আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল আবারও নতুন সংঘাতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবেশী ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যকার বিবৃতি–বাগ্যুদ্ধ ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দ্রুতই বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। বহু বছরের শত্রুতা, অসম্পূর্ণ শান্তি চুক্তি এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ দুই দেশের সম্পর্কে আবারও অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উপনিবেশ ও তিন দশকের স্বাধীনতা যুদ্ধ
ইরিত্রিয়া ছিল ইতালির উপনিবেশ। ১৯৫২ সালে দেশটি জাতিসংঘের অনুমোদনে ইথিওপিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু এই সংযুক্তিই শুরু করে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের। প্রায় ৩০ বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৯১ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখা দিলেও তা বেশিদিন টেকেনি। আসাব ও মাসাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর যৌথ ব্যবহারের আশায় শুরু হওয়া অর্থনৈতিক বিনিময় দ্রুতই সন্দেহ ও উত্তেজনায় রূপ নেয়।
১৯৯৮ সালের ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে দুই দশকের উত্তেজনা
১৯৯৮ সালে সীমান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। দুই বছরের এই যুদ্ধে নিহত হয় কয়েক হাজার মানুষ; বাস্তুচ্যুত হয় লক্ষাধিক। যুদ্ধ শেষ হলেও শান্তি আসেনি—বরং দুই দশক জুড়ে সম্পর্কের ভাঙন অমীমাংসিতই থেকে যায়।
২০১৮-এর শান্তিচুক্তি ও নোবেল পুরস্কার: স্বস্তির পর নতুন অস্থিরতা
২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ইথিওপিয়ার পুরোনো সীমান্ত রায় মেনে নিলে দুই দেশের মধ্যে শান্তির নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এ জন্য আবিকে নোবেল শান্তি পুরস্কারও দেওয়া হয়। কিন্তু এই অগ্রগতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
টিগ্রে যুদ্ধ: বোঝাপড়া ভাঙনের সূচনা
২০২০ সালে টিগ্রের তিগ্রায়ান পিপল’স লিবারেশন ফ্রন্ট (TPLF) ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে সেনাঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর শুরু হয় নতুন যুদ্ধ।
ইরিত্রিয়া এই যুদ্ধে ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকারকে সামরিক সহযোগিতা দেয়। কিন্তু ২০২২ সালের প্রিটোরিয়া চুক্তি—যা টিগ্রে যুদ্ধের অবসান ঘটায়—ইরিত্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে আলোচনার বাইরে রেখে সম্পন্ন হয়। এতে ইরিত্রিয়ার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ে।
শিক্ষাবিদ মাইকেল ওল্ডেমারিয়ামের মতে, ইরিত্রিয়ার দৃষ্টিতে প্রিটোরিয়া চুক্তি TPLF–কে বাঁচিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
ইথিওপিয়ার ‘রেড সি’ প্রবেশাধিকারের দাবি: উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র
ইথিওপিয়া ১২ কোটি মানুষের দেশ, কিন্তু সমুদ্রবন্দর নেই। একসময় ইরিত্রিয়ার আসাব বন্দর ব্যবহার করলেও স্বাধীনতার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী আবি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন—লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার পাওয়া “ইথিওপিয়ার অস্তিত্বের প্রশ্ন।” তিনি বলেন, প্রয়োজনে “বলপ্রয়োগ” করেও এই দরজা খুলতে হবে।
ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জর্জরিত ইথিওপিয়া বন্দরের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগাড়ের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে ইরিত্রিয়ার দাবি, ইথিওপিয়ার পূর্ববর্তী দখলদারিত্বের স্মৃতি থেকেই তাদের ভীতি—এবং আসাব বন্দর কোনোভাবেই ইথিওপিয়ার নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে না।
ইরিত্রিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
ইথিওপিয়া বহুদিন ধরে দাবি করছে যে ইরিত্রিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে এবং বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। এটিও দুই দেশের সম্পর্ক অস্থির করে তুলছে।
সমুদ্রবন্দর নিয়ে সোমালিয়া–ইথিওপিয়া টানাপোড়েন
সমুদ্রপথ খুঁজতে ইথিওপিয়া ২০২৪ সালে সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাকামী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে বারবেরা বন্দর ব্যবহারের চুক্তি করে, যা সোমালিয়া সরকারের ক্ষোভের কারণ হয়। বিষয়টি নিয়ে তুরkiye মধ্যস্থতা করে ২০২৪ সালে আংকারা ঘোষণার দিকে এগোয়, যেখানে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ভিতরেই বন্দর সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইথিওপিয়া শেষ পর্যন্ত আবারো আসাব বন্দরের দিকেই ঝুঁকছে।
মধ্যস্থতা ছাড়া উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা নেই
ওল্ডেমারিয়ামের মতে, দুই দেশের অভ্যন্তরে টিগ্রে, আমহারা ও আফার অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তিনি মনে করেন,
“মধ্যস্থতা ছাড়া উত্তেজনা কমানো সম্ভব নয়।”
যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, গালফ দেশগুলো এবং তুরkiye—এই সব শক্তিই এখন হর্ন অঞ্চলের নিরাপত্তা রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি আফ্রিকান ইউনিয়নকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
সুদানের মতো বহুপক্ষীয় সমন্বিত মধ্যস্থতার মাধ্যমে ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সংকটেও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের পথ অনিশ্চিত, কূটনৈতিক সমাধানই বাস্তবসম্মত
বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয় দেশেরই সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি, এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের ফলাফল অনুমান করাও কঠিন।
তাই দুই দেশের নেতৃত্ব এখন বুঝতে পেরেছে—সমুদ্রবন্দর ব্যবহার, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অভিযোগ নিয়ে আলোচনাই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ।