মুসলিম পোর্ট

কোরআন নাযিলের মাস মাহে রমযান আমাদেরকে অনেক কিছুর জন্যই প্রতি বছর আমাদের মাঝে আগমন করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এসে থাকে। মানুষের স্বভাবই হলো ভুলে যাওয়া, তাই মহান আল্লাহও আমাদের প্রতি রহম করে বিভিন্ন ওসিলায় আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে থাকেন। এই জন্য আমরা যদি এই মাসে কিছু কিছু বিষয়কে স্মরণ করতে পারি এবং ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে এই মাসকে আমরা সঠিকভাবে পালন করার পন্থাও খুঁজে পাব।

রমযান আমাদেরকে কী স্মরণ করিয়ে দেয়?

অনেক বিষয়ই রমযান আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন—সময় নামক যে একটি নিয়ামত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে দিয়েছেন, এই বিষয়টি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। রমযানের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জন্য বরকত ও রহমতস্বরূপ। পবিত্র রমযান মাসে আমরা যে পরিমাণে আমাদের ঘড়ি দেখি, অন্য কোনো সময়ই আমরা তা করি না। কিন্তু আমরা যদি এই শিক্ষাকে আমাদের অন্য সময়েও কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে আমাদের জীবনটাই পাল্টে যেত।

আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস। বদরের সেই দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানগণ বদরের রূহকে নিজেদের মধ্যে জাগরুক রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।

এটা মূলত আমাদের প্রতি সাহাবীদের একটি উপদেশ। প্রখ্যাত সাহাবী সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস বলেন,
“আমরা কোরআনের একটি সূরাকে বোঝার জন্য যেভাবে প্রচেষ্টা চালাতাম, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর একটি গাযওয়াকেও বোঝার জন্যও আমরা একই রকম প্রচেষ্টা চালাতাম।”

কোরআনের একটি সূরাকে বোঝার জন্য সাহাবীদের মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল, রাসুল (সা.)-এর যুদ্ধ ও গাযওয়াসমূহকেও বোঝার জন্য—অর্থাৎ রাসুল (সা.)-এর সিরাতকেও বোঝার জন্য—তাদের মধ্যে সেই একই ধরনের আন্তরিকতা ছিল।

এর পেছনে কারণ কী?

এর কারণ হলো, রাসুল (সা.)-এর জীবনের বড় একটি অংশ এই গাযওয়াসমূহের সাথে সম্পৃক্ত। এই সকল গাযওয়ার মূল বার্তা ছিল মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে—

  • বদর যুদ্ধকে ভালোভাবে বোঝার অর্থ হলো সূরা আনফালকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝা।
  • উহুদ যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝার অর্থ হলো সূরা আলে ইমরানকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝা।
  • খন্দকের যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝার অর্থ হলো সূরা আহযাবকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝা।
  • হুদায়বিয়া ও মক্কা বিজয়কে ভালোভাবে পড়া ও বোঝার অর্থ হলো সূরা আল-ফাতহকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝা।
  • তাবুক ও হুনাইনকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝার অর্থ হলো সূরা তাওবাকে ভালোভাবে পড়া ও বোঝা।

এই জন্য আমরা যখন এই সকল যুদ্ধকে ভালোভাবে পড়ি, তখন মূলত রাসুল (সা.)-এর জীবন কিভাবে জীবন্ত কোরআনে পরিণত হয়েছিল, সেটা বুঝে থাকি। সাহাবীগণ এই বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করার কারণে কোরআনকে যেভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবনকেও বোঝার জন্য সেভাবেই প্রচেষ্টা চালাতেন।

সাহাবীদের মতো সমগ্র বিশ্বের মুসলমানরাও ১৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে রাসুল (সা.)-এর এই সকল যুদ্ধ ও গাযওয়াকে বোঝার জন্য নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে আমরা কেন যেন এই সকল বিষয়ে একটু কম গুরুত্ব দিচ্ছি। অথচ বদরকে আমাদের অন্তরে জাগরুক করে রাখার জন্য বদর দিবসকে ভালোভাবে পালন করা এবং এই দিবস উপলক্ষে সেমিনার ও সভার আয়োজন করা দরকার।

আজকে আমি আমার এই আলোচনায় বদরের পাঁচটি তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব—

১. বদর হলো গোমরাহী ও হেদায়েতের মধ্যে, ঈমান ও কুফরের মধ্যে, ইখলাসের সাথে নিফাকের মধ্যে গভীরভাবে পার্থক্যকারী একটি যুদ্ধের নাম।

এর দলিল কী? এর দলিল হলো মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের ৪১ নম্বর আয়াত। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন বদরকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (يَوْمُ الْفُرْقَانِ) বলে অভিহিত করেছে।

‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (يَوْمُ الْفُرْقَانِ) কী? ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ হলো পার্থক্য করার, ফয়সালা করার দিন।

কিসের মধ্যে পার্থক্য করেছে? ঐ দিন পর্যন্ত কি ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য রচিত হয়নি?

যারা ঈমান এনেছিল তারা তো মদিনাতে হিজরত করে চলেই এসেছিল। তাহলে কোরআন কেন এই দিনকে এমন একটি নামে নামকরণ করল?

এখানে যে বিষয়টির কারণে কোরআন ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ বলেছে তা হলো—যারা ঈমান এনেছিল তাদের দিক থেকে হক ও বাতিল, ঈমান ও কুফরের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না। সন্দেহ ছিল না বলেই তারা ইসলাম গ্রহণ করার শুরুর দিন থেকেই অনেক ত্যাগ-কোরবানি দিয়ে আসছিলেন।

সন্দেহ ছিল কাফির ও মুশরিকদের দলে। তারা তখনও ভাবত, যারা তাদের বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে চলে গেছে তারা একদিন নিজেদের ভুল বুঝে পুনরায় ফিরে আসবে। কিন্তু বদরের পরে তাদের এই আশায় গুড়েবালি পড়ে।

বদরের পর মুশরিকরা এই কথা স্বীকার করে নেয় যে, এরা আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। মুহাজির সাহাবীগণ তাদেরকে এই যুদ্ধে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের এই সংগ্রাম দুনিয়াবি কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়, সাময়িক চটকদার কোনো কিছুর জন্য নয়। তাদের এই সংগ্রাম হলো দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

২. বদর হলো গনীমত ও আসাবিয়াতের (জাতীয়তাবাদ, গোত্রপ্রীতি) বিরুদ্ধে তাওহীদ ও আকীদার সংগ্রামের নাম।

মরক্কোর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ আবিদ আল-জাবিরী বলেন, বিশ্বমানবতা আজ পর্যন্ত যত যুদ্ধ করেছে, এর মূল কারণ ছিল তিনটি। যুদ্ধের পেছনে হয়তো আকীদাগত দ্বন্দ্ব ছিল, না হয় গনীমতগত স্বার্থ ছিল, আর না হয় আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতি (জাতীয়তাবাদ, জাতীয় স্বার্থ)। এই তিনটির বাইরে আর অন্য কোনো কারণে কোনো যুদ্ধ হয়নি।

বদরের ময়দানে সেই বীর সাহাবীগণ কেন এসেছিলেন?

তারা এসেছিলেন ঈমান ও তাওহীদের চিন্তাকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সকল মানুষের কাছে ইসলামের আকীদাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

মক্কার মুশরিকরা কেন এসেছিল?

তাদের এক অংশ এসেছিল গনীমতের জন্য, অপর অংশ এসেছিল আসাবিয়াত বা গোত্রপ্রীতির কারণে।

৩. বদর হলো যারা বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকে তাদের জন্য নয়; বরং যারা বাঁচিয়ে রাখার জন্য বেঁচে থাকে তাদের যুদ্ধ ছিল এই বদর।

এটা কী?

