সুদানের দারফুর অঞ্চল আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখলে নেওয়ার পর শুরু হয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। এল-ফাশার শহর দখলের পর স্থানীয়দের ওপর হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের যে বর্ণনা সামনে আসছে, তা দারফুর গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, পরিস্থিতি এখন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
১৮ মাসের অবরোধ শেষে গত ২৬ অক্টোবর উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে দখল করে নেয় আরএসএফ। এটি ছিল পুরো অঞ্চলে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি। শহর পতনের পর থেকে হাজারো মানুষ নিখোঁজ, অনেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পাশের শহর তাওইলায়। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, আরএসএফ সদস্যরা মানুষ খুঁজে খুঁজে হত্যা করছে এবং নারী-শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা চালাচ্ছে।
তাওইলায় আশ্রয় নেওয়া আলখেইর ইসমাইল বলেন,
“আমাদের ৩০০ জনের দলকে আরএসএফ থামায়। আমার এক বিশ্ববিদ্যালয়-সহপাঠী আমাকে চিনে বলেছিল, ‘ওকে মেরে ফেলো না’। কিন্তু আমার সঙ্গে থাকা সবাইকে তারা গুলি করে হত্যা করে।” অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী তাহানি হাসান জানান, “তারা আমাদের মারধর করে, পোশাক ছিঁড়ে ফেলে, এমনকি নারীদেরও তল্লাশি করে।”
পাঁচ দিন হেঁটে তাওইলায় পৌঁছানো ফাতিমা আবদুর রহিম বলেন, “তারা ছেলেদের পেটায়, সব লুট করে নেয়। আমাদের পরের দলে আসা মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে বলে শুনেছি।” রাওয়া আবদাল্লা নামে এক তরুণী জানান, তার বাবা নিখোঁজ, জীবিত না মৃত কেউ জানে না।
আরএসএফ প্রধান মোহামেদ হামদান দাগালো (হেমেদতি) বুধবার রাতে বক্তৃতায় তার বাহিনীকে বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষার নির্দেশ দেন এবং অপরাধের তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে জাতিসংঘ মানবিক বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, “আরএসএফের কথার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।”
চিকিৎসা সহায়তাকারী সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, পালিয়ে আসা অনেককে লিঙ্গ, বয়স ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে বন্দি করা হচ্ছে। অনেককে ৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ সুদানি পাউন্ড মুক্তিপণ না দিলে হত্যা করা হচ্ছে। এমএসএফের তথ্যে, ২৭ অক্টোবর তাওইলায় আসা ৭০ শিশুর প্রত্যেকেই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। সংস্থাটির ভাষায়, “মানুষগুলো পালানোর সময় হয়তো হত্যা করা হচ্ছে, অথবা তাড়া খেয়ে মরছে।”
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) নিশ্চিত করেছে, ২৯ অক্টোবর আরএসএফ সদস্যরা এল-ফাশার মাতৃত্ব হাসপাতালে অন্তত ৪৬০ জনকে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে ছিল রোগী, দর্শনার্থী, স্বাস্থ্যকর্মী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ। সংস্থাটির আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
এদিকে দারফুরের পাশের রাজ্য উত্তর করদোফানেও আরএসএফের দখলের পর নতুন সংঘাত শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ জানায়, শুধু বারা অঞ্চল থেকেই ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়েছে। পাঁচজন রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবককে হত্যা এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের মুখপাত্র মোহাম্মদ এলশেখ আল জাজিরাকে বলেন, “মানুষ বারা থেকে এল-ওবেইদ পর্যন্ত মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছে ভয়াবহ গরমে ও রাতের প্রচণ্ড ঠান্ডায়। তাদের অনেকেই পথে মারা যাচ্ছে।”
জাতিসংঘ বলছে, দারফুর থেকে করদোফান—সব জায়গায় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যুদ্ধের দেড় বছরে দশ হাজারের বেশি নিহত ও ১৪ মিলিয়নের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সুদান দ্রুত এক ভয়াবহ ধ্বংসযুদ্ধে নিমজ্জিত হতে পারে।