২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় পানি সরবরাহের অবকাঠামো একের পর এক ধ্বংস হয়েছে। কূপ, পানির পাইপলাইন, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা—যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে এসব অবকাঠামোর বড় একটি অংশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ পানি অবকাঠামো বর্তমানে আর কার্যকর নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের ওপর। নিরাপদ পানীয় পানির সংকটে প্রতিদিন নতুন করে মানবিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি এবং গাজায় কর্মরত চিকিৎসা সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিস্থিতিটির একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়।
ধ্বংসের হিসাব কতটা ভয়াবহ?
গাজার পানি ব্যবস্থার বিপর্যয় শুধু কয়েকটি স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো সরবরাহব্যবস্থাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজা শহরে পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত ৮৬টি কূপের মধ্যে ৭২টি ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েল থেকে গাজায় পানি সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ‘মেকোরোট’ পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতির কারণে গাজা শহরের মোট পানি সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে।
লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মাধ্যমে উৎপাদিত পানির পরিমাণ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় নেমে এসেছে মাত্র ৭ শতাংশে। ইসরায়েল থেকে গাজায় প্রবেশ করা তিনটি প্রধান পানির পাইপলাইনের মধ্যে দুটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্থানে ফুটো হওয়ার কারণে সরবরাহকৃত পানির প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে হিসাব করা হয়েছে।

গাজার সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা মোট ১৯৬টি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের ৬০ শতাংশের বেশি এখন বোমা হামলা কিংবা প্রবেশাধিকার সীমিত থাকার কারণে অকার্যকর। এর মধ্যে ১২৫টি প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে, গাজার মোট ৩৯২টি পানির কূপের মধ্যে ২৫৫টি হয় অচল, নয়তো মানুষের নাগালের বাইরে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে সামরিকীকৃত এলাকা ও বাস্তুচ্যুতি নির্দেশ। গাজার প্রায় ৭৯ শতাংশ পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো বর্তমানে সামরিকীকৃত এলাকার মধ্যে পড়েছে অথবা সেসব এলাকায় মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে কোনো স্থাপনা আংশিকভাবে টিকে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেখানে পৌঁছে মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইসরায়েলের দ্বিমুখী কৌশল
গাজার পানি সংকটের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় একই সঙ্গে কাজ করছে। একদিকে অবকাঠামো ধ্বংস, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ সীমিত করা।
দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলো যেগুলোকে বিভিন্ন মানচিত্রে ‘ইয়েলো’ ও ‘অরেঞ্জ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, গাজার মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশেরও বেশি। পানি অবকাঠামোর বড় একটি অংশ এই এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে। ফলে কোনো স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস না হলেও সেটি মেরামতের জন্য সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উত্তর গাজায় ধ্বংসের মাত্রা আরও ব্যাপক।

সেখানে ৭০টি বড় পানির কূপ ও পানি শোধনাগার, ১৫০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক এবং প্রায় ৫০ হাজার দুনাম কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে। এর অর্থ হলো, পানি সংকট শুধু মানুষের পানীয় জলের ওপর প্রভাব ফেলছে না; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং পুরো জনজীবনের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।
পানি সরঞ্জাম ঢোকাতেও বাধা
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সরঞ্জাম গাজায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তৈরি হয়েছে নতুন বাধা। গাজায় কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা Médecins Sans Frontières (MSF) বা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’—পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জাম, পাম্প, পাইপ এবং পানি পরিশোধনের জন্য ক্লোরিন প্রবেশের অনুমতি চেয়ে যে আবেদনগুলো করেছে, তার ৩৩ শতাংশ হয় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, নয়তো কোনো উত্তরই দেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালের জুন থেকে ডিস্যালিনেশন সরঞ্জাম প্রবেশের জন্য করা আবেদনগুলোর মধ্যে মাত্র প্রতি ১০টির একটির অনুমোদন পাওয়া গেছে। অনুমোদিত সরঞ্জামও সীমান্তে পৌঁছানোর পর দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ প্রবেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় ধরে অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিছু সরঞ্জাম—যেমন ডিস্যালিনেশন মেমব্রেন ও পানি পরিশোধন ফিল্টার—এক মাসে অনুমোদিত হলেও পরের মাসে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। এসব পরিবর্তনের কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেনারেটর ও পানির ট্যাংকার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিও ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে কোনো স্থাপনা টিকে থাকলেও সেটি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ কিংবা রাসায়নিক না থাকায় তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
গাজায় মানুষের দৈনিক পানি ব্যবহারের পরিমাণ নেমে এসেছে প্রতি ব্যক্তি ৩ থেকে ৫ লিটারে। কিছু এলাকায় মানুষকে দিনে মাত্র ২ লিটার পানি দিয়ে চলতে হচ্ছে বলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাবে, জরুরি পরিস্থিতিতে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৫ লিটার পানি প্রয়োজন। আর মানুষের পান করা, রান্না, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মিলিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক প্রয়োজন ৫০ থেকে ১০০ লিটার।
অর্থাৎ, গাজার অনেক মানুষ এখন জরুরি অবস্থায় WHO নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণেরও অনেক নিচে পানি ব্যবহার করছে। MSF প্রায় ৬৫ হাজার মানুষকে প্রতিদিন মাথাপিছু মাত্র ৭.৫ লিটার পানি সরবরাহ করতে পারছে—যা WHO-এর নির্ধারিত জরুরি ন্যূনতম চাহিদারও অর্ধেক। পানি এখন সেখানে শুধু পানীয় নয়; প্রতিটি ফোঁটা হিসাব করে ব্যবহার করার বিষয়।
পানির সঙ্গে ঢুকছে বিষ
পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার পাশাপাশি গাজার মানুষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে পানিদূষণের সঙ্গেও। গাজার ভূগর্ভস্থ পানির ৯০ থেকে ৯৭ শতাংশ পানযোগ্য নয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্ষতি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দূষণ। প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সমুদ্র ও আশপাশের ভূমিতে ফেলা হচ্ছে।

ফলে পানির সংকটের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ব্যাপক পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। পরিস্থিতির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো মানুষের বসবাসের পরিবেশ। প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবার খোলা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য, জমে থাকা পানি কিংবা ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে—এমন এলাকার ১০ মিটারের মধ্যে বসবাস করছে।
পানি নেই, নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন নেই, বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা নেই—সব মিলিয়ে গাজায় সংক্রামক রোগ ছড়ানোর জন্য প্রায় আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পানির সংকট থেকে রোগের বিস্তার
পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই MSF ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ৮৬ হাজার চিকিৎসা পরামর্শ দিয়েছে। এই শিশু রোগীরাই মোট রোগীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

তাদের মধ্যে ছিল শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগের হাজার হাজার রোগী। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে MSF পরিচালিত তিনটি ক্লিনিকে চর্মরোগের চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশই ছিল ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ, পানি ও স্যানিটেশন সংকটের প্রভাব শুধু তৃষ্ণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি শিশুদের রোগব্যাধি ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নবজাতকদের মৃত্যুও বাড়ছে
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে নবজাতকরা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত MSF-সমর্থিত হাসপাতালগুলোতে ১১২ জন নবজাতকের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে নবজাতক বলতে এক মাসের কম বয়সী শিশুকে বোঝানো হয়েছে।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার পতন, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, অপুষ্টি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে গাজার শিশুদের জন্য একটি গভীর মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পানি তাই এখানে কেবল একটি মৌলিক মানবিক চাহিদা নয়। এটি হয়ে উঠেছে জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা।
কূপ ধ্বংস হলে পানি কমে যায়। পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরবরাহ বন্ধ হয়। ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ হলে সমুদ্রের পানি পানযোগ্য করার সুযোগ থাকে না। জ্বালানি না থাকলে জেনারেটর চলে না। আর বর্জ্যপানি পরিশোধনের ব্যবস্থা ধ্বংস হলে অবশিষ্ট পানিও দূষিত হয়ে পড়ে। ফলে গাজায় পানি সংকট একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়—এটি অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পরিবেশ ও মানুষের বেঁচে থাকার সংকটকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।
যেখানে একটি মানুষ প্রতিদিন ৫০–১০০ লিটার পানির স্বাভাবিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়ে মাত্র ৩–৫ লিটার পানিতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, সেখানে পানি আর কেবল পানি থাকে না— তা পরিণত হয় অস্তিত্বের প্রশ্নে!
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান