সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশারে গিয়ে এক যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আরএসএফ (Rapid Support Forces) কর্মকর্তাকে আলিঙ্গন করার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজ আরাবিয়া–এর সাংবাদিক সাবিহ মুবারক।

গত সপ্তাহান্তে মুবারক এল-ফাশারে গিয়ে প্রতিবেদনে অংশ নেন, যেখানে সম্প্রতি আরএসএফ সেনারা শহরটি দখল করেছে। আরএসএফ ও সুদানি সেনাবাহিনী (SAF)-এর মধ্যে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে চলা গৃহযুদ্ধে শহরটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
দুই সপ্তাহ আগে এল-ফাশারে প্রবেশের সময় আরএসএফ বাহিনী ভয়াবহ গণহত্যা চালায়, যা স্যাটেলাইট চিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানেও প্রমাণিত। বেঁচে ফেরা বহু নারী ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিতর্কিত ভিডিও ও আলিঙ্গনের মুহূর্ত
সাবিহ মুবারক নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় এল-ফাশারের নারীদের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি আরএসএফ কর্মকর্তা সিরাজ খালিদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন এবং হাসিমুখে বলছেন, “এটা আমাদের দেশ, আমরা তোমার সঙ্গে আছি।”
কিন্তু এই সিরাজ খালিদই সম্প্রতি এক ভাইরাল ভিডিওতে সেনাদের উদ্দেশে বলেন—
“উত্তর প্রদেশে (Northern State) যাবো শুধু নারীদের জন্য, তাদের বংশধারা পরিশুদ্ধ করতে।”
এই বক্তব্যকে নারীদের ধর্ষণে উসকানি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আরএসএফ-কে ইতিমধ্যেই মাসালিত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।
সমালোচনার ঝড়
মুবারকের এই আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুদানের প্রতিনিধি ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা।
সুদানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি আম্মার মাহমুদ বলেন—
“স্কাই নিউজ আরাবিয়া আরএসএফ মিলিশিয়াদের গণহত্যা আড়াল করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এ বিষয়ে নজর দিক।”
আরএসএফের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ সম্ভব নয়
এল-ফাশারে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে, শহর ঘিরে তৈরি করা হয়েছে কাদা-মাটির দেয়াল ও চেকপোস্ট। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ২ লাখের বেশি সাধারণ মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
সুতরাং মুবারকের সেখানে প্রবেশ আরএসএফের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইউএই-র সঙ্গে যোগসূত্র ও রাজনৈতিক পক্ষপাত
সাবিহ মুবারকের স্বামী ইব্রাহিম আল-মিরঘানি, যিনি সুদানি রাজনীতিক এবং যুদ্ধ চলাকালীন আরএসএফপন্থী হিসেবে পরিচিত। তিনি একটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন যা আরএসএফ-নেতৃত্বাধীন সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
সম্প্রতি মুবারক সোশ্যাল মিডিয়ায় ইউএই-কে রক্ষা করে পোস্ট দিয়েছেন এবং যুদ্ধের দায় মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর চাপিয়েছেন।
তিনি লেখেন—
“ইউএই বা অন্যদের দায়ী করা ইতিহাস বিকৃতি মাত্র। প্রকৃত দায় সুদানি সেনাবাহিনী ও ইসলামিক মুভমেন্টের।”
স্কাই নিউজ আরাবিয়া’র মহাব্যবস্থাপক নাদিম কোটেইচ-ও ইউএই-র বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাবে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন।
ইউএই ও আরএসএফের সম্পর্ক
স্কাই নিউজ আরাবিয়া হলো যুক্তরাজ্যের স্কাই গ্রুপ ও ইউএই-র ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ইনভেস্টমেন্টস (IMI)-এর যৌথ উদ্যোগ।
এই আইএমআই নিয়ন্ত্রণ করেন ইউএই-র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের ভাই মানসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, যিনি ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের মালিক।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর তথ্যমতে, মানসুরই আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেদতি)-কে অস্ত্র সহায়তার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, ইউএই লিবিয়া, চাদ ও উগান্ডার মাধ্যমে আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং সুদানের ভেতরে তাদের দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সুদানি গৃহযুদ্ধে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত ও ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুদ্ধের মূল সূত্রপাত হয় আরএসএফ বাহিনীকে সরকারি সেনাবাহিনীতে একীভূত করার পরিকল্পনা ঘিরে।
এরপর থেকেই দেশটি গণহত্যা, ধর্ষণ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে।