‘এক চীন’ নীতিতে বিশ্বাসী বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ চীন। বেইজিংয়ের অবস্থান হলো—তাইওয়ান চীনেরই অংশ এবং একদিন যেকোনো মূল্যে দ্বীপটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে, তাইওয়ান নিজস্ব সরকার, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে কার্যত একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হচ্ছে।
এই দ্বন্দ্ব অবশ্য নতুন নয়। এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, চীনের গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পরিবর্তন, বিশ্বশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, বিশ্ববাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের মতো নানা বিষয়।

তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের শুরু
সতেরো শতকে কিং রাজবংশের শাসনামলে তাইওয়ান প্রথমবারের মতো পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে।
এরপর ১৮৯৫ সালে প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে চীন পরাজিত হলে তাইওয়ান জাপানের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। প্রায় পাঁচ দশক জাপানের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে জাপানের দখলে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে এবং তাইওয়ানও চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে।
কিন্তু এর কয়েক বছরের মধ্যেই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ আবার বদলে যায়।
চীনের গৃহযুদ্ধ: দুই চীনের জন্ম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনের মূল ভূখণ্ডে আবার তীব্র গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
একদিকে ছিল চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকার ও তার দল কুওমিনটাং (KMT)। অন্যদিকে ছিল মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CCP)।
দীর্ঘ সংঘর্ষের পর ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয়। মাও সে তুং বেইজিংয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (People’s Republic of China) প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্যদিকে, চিয়াং কাইশেক ও তার কুওমিনটাং বাহিনীর একটি বড় অংশ মূল ভূখণ্ড ছেড়ে তাইওয়ানে চলে যায়।
তাইওয়ানে গিয়ে তারা ‘রিপাবলিক অব চায়না (ROC)’ নামে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তারা নিজেদের শুধু তাইওয়ানের সরকার হিসেবে ঘোষণা করেনি; বরং নিজেদেরকে পুরো চীনের বৈধ ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার হিসেবে দাবি করে।
এভাবেই একই সময়ে দুটি সরকার নিজেদের ‘চীনের বৈধ সরকার’ হিসেবে দাবি করতে শুরু করে—একটি বেইজিংয়ে, অন্যটি তাইপেতে।
জাতিসংঘে কোন চীন ছিল?
গৃহযুদ্ধের পরও দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তাইওয়ানভিত্তিক ROC সরকারই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল।
১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে রিপাবলিক অব চায়না-ই চীনের প্রতিনিধিত্ব করত। এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীনের স্থায়ী সদস্যের আসনটিও তাইওয়ানভিত্তিক সরকারের হাতে ছিল।

অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তখন তাইওয়ানভিত্তিক সরকারই ‘চীন’ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করত।
সেই সময় তাইওয়ানের কুওমিনটাং সরকারও মাও সে তুংয়ের কমিউনিস্ট সরকারের কাছ থেকে পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করত। কিন্তু ১৯৭১ সালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
১৯৭১: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বড় পরিবর্তন
১৯৭১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে বেইজিংয়ের গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে জাতিসংঘে ‘চীনের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তাইওয়ান জাতিসংঘের আসন হারায়।
এরপর একে একে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে শুরু করে এবং তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৭০-এর দশকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পর দুই দেশের সম্পর্কের বড় পরিবর্তন শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।
তবে তাইওয়ানকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি ওয়াশিংটন।

১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র Taiwan Relations Act পাস করে। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তার আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার আইনি কাঠামো তৈরি হয়।
অর্থাৎ, বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান প্রশ্নে একটি জটিল ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে।
এভাবেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তাইওয়ান ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে এবং বেইজিংয়ের অবস্থান শক্তিশালী হয়।
‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’: চীনের প্রস্তাব
১৯৮০-এর দশকে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা কিছুটা কমতে শুরু করে। দুই পক্ষই বুঝতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।
এই প্রেক্ষাপটে বেইজিং তাইওয়ানকে একীভূত করার জন্য ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ মডেলের প্রস্তাব দেয়।
প্রস্তাবটির মূল ধারণা ছিল—তাইওয়ান চীনের অংশ হিসেবে ফিরে আসবে, কিন্তু সেখানে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট মাত্রার স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে।
কিন্তু তাইওয়ান এই প্রস্তাব শক্তভাবেই প্রত্যাখ্যান করে।
বিশেষ করে হংকংয়ের অভিজ্ঞতার পর তাইওয়ানের বড় একটি অংশের কাছে ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ আর গ্রহণযোগ্য কোনো মডেল হিসেবে দেখা হয় না।
২০০০-এর দশক: স্বাধীনতার প্রশ্ন আরও জোরালো
২০০০ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চেন শুই-বিয়ান, যিনি ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি বা DPP-এর নেতা।
তার নেতৃত্বে তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
২০০৪ সালে তাইওয়ানের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেইজিং এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং তাইওয়ানকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে চীন Anti-Secession Law বা বিচ্ছিন্নতাবিরোধী আইন পাস করে।
আইনটিতে বলা হয়, তাইওয়ান যদি চীন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে এগিয়ে যায়, তাহলে চীন ‘অ-শান্তিপূর্ণ উপায়’ গ্রহণ করতে পারে।
অর্থাৎ, তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা ঠেকাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা চীন আইনি কাঠামোর মধ্যেই রেখে দেয়।
চীনের সামরিক চাপ
এরপর থেকে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে।
চীন নিয়মিত তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়া, বিমান ও নৌ টহল পরিচালনা করতে থাকে।
তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলের (ADIZ) কাছাকাছি চীনা যুদ্ধবিমান প্রবেশের ঘটনাও নিয়মিত হয়ে ওঠে।
২০২০ সালের অক্টোবর মাসে একদিনে সর্বোচ্চ ৫৬টি চীনা সামরিক বিমান তাইওয়ানের ADIZ-এ প্রবেশ করেছিল বলে তাইওয়ান জানায়।
তখন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, কয়েক দশকের মধ্যে চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—ADIZ কোনো দেশের সার্বভৌম আকাশসীমা নয়। তাই চীনা বিমান ADIZ-এ প্রবেশ করা মানেই তারা তাইওয়ানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে—এমন নয়।
তবে এই ধরনের সামরিক তৎপরতা তাইওয়ানের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাইওয়ানের দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারা
তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চীন প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে একটি হলো ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (DPP)।
দলটি তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয় এবং চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক একীভূত হওয়ার বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে রয়েছে কুওমিনটাং (KMT)।
ঐতিহাসিকভাবে কুওমিনটাং পুরো চীনকে নিজেদের বৈধ ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করলেও বর্তমানে দলটি চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সমঝোতামুখী এবং দুই পক্ষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার পক্ষে।
অর্থাৎ, বর্তমান KMT-এর অবস্থানকে সরাসরি ‘মূল চীন দখল করে নেওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছুটা অতিসরলীকরণ হবে। বরং দলটি সাধারণত চীনের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে।
তাইওয়ানকে কত দেশ স্বীকৃতি দেয়?
বেইজিংয়ের ‘এক চীন’ নীতির কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে না।
তবে অল্পসংখ্যক দেশ এখনো তাইওয়ান বা রিপাবলিক অব চায়না (ROC)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।
তাইওয়ানের সরকারি হিসাবে বর্তমানে ১২টি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র এবং হলি সি (ভ্যাটিকান) তাদের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক মিত্র। অর্থাৎ মোট ১৩টি কূটনৈতিক অংশীদার রয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানের অবস্থান একদিকে বাস্তবিকভাবে শক্তিশালী হলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত।

তাইওয়ানের মানুষ কি যুদ্ধ নিয়ে আতঙ্কিত?
চীন-তাইওয়ান সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যতটা উদ্বেগ, তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে সবসময় ততটা আতঙ্ক দেখা যায় না।
২০২১ সালের অক্টোবরে Taiwan Public Opinion Foundation একটি জরিপ চালায়।
তাদের প্রশ্ন ছিল—চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কি যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে?
জরিপে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছিলেন, এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়াবে না।
অর্থাৎ, তখন তাইওয়ানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করছিলেন, চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও তা অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে না।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে তাইওয়ানের মানুষ চীনের সামরিক চাপকে গুরুত্ব দেয় না। বরং দীর্ঘদিনের এই উত্তেজনা তাদের কাছে অনেকটাই দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে গেছে।
তাহলে কি চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব নিছক কোনো ফাঁপা উত্তেজনা?
তা বোধহয় নয়।
কারণ এই দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে শুধু ঐতিহাসিক বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ববাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, প্রযুক্তি এবং দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিষয়।
তাই চীন ও তাইওয়ানের এই টানাপোড়েনকে শুধু দুই পক্ষের পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো এশিয়া, এমনকি বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও।
তবে চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষিণ চীন সাগর। এই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য কেন বেইজিংয়ের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাইওয়ান কীভাবে এই বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে—সে আলোচনা নাহয় পরবর্তী সময়ের জন্য তোলা রইলো।
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান