হামাসের শীর্ষ নেতা খলিল আল-হাইয়া বলেছেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইজরায়েল গাজায় গণহত্যা চালালেও কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি। শনিবার (২৫ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
খলিল আল-হাইয়া বলেন, ‘দখলদার শক্তি (ইসরাইল) দুই বছর যুদ্ধ চালিয়েও তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।’
এ সময় তিনি ইসরাইলের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো উল্লেখ করেন। যার অন্যতম হলো—গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণ দখল করা এবং সেখানকার ২০ লক্ষাধিক বাসিন্দাকে জোরপূর্বক উৎখাত করা, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া গণহত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল।
ইসরাইল দাবি করেছিল, এই যুদ্ধের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বন্দিদের মুক্ত করা, কিন্তু সেটিও তারা বাস্তবে অর্জন করতে পারেনি। হাইয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য টেনে বলেন, ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুদ্ধ শেষ’ এবং যোগ করেন যে, প্রতিদিন আমেরিকান কর্মকর্তারা এমন ধরনের একই রকম বিবৃতি দিচ্ছেন।
এছাড়াও তিনি চুক্তিভঙ্গের দিকেও ইঙ্গিত করেছেন, বিশেষ করে ইসরাইলেল গাজায় ত্রাণ সামগ্রী প্রবেশে বাধা দেওয়ার কথা। তার ভাষ্য, ‘যেন আমরা এখনও যুদ্ধের মাঝেই আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবিক পরিস্থিতি আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে, এবং দখলদার শক্তি গাজার মধ্যে সহায়তা পৌঁছাতে অবৈধ বাধা সৃষ্টি করে যাচ্ছে।’
শীর্ষ এই হামাস নেতা আরও বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর হামাস ইসরাইলকে ফের আগ্রাসনের কোনো অজুহাত দেবে না।’
হাইয়া জানান, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসের ফলে মৃত জিম্মিদের লাশ উদ্ধার করা কঠিন হলেও হামাস চুক্তির শর্তানুসারে বাকি জিম্মিদের লাশ ফিরিয়ে দেবে।
প্রতিরোধ বাহিনীর অস্ত্র ইস্যু নিয়ে হাইয়া বলেন, ‘এই অস্ত্র দখল ও আগ্রাসনের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। দখলদারিত্ব শেষ হলে এই অস্ত্র রাষ্ট্রের অধীনে চলে যাবে।’
সংযুক্তিঃ
ড. খলিল আল-হায়া: “গাজা জনগণের ত্যাগ ও দৃঢ়তাই দখলদার ইজরায়েলের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করেছে”
গাজায় হামাসের নেতা ও রাজনীতিক ব্যুরোর সদস্য ড. খলিল আল-হায়া আল-জাজিরা টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের ভূমিতে অবিচল থেকে অকল্পনীয় ত্যাগ ও আত্মদান করেছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর দমননীতির বিরুদ্ধে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন,
“দখলদার ইজরায়েল আমাদের জনগণকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনি প্রশ্নের অবসান ঘটাতে চেয়েছিল, কিন্তু জনগণের দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের সাহসী ভূমিকার কারণে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। ‘তুফানুল আকসা’ এবং ৭ অক্টোবর-পরবর্তী ঘটনাবলি আমাদের জাতীয় অধিকার অর্জনের ভূমিকা তৈরি করেছে।”
আল-হায়া আরও জানান, ইজরায়েল তার সামরিক অভিযানগুলোর কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি। তিনি মনে করেন, “দখলদার বাহিনীর এখন আর যুদ্ধ পুনরায় শুরুর কোনো প্রেরণা নেই, কারণ বিগত দুই বছরে তারা কিছুই অর্জন করতে পারেনি— ফিলিস্তিনি জনগণের অটল প্রতিরোধের কারণেই।”
তিনি উল্লেখ করেন, “গাজা প্রায় ১০ শতাংশ জনগণকে শহীদ, আহত, বন্দি বা নিখোঁজ অবস্থায় হারিয়েছে— এটি এক অত্যন্ত কঠিন পরিসংখ্যান।”
আল-হাইয়া বলেন, হামাস ও প্রতিরোধ শক্তি যুদ্ধ পুনরায় শুরুর কোনো অজুহাত দখলদার বাহিনীকে দিতে চায় না। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যুদ্ধ ফেরাতে দখলদার ইজরায়েলকে অনুমতি দেবে না, যদিও তারা পুনর্গঠন ও সহায়তা প্রবেশে কিছু বাধা সৃষ্টি করতে পারে।”
অন্যদিকে, সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় অংশে আল-হায়া বলেন, হামাস যুদ্ধবিরতির ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ২০ জন ইজরায়েলি বন্দিকে—সক্রিয় ও রিজার্ভ উভয় সদস্য—হস্তান্তর করেছে এবং এতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে।
তিনি জানান,
“দখলদার বাহিনীর জিম্মি মৃতদেহগুলোর অবস্থান নির্ধারণে জটিলতা রয়েছে, কারণ ইজরায়েল গাজার ভূমির প্রকৃতি বদলে ফেলেছে। এমনকি যারা এসব দেহ মাটি দিয়েছিল তাদের কেউ কেউ শহীদ হয়েছে বা অবস্থান ভুলে গেছে।”
তবুও হামাস এখন পর্যন্ত ২৮টি মৃতদেহের মধ্যে ১৭টি ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করেছে, এবং বাকি ১৩টির সন্ধান এখনো চলছে।
আল-হায়া বলেন, প্রতিরোধ যোদ্ধারা দিনরাত নিরলসভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। মিসর, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী ও রেড ক্রসের উপস্থিতিতে কায়রোতে একটি যৌথ অপারেশন সেল কাজ করছে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধি রয়েছে।
তিনি জানান, “সাম্প্রতিক চুক্তির অধীনে মিসরীয় দিক থেকে অনুসন্ধান সরঞ্জাম আনা হয়েছে এবং নতুন কিছু এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, যার কিছু ইজরায়েলি দখলকৃত ‘লাল অঞ্চলের’ ভেতরে অবস্থিত। আশা করা হচ্ছে, আগামীকাল এসব এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হবে।”
শেষে আল-হায়া জোর দিয়ে বলেন, “আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ যে কোনো মৃতদেহ অবহেলিত থাকবে না। হামাস ও প্রতিরোধ বাহিনী সর্বোচ্চ দায়িত্ব নিয়ে অনুসন্ধান চালাবে, এবং দখলদার যেন এই অজুহাতে আমাদের জনগণকে আরও কষ্ট না দেয়।”
ড.খলিল আল-হায়া: “গাজা প্রশাসন হস্তান্তরে আমরা প্রস্তুত, জাতীয় ঐক্য ও পুনর্গঠন এখন সবচেয়ে জরুরি”
গাজায় হামাসের নেতা ও রাজনীতিক ব্যুরোর সদস্য ড. খলিল আল-হায়া রবিবার আল-জাজিরা টেলিভিশনের “আল-মুকাবালা” অনুষ্ঠানে বলেন, “ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রশ্ন কেবল হামাসের নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির। আমরা ফাতাহসহ সব ফিলিস্তিনি সংগঠনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছি।”
তিনি জানান, ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে হামাসের যে ঐক্যমত্য হয়েছে, তা মূলত ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে পূর্বে আলোচিত বিষয়েরই সম্প্রসারিত রূপ। “আমাদের প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে প্রথমেই যে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে, তা হলো—একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠনের উদ্যোগ, যা মিশরীয় মধ্যস্থতাকারীরা তত্ত্বাবধান করছেন। এই কমিটি গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে। আমরা মিশরের প্রস্তাবিত নামগুলোর তালিকায় সম্মতি দিয়েছি এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছি যে, আমরা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।”
আল-হায়া আরও বলেন, “প্রায় চার মাস আগে আমরা মিশরীয় ভাইদের হাতে ৪০ জনেরও বেশি জাতীয় ও নির্দল ব্যক্তিত্বের তালিকা দিয়েছি। আমরা বলেছি, তারা চাইলে এই তালিকা থেকে যেকোনো ব্যক্তিকে বেছে নিতে পারেন। ভবিষ্যতের প্রশাসনিক কমিটির অধীনে একটি বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীও থাকবে, যা পুরো গাজা পরিচালনা করবে।”
তিনি জানান, “কমিটি গাজার সব প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রমের পূর্ণ দায়িত্ব নেবে। গাজার বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো তাদের অধীনে কাজ করবে এবং নতুন কমিটিই গাজার আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।”
আল-হায়া আরও বলেন, “আমরা জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে এমন আন্তর্জাতিক বাহিনী প্রেরণে সম্মত হয়েছি, যারা যুদ্ধবিরতি রক্ষা ও সীমান্ত পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। তাদের কাজ হবে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো পক্ষের লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা—তবে গাজার অভ্যন্তরে তাদের কোনো কার্যক্রম থাকবে না।”
তিনি আরব ও ইসলামি দেশগুলোকেও এই আন্তর্জাতিক বাহিনীতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।https://t.me/muslimportBD/10671
পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে আল-হায়া বলেন, “আমরা ফিলিস্তিনি সব দলগুলোর সঙ্গে একমত হয়েছি যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তাদের কাজ হবে অর্থ সংগ্রহ, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্গঠনের তদারকি করা। আমরা চাই এই প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হোক।”
শেষে তিনি বলেন, “আমরা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে, মানবিক সহায়তার ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে চাই, এবং অবিলম্বে পুনর্গঠন শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আমাদের অনুরোধ—এখনই পুনর্গঠন শুরু করা হোক।”