে ইজরায়েল সরকার তাদের সামরিক অভিযানকে হামাসের হামলার পর আত্মরক্ষার অধিকার এবং একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে একই ঘটনাকে ঘিরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
এখানেই ন্যারেটিভের শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ আন্তর্জাতিক আদালত কোনো রায় দেওয়ার বহু আগে থেকেই বৈশ্বিক জনমত গঠনের লড়াই শুরু হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যম, কূটনৈতিক বিবৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন, গবেষণা নিবন্ধ এবং রাজনৈতিক ভাষণ; সব মিলিয়েই এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রায়ই আদালতের রায়ের আগেই একটি নৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চললেও, ন্যারেটিভের আদালত অনেক দ্রুত রায় দিয়ে ফেলে। এই বাস্তবতা শুধু গাজার ক্ষেত্রেই নয়। বসনিয়া, রুয়ান্ডা, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান, ইউক্রেন কিংবা ইরান; প্রায় প্রতিটি বড় সংঘাতে দেখা গেছে, যুদ্ধের পাশাপাশি ভাষা ও পরিভাষা নিয়েও সমান্তরাল লড়াই চলে। কোন ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হবে, কোন পরিসংখ্যান উদ্ধৃত হবে, কার সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে, কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, এসব সিদ্ধান্ত জনমতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমানতার একটি রাজনীতি কাজ করে। কিছু সংকট বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন শিরোনাম হয়, আবার কিছু সংকট দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলকভাবে কম আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। সুদানের চলমান মানবিক বিপর্যয়, ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট বা চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলমানদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক এসব ক্ষেত্রেও আমরা গবেষকদের প্রশ্ন তুলতে দেখি, কেন কিছু মানবিক সংকট বৈশ্বিক আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্থান পায়, অথচ অন্য কিছু সংকট তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক থেকে যায়। এই বৈষম্যের পেছনে সংবাদমূল্য, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, গণমাধ্যমের কাঠামো এবং বৈশ্বিক মনোযোগের রাজনীতি; সবই ভূমিকা রাখতে পারে।
এই কারণে তথ্যযুদ্ধের যুগে আন্তর্জাতিক আইনকে শুধু আদালতের নথিতে খুঁজলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। আইনের পাশাপাশি দেখতে হয় কীভাবে আইনকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে, কে কোন ধারার ওপর জোর দিচ্ছে, কোন প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কোন তথ্যকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আইন ও ন্যারেটিভ প্রায়ই একে অপরকে প্রভাবিত করে। নৈতিক বৈধতা অনেক সময় কূটনৈতিক বৈধতারই পথ তৈরি করে, আর কূটনৈতিক বৈধতা ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়ার পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আজ একটি শিশুর মৃত্যু যেমন মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হতে পারে, তেমনি সেই একই শিশুর ছবি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ন্যারেটিভেও পরিণত হতে পারে। আধুনিক তথ্যযুদ্ধের যুগে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর অর্থ হলো সব পক্ষের দাবি সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা, আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং যেসব মানুষের কণ্ঠ ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যায়, তাদের অভিজ্ঞতাকেও ইতিহাসের অংশ করে তোলা।
আসলে ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই ক্ষমতার সঙ্গে তথ্যের সম্পর্ক ছিল খুব গভীর। রাজারা ইতিহাস লিখিয়েছেন, সাম্রাজ্য নিজেদের বিজয়ের কাহিনি রচনা করেছে, আর পরাজিতদের গল্প ইতিহাসের প্রান্তে প্রায় হারিয়েই গেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এই সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে। আজ আর তথ্যের অভাব নেই; বরং সমস্যা হলো তথ্যের প্রাচুর্য। প্রতিদিন কোটি কোটি সংবাদ, ভিডিও, ছবি, পরিসংখ্যান এবং মতামতের ভিড়ে সত্যকে খুঁজে বের করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। এজন্য যারা সত্যকে গ্রহণ করতে চায়, তারা সামরিক যুদ্ধে না গিয়েও সত্য-প্রবাহের জন্য ন্যারেটিভের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী, উম্মাহ, অঞ্চল কিংবা ভূরাজনীতির স্বার্থরক্ষার মহান যুদ্ধেও যোগদান করতে পারবে অবলীলায়।
সেইসাথে, একবিংশ শতাব্দীর চলমান তাবৎ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই যে, বোমা-বারুদ বা অস্ত্র হয়তো গোটা এক আস্ত শহর ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু ন্যারেটিভ মানুষের স্মৃতি নির্মাণ করতে পারে। হয়তো একটি যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়; কিন্তু সেই যুদ্ধের কারণ ও করণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে। তাই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানে কোনো পূর্বনির্ধারিত ন্যারেটিভকে গ্রহণ করা নয়; বরং মানবিক মর্যাদা, প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা। কারণ শেষ পর্যন্ত, সত্য কখনোই শুধু কয়েক শব্দের আক্ষরিক তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়, সত্য হলো একইসাথে তথ্য, প্রেক্ষাপট, মানবিক অভিজ্ঞতা এবং নৈতিক দায়িত্ব; এই চারটির মিলিত রূপ। আর সেই সত্যের সন্ধানই আধুনিক তথ্যযুদ্ধের যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
লিখেছেনঃ মুশফিকুর রহমান