এটা হলো নবীদের একটি আখলাকের নাম। সবাই এই কাজ করতে পারে না। হয়তো নিজের সন্তানের জন্য কিংবা নিজের ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করতে পারেন—কিন্তু এটা হলো বেঁচে থাকা; এর নাম বাঁচিয়ে রাখা নয়।

আর অন্যটি হলো বাঁচিয়ে রাখা।

এই কথা বলতে শেখা—
“দরকার হলে আমি নিজেকে উৎসর্গ করব, তবুও আমাদের উম্মাহ যেন বেঁচে থাকে। আমি না খেয়ে থাকব, কিন্তু আমার ভাই যেন খেতে পারে। আমার পরে যারা আসবে তারা যেন সুখে থাকে—এই জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেব।”

আমরা মুসলমানরা এটাকে ‘ইছার’ বলে থাকি।

যার অর্থ হলো—বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা নয়, বাঁচিয়ে রাখার জন্য বেঁচে থাকা।

বদরের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের ভূমিকাকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলেই আমরা এর প্রমাণ পাই।

৪. বদর হলো ইসলামের জন্য, উম্মাহর জন্য কী করা সম্ভব—তা প্রমাণ করে দেওয়ার নাম।

সমগ্র উম্মাহ ১৫০০ বছর যাবত যা করছে, সেটা তো বদরের সেই ৩১৩ জন মহান সাহাবীর ত্যাগের বদৌলতেই।

তাদের কাছে খুব বেশি কিছু ছিল না। ৩১৩ জনের জন্য মাত্র ১০০টি সওয়ারি ছিল। নবী করিম (সা.)-সহ তিনজনের ভাগে একটি করে সওয়ারি ছিল। মরুপ্রান্তরে তিনজন পালাক্রমে একটি সওয়ারির পিঠে উঠেছেন।

কোন তিনজন কোন সওয়ারির পিঠে উঠবে, এটা রাসুল (সা.) বলে দেন। হজরত আলী (রা.), হজরত মারসাদ (রা.) ও রাসুল (সা.) একটি সওয়ারি নেন।

হজরত আলী (রা.) ও হজরত মারসাদ (রা.) পরামর্শ করেন যে তারা সওয়ারির পিঠে উঠবেন না, যাতে রাসুল (সা.)-কে হাঁটতে না হয়।

তারা এই প্রস্তাব নিয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলে রাসুল (সা.) জবাবে বলেন—
“কেন? আমার চেয়ে তোমাদের কি বেশি আছে? তোমরা যদি আল্লাহর পথে তোমাদের পা ধুলামলিন করে সওয়াব অর্জন করতে চাও, তাহলে আমিও তো আল্লাহর পথে নিজের পা ধুলামলিন করতে চাই।”

তাদের জোর করার পরও তিনি তাদের সাথে পালাক্রমে একই সওয়ারিতে ওঠেন।

কাফেরদের দুইশত ঘোড়া ছিল, আর মুসলমানদের ছিল মাত্র দুটি। একটি ছিল জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর কাছে, আর অপরটি ছিল মিকদাদ ইবন আমর (রা.)-এর কাছে।

রাসুল (সা.) মুশরিকদের দুইশত অশ্বারোহীকে মোকাবিলা করার জন্য একজনকে সেনাবাহিনীর ডান পাশে আর অপরজনকে বাম পাশে নিয়োজিত করেন।

কিন্তু তাদের এই সংগ্রাম ছিল রিসালাত-ই মুহাম্মদির জন্য। তাদের এই সংগ্রাম ছিল ইসলামের জন্য।

৫. বদরের যুদ্ধ ছিল—হয় টিকে থাকার, না হয় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যুদ্ধ।

যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দোয়া করেন—

“হে আল্লাহ! ক্ষুদ্র এই দলটি যদি আজ শেষ হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত তোমার নাম নেওয়ার মতো কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

রাসুল (সা.)-এর এই দোয়া থেকেই স্পষ্ট হয়, বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কত ভয়াবহ ছিল। মহান আল্লাহ দয়া করে সেদিন ফেরেশতাদের দ্বারা মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন।

এখন একটি প্রশ্ন—বদর কি শেষ হয়ে গিয়েছে?

বদরসমূহ কোনো দিনই শেষ হবে না। আবু লাহাব ও আবু জাহলরা যতদিন এই দুনিয়াতে থাকবে, ততদিন বদরও থাকবে। আবু লাহাব ও আবু জাহলরা যেহেতু শেষ হবে না, সেহেতু বদরসমূহও শেষ হবে না।

তাই আসুন, বদরের সাহাবীদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামী সভ্যতাকে পুনরায় বিজয়ী সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই।

মূলঃ শায়েখ আমীন ইলদিরিম
অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন