মুসলিম পোর্ট

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনবিশ্ব শিশুদিবস | ২০ নভেম্বর ২০২৫

বিশ্বজুড়ে সংঘাত-সহিংসতায় গত বছরে শুধু গাজাতেই প্রায় ১২ হাজার শিশু নিহত বা আহত হয়েছে, যার ৭০ শতাংশই বিস্ফোরক অস্ত্রের কারণে—এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
২০০৬ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এ সংখ্যাই সর্বোচ্চ। ২০২০ সালের তুলনায় শিশুহত্যা-অঙ্গহানি বেড়েছে ৪২ শতাংশ

গাজাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ শিশুহত্যার ঘটনা ঘটছে গাজায়, যেখানে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। ইউনিসেফের হিসেবে, ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজায় ৬৪ হাজারের বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে।

গাজার হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। প্রতিবেদন বলছে, গাজায় বর্তমানে “আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিশু অঙ্গহীনতার ঘটনা” দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির পরও থামছে না হামলা

১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি আক্রমণে কমপক্ষে ৪৬ শিশু নিহত হয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, শুধু ২০২৪ সালেই গাজায় বিস্ফোরক হামলায় প্রতি মাসে গড়ে ৪৭৫ শিশু আজীবন অক্ষমতার ঝুঁকিতে পড়েছে—যেমন অঙ্গচ্ছেদ, জটিল হাড় ভাঙা, মারাত্মক পুড়ে যাওয়া, শ্রবণশক্তি হারানো ইত্যাদি।

সংস্থাটির উপদেষ্টা নারমিনা স্ট্রিশেনেটস বলেন,
বিশ্ব শিশুদের শৈশবকে নিশ্চিহ্ন করতে দেখছে—এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। বোমা পড়ছে যেখানে তারা ঘুমায়, খেলে, শেখে।”

শহরকেন্দ্রিক যুদ্ধে শিশুদের ভয়াবহ ক্ষতি

আগে যুদ্ধক্ষেত্রে শিশুদের মৃত্যু-ঝুঁকি ছিল অপুষ্টি, রোগব্যাধি বা স্বাস্থ্যসেবার সংকটে। কিন্তু এখন যুদ্ধ চলে আসছে শহরের ভেতরে—হাসপাতাল, স্কুল ও বাসাবাড়িতে বোমা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। শিশুদের ছোট দেহ ও সংবেদনশীল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কারণে বিস্ফোরণের আঘাত তাদের জন্য অনেক বেশি প্রাণঘাতী

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞ পল রিভলি জানান—
শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিস্ফোরণজনিত আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের চিকিৎসা দীর্ঘ, জটিল এবং বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়।

সুদান, ইউক্রেন ও মিয়ানমারেও ভয়াবহ পরিস্থিতি

গাজা ও পশ্চিম তীরের পর শিশুদের পর সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাত চলছে সুদানে। দেশটিতে ১ কোটি শিশু সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করছে।
এদিকে, ২০২৩ সালে যেখানে ১,২০০ শিশু নিহত বা আহত হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৭৩৯—এক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি

ইউক্রেনে বিস্ফোরণে আহত শিশুদের সংখ্যা ৭০ শতাংশ বেড়ে ২০২৩ সালের ৩৩৯ থেকে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৭৭ জনে

বিস্ফোরকের প্রভাব বহু বছর স্থায়ী

প্রতিবেদন সতর্ক করেছে যে যুদ্ধ শেষ হলেও বিপদের শেষ নেই—অনেক এলাকায় রয়ে যাচ্ছে অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলা, যা যেকোনো সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি বুল বলেন,
“এ ধরনের আঘাতের চিকিৎসা শুধু অস্ত্রোপচার নয়—শিশুরা যেন ভবিষ্যতে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।”

বিশ্বজুড়ে সংঘাতের ধরন যেভাবে বদলাচ্ছে, সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে—
“আন্তর্জাতিক সমাজের নৈতিক অবস্থান ভয়াবহভাবে বদলে গেছে। একসময় যে নৃশংসতা বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দার জন্ম দিত, আজ তা ‘যুদ্ধের খরচ’ হিসেবে স্বাভাবিক করে দেখা হচ্ছে।”