আজ থেকে ছয় শতাধিক বছর আগে ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমায় সমাজ, রাষ্ট্র, ভূগোল ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে যে ধারণাগুলো তুলে ধরেছিলেন, আজকের আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতেও সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান হরমুজ সংকট বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দিতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
চতুর্দশ শতকে মুসলিম উম্মাহর প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবীদ ইবনে খালদুন আল-মুকাদ্দিমা বা দ্য ইন্ট্রোডাকশন গ্রন্থে এমন কিছু ধারণা উপস্থাপন করেন, যা আজও রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাবশালী। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘আসাবিয়্যাহ’—অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে থাকা পারস্পরিক সংহতি, ঐক্য ও সম্মিলিত পরিচয়বোধ।

তবে ইবনে খালদুনের চিন্তার বিষয় শুধু সামাজিক সংহতি ছিল না। তাঁর মতে, ভূগোল ও জলবায়ুর পাশাপাশি সামাজিক সংহতিও রাজনৈতিক বিকাশ এবং সামরিক সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় পর বর্তমান হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনায় তাঁর এই ধারণাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা যেন নতুন করে সামনে এসেছে। সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিশাল ব্যবধান থাকলেও, তেহরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য এমন কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা ইবনে খালদুনের তত্ত্বের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
দুজে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী এবং ইবনে খালদুনের চিন্তাধারার বিশেষজ্ঞ কাদির জানাতান TRT World-কে বলেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা আধুনিক যুগে ইবনে খালদুনের একটি মৌলিক ধারণাকেই আবার সামনে এনেছে—ইতিহাস শুধু নেতাদের ইচ্ছা কিংবা সেনাবাহিনীর আকার দিয়ে তৈরি হয় না; বরং মানুষ ও রাষ্ট্র যে ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর কাজ করে, সেটিও ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।
সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও ইরানের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক দুর্বল প্রতিপক্ষ ইরানের কারণে পারস্য উপসাগরে ওয়াশিংটন নিজেই কিছুটা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। কারণ ইরানের রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে সরু অংশে মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত। এই পথ দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পরিবহন হয়। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে হরমুজে সামান্য বিঘ্নও শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়তে পারে উপসাগরীয় রাজনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে।

জানাতানের ভাষায়, ইবনে খালদুন আজ বেঁচে থাকলে হরমুজকে সম্ভবত এমন একটি সমসাময়িক উদাহরণ হিসেবে দেখতেন, যেখানে ভূগোল সরাসরি রাজনীতি ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
কয়েক কিলোমিটারের জলপথ কীভাবে পরাশক্তিকে চাপে ফেলে?
কোনো সংঘাত কোথায় সংঘটিত হচ্ছে, তার ওপর সামরিক শক্তির বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে ভূগোল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বিপুল হলেও হরমুজের আশপাশে ইরানের দীর্ঘ উপকূল, কাছাকাছি দ্বীপপুঞ্জ, নৌঘাঁটি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা দেশটিকে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা দেয়।
ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে উন্মুক্ত সমুদ্রে পরাজিত করা জরুরি নয়।
জানাতানের মতে, কয়েকটি জাহাজের চলাচল ঝুঁকির মুখে ফেলা, সমুদ্রে মাইন থাকার আশঙ্কা তৈরি করা কিংবা বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি হিসাব বদলে দেওয়াই বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতি কমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
অর্থাৎ, একটি সংকীর্ণ জলপথের ওপর ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ এমন একটি আঞ্চলিক শক্তিকে বৈশ্বিক পরাশক্তির ওপরও চাপ তৈরির সুযোগ দেয়।
ভূগোল কি তাহলে ভাগ্য নির্ধারণ করে?
হরমুজের বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির চেষ্টা করছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। কিন্তু এসব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। ফলে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটপথগুলোর যেকোনো একটি অল্প সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলেও তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স মিলস মার্চ মাসে লিখেছিলেন, হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট তৈরি হতে পারে। তার মতে, ইরান দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা একটি দেশ তুলনামূলক কম খরচে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা এখন নিজেই একটি কৌশলগত অস্ত্র। তবে মিলস আরও সতর্ক করেছেন, ইরানের অর্থনীতি দুর্বল এবং দেশটির নৌবাহিনীও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে একই ধরনের ভৌগোলিক সুবিধা যদি আরও শক্তিশালী অর্থনীতি কিংবা অত্যাধুনিক নৌবাহিনীর হাতে থাকে, তাহলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে খালদুনের চিন্তাধারাকে জনপ্রিয় ‘ভূগোলই ভাগ্য’— এই এক বাক্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না।
‘Geography is destiny’ কথাটি প্রায়ই ইবনে খালদুনের নামে প্রচলিত হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি তাঁর কোনো লেখায় এই কথাটি সরাসরি ব্যবহার করেননি।
জানাতানও ভূগোলকে ভাগ্য হিসেবে দেখার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
তাঁর মতে, ইবনে খালদুনের চিন্তায় ভূগোল ছিল বৃহত্তর একটি কাঠামোর মাত্র একটি অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আসাবিয়্যাহ বা সামাজিক সংহতি, মুলক বা সংগঠিত সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সম্পদ।
অর্থাৎ, অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান একা কোনো দেশকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে পরিণত করতে পারে না। এর সঙ্গে দরকার শক্তিশালী সামাজিক সংহতি, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা। ইরান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি চাপের মধ্যেও যে প্রতিরোধক্ষমতা দেখিয়েছে, তার পাশাপাশি দেশটি অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মতো বড় দুর্বলতার মুখোমুখিও রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাত কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
হরমুজ সংকট নিয়ে ইবনে খালদুন কতটা প্রাসঙ্গিক?
সময়ের বিশিষ্ট দার্শনিক ও গবেষক ডক্টর তাহসিন গোরগুনও বর্তমান হরমুজ সংকটের সঙ্গে ইবনে খালদুনের চিন্তার কিছু মিল দেখতে পান। তাঁর মতে, ইবনে খালদুন কখনো ভূগোলকে রাজনৈতিক বিষয়ের একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখেননি। তিনি ভূগোলের সঙ্গে জলবায়ু ও ভূমির গঠনকেও বিবেচনায় নিয়েছিলেন।

তবুও গোরগুন মনে করেন, হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের ভূগোলসংক্রান্ত চিন্তার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো কোনো রাষ্ট্রের হাতে অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকলেও হরমুজ প্রণালির মতো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাধার মুখোমুখি হলে সেই সামরিক শক্তিরও সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেহমেত আকিফ কায়াপিনার মনে করেন, বর্তমান হরমুজ সংকটে ইবনে খালদুনের তত্ত্বকে সরাসরি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার।
কারণ তাঁর বিশ্লেষণ মূলত দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিকাশ বোঝার জন্য তৈরি হয়েছিল; বর্তমান হরমুজ সংকটের মতো স্বল্পমেয়াদি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নয়। তবে কায়াপিনারও মনে করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বরাজনীতিতে ভূগোল আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বলকান ও ককেশাসের মতো অঞ্চলের সংঘাত এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তার উদাহরণ। ভূগোলের এই নতুন গুরুত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক গবেষণাও হয়েছে। রবার্ট কাপলানের The Revenge of Geography গ্রন্থটি এ বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরির অন্যতম উদাহরণ।
উপসাগরীয় ভূগোলও গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজের গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিয়া-প্রধান ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সুন্নি-প্রধান আরব দেশগুলোর জটিল সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান—তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ এসব দেশ ইরানের ঠিক বিপরীত পাশে উপসাগরের তীরে অবস্থিত।
ফলে ইরানের সঙ্গে তাদের ভৌগোলিক সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উপসাগরীয় অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করতে দেয় এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখে। একই সময়ে তারা ইরানের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এই ভারসাম্যের কারণেই বর্তমান সংকটের আগ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন মূলত সচল রাখা সম্ভব হয়েছিল।
প্রফেসর ডক্টর তাহসিন গোরগুনের মতে, ভৌগোলিক নৈকট্য বিভিন্ন পক্ষকে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করে। এমনকি শত্রুতারও একটি সীমা থাকে।
তাই ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো যদি নিজেদের পারস্পরিক ভৌগোলিক নৈকট্য নিয়ে কিছুটা চিন্তা করে, তাহলে তারা বুঝতে পারে যে শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানমূলক সম্পর্ক সবার স্বার্থেই ভালো। গোরগুন ইরান ও তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর বৃহত্তর উত্তেজনার মধ্যেও ইবনে খালদুনের চিন্তার মিল দেখতে পান। এর মধ্যে জর্ডানের মতো দেশও রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
ইরানের ‘আসাবিয়্যাহ’ বনাম উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্ভরতা
গোরগুনের মতে, পারস্যের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিচয় এবং শিয়া রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কারণে ইরানের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আসাবিয়্যাহ বা সামাজিক সংহতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর যুক্তি হলো—উপসাগরীয় অনেক রাজতন্ত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা শক্তিগুলোর তৈরি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ফলে তাদের সামাজিক সংহতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

ইবনে খালদুনের তত্ত্বের আলোকে গোরগুন আরও বলেন, প্রাক-ইসলামি আরব গোত্রগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী রাষ্ট্র গড়ে তোলার মতো যথেষ্ট সামাজিক সংহতি ছিল না। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মীয় বার্তার মাধ্যমে তারা বৃহত্তর ঐক্যে আবদ্ধ হওয়ার পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
বর্তমান সময়ে এই কাঠামো প্রয়োগ করে গোরগুনের যুক্তি হলো—কিছু উপসাগরীয় রাজতন্ত্র তাদের নিরাপত্তার জন্য বহিরাগত শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইবনে খালদুনের দৃষ্টিতে এ ধরনের নির্ভরতা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তার অংশীদারিত্ব দেশটির ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
গোরগুন বলেন, যে শক্তি নিজের ভৌগোলিক গভীরতা সম্পর্কে সচেতন এবং যার মধ্যে শক্তিশালী আসাবিয়্যাহ রয়েছে, সে তার প্রকৃত সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি প্রদর্শন করতে পারে।
ইবনে খালদুনের চিন্তার মধ্যেই এই ধারণাটি নিহিত রয়েছে। তিনি আজ বেঁচে থাকলে সম্ভবত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান উত্তেজনাকেও এই কাঠামোর মধ্যেই বিশ্লেষণ করতেন। জানাতানও এই বিষয়ে একমত।
তাঁর মতে, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি থাকলেই শক্তিশালী সামাজিক সংহতিকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন—শুধু আসাবিয়্যাহ থাকলেই কোনো দেশের বিজয় নিশ্চিত হয় না।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ ও সুশাসনের সমর্থন না থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সংহতিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত ইবনে খালদুনের চিন্তার আলোকে প্রশ্নটি তাই কে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মালিক—সেটি নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, কে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনগণের ধৈর্য এবং মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখতে পারবে?
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত যেন সেই পুরোনো সত্যটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—মানচিত্রের ওপর কয়েকটি সরু রেখা কখনো কখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তির ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে।
কার্টেসি: TRT world
অনুবাদ: মেহেদী হাসান