সুদান আজ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি পার করছে। একদিকে সেনাবাহিনী, অন্যদিকে শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী— দুই পক্ষের ক্ষমতার লড়াই দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া, কোটি মানুষ খাদ্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এবং দেশের বিস্তীর্ণ অংশে কার্যত ভেঙে পড়েছে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
কিন্তু এই সংকটের শুরু ২০২৩ সালের এপ্রিলের যুদ্ধ থেকে নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন, ২০১৯ সালের বিপ্লব, ব্যর্থ গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং দুই ক্ষমতাধর জেনারেলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব।
বশিরের পতন থেকে দুই জেনারেলের উত্থান
সুদানের রাজনৈতিক সংকট বুঝতে হলে প্রথমে ফিরে যেতে হয় ওমর আল-বশিরের শাসনামলে।
প্রায় ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ২০১৯ সালে বশির ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর সামরিক ও বেসামরিক পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২০১৯ সালের সাংবিধানিক ঘোষণায় নির্ধারিত হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশটি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের নিয়ে গঠিত সার্বভৌম পরিষদ তৈরি হয়। এর শীর্ষে উঠে আসেন সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। তার ডেপুটি ছিলেন আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা RSF-এর প্রধান জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি ‘হেমেত্তি’ নামেও পরিচিত।
দুজন তখন একই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশীদার ছিলেন।
কিন্তু সেই অংশীদারিত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২৫ অক্টোবর ২০২১: আবারও সামরিক অভ্যুত্থান
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার খবর প্রকাশ্যে এলেও মূল সামরিক অভ্যুত্থানটি ঘটে ২৫ অক্টোবর ২০২১।
সেদিন বুরহানের নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী বেসামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী আবদাল্লাহ হামদকসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সদস্যদের আটক করে এবং অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেয়। পরে বুরহান নতুন সার্বভৌম পরিষদ গঠন করেন এবং হেমেত্তিকে তার ডেপুটি করা হয়।

গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীরা এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেন। হামদককে পরে একটি সমঝোতার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরিয়ে আনা হলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করেন।
অর্থাৎ, সামরিক বাহিনী তখনও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
কিন্তু সামরিক শিবিরের ভেতরেই তখন তৈরি হচ্ছিল নতুন সংঘাত।
আসল বিরোধ: RSF যাবে কোথায়?
২০২২ সালের শেষ দিকে বেসামরিক শাসনে ফেরার জন্য নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির আলোচনা শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে আসে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল RSF-কে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে কীভাবে একীভূত করা হবে।
RSF ছিল প্রায় এক লাখ সদস্যের একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী। এটি ছিল রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাইরে একটি স্বতন্ত্র সামরিক শক্তি এবং সরাসরি হেমেত্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হতো।
এখন প্রশ্ন দাঁড়াল—
RSF সেনাবাহিনীতে মিশে গেলে কে এর নেতৃত্ব দেবে?
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—
নতুন একীভূত বাহিনীর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার থাকবে—বুরহানের, নাকি হেমেত্তির?
সেনাবাহিনী চাইছিল RSF দ্রুত নিয়মিত বাহিনীর কাঠামোর মধ্যে চলে আসুক। অন্যদিকে হেমেত্তি দীর্ঘ সময় ধরে RSF-এর স্বাধীন সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে চাইছিলেন।
এই প্রশ্নগুলোই দুই জেনারেলের মধ্যে অবিশ্বাসকে ক্রমে সংঘাতে পরিণত করে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরের রাজনৈতিক কাঠামো চুক্তিতেও RSF-কে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার বিষয়টি ছিল কেন্দ্রীয় ইস্যু। কিন্তু একীভূতকরণের সময়সীমা ও কমান্ড কাঠামো নিয়ে বিরোধ থেকেই যায়।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
১৫ এপ্রিল ২০২৩: যুদ্ধের শুরু
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল খার্তুমে হঠাৎ ব্যাপক গোলাগুলি ও বিস্ফোরণ শুরু হয়।
সুদানের সশস্ত্র বাহিনী—SAF এবং RSF একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
দুই পক্ষই দাবি করে, অন্য পক্ষ প্রথম হামলা চালিয়েছে। কিন্তু খুব দ্রুত সংঘর্ষ রাজধানী খার্তুম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সুদান কার্যত দুই শক্তিশালী সামরিক কেন্দ্রের যুদ্ধে পরিণত হয়—
SAF — জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান
বনাম
RSF — জেনারেল মোহামেদ হামদান ‘হেমেত্তি’ দাগালো।

যুদ্ধের দুই পক্ষই বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে পড়েছে। হত্যা, যৌন সহিংসতা, লুটপাট, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালে জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর ১৬,৬৫০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কারা এই RSF?
RSF-এর শিকড় সুদানের দারফুরের রক্তাক্ত ইতিহাসে।
২০০৩ সালে দারফুরে বিদ্রোহ শুরু হলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির সরকার বিদ্রোহ দমনে জানজাওয়িদ নামে পরিচিত আরব মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে।
এই মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম ধ্বংস ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ ওঠে। দারফুর সংঘাতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব রয়েছে।
২০১৩ সালে দারফুরে আবার সহিংসতা বেড়ে গেলে জানজাওয়িদসহ বিভিন্ন মিলিশিয়া যোদ্ধাকে পুনর্গঠিত করে Rapid Support Forces বা RSF নামে নতুন আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়।
এর নেতৃত্বে উঠে আসেন হেমেত্তি।
RSF পরবর্তীতে সুদান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধা-সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের আগে পর্যন্ত যে বাহিনী আজ সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, সেটি একসময় সুদান সরকারেরই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ ছিল।
এই ইতিহাসই বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিদেশের মাটিতেও RSF-এর যুদ্ধ
RSF-এর কার্যক্রম শুধু সুদানের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
২০১৬–১৭ সালের সময়ে RSF-এর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৯ সালে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (LNA)-কে সমর্থন করার জন্য প্রায় ১ হাজার RSF সদস্য লিবিয়ায় উপস্থিত ছিল।
অর্থাৎ, হেমেত্তির বাহিনী কেবল সুদানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ছিল না; আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতেও এর সদস্যদের ব্যবহার করা হয়েছে।
সোনার খনি: হেমেত্তির অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য
RSF-এর শক্তির পেছনে শুধু সামরিক সক্ষমতা নয়, অর্থনৈতিক ভিত্তিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৭ সালের নভেম্বরে হেমেত্তি দারফুরের গুরুত্বপূর্ণ সোনার খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে RSF-কে ব্যবহার করেন বলে গবেষণা সংস্থা Global Witness জানিয়েছে।
এরপর স্বর্ণ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হেমেত্তির অর্থনৈতিক ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালের মধ্যে তিনি সুদানের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে আসে।
Global Witness-এর মতে, RSF এবং আল-জুনায়েদ কর্পোরেশন সুদানের স্বর্ণ শিল্পের একটি অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং এই সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থ RSF-এর সামরিক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়।
ফলে RSF-কে শুধু একটি মিলিশিয়া হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
RSF-এর পেছনে কারা?
সুদানের যুদ্ধ কেবল দুই জেনারেলের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থও।
RSF-এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, চাদ, রাশিয়ার ওয়াগনার নেটওয়ার্ক এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের যোগাযোগ বা সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
RSF-কে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। আমিরাত অবশ্য RSF-কে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবে পরবর্তী বিভিন্ন তদন্তে RSF-এর হাতে আমিরাতের তৈরি বা আমিরাতের মাধ্যমে সরবরাহ করা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, আমিরাতের তৈরি সাঁজোয়া যান RSF-এর হাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের আরও একটি তদন্তে অ্যামনেস্টি চীনে তৈরি GB50A গাইডেড বোমা এবং ১৫৫ মিমি AH-4 হাউইটজার শনাক্ত করে। সংস্থাটি বলেছে, এসব অস্ত্র প্রায় নিশ্চিতভাবেই আমিরাতের মাধ্যমে সুদানে পুনরায় রপ্তানি করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, RSF-এর বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ এখন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে নির্দিষ্ট অস্ত্র ও সরঞ্জামের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।

চাদের পূর্বাঞ্চলের আমজারাস বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম RSF-এর কাছে পৌঁছানোর অভিযোগও রয়েছে।
তবে এই সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত আরব আমিরাত বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ওয়াগনার গ্রুপ ও রাশিয়ার স্বর্ণস্বার্থ
RSF-এর সঙ্গে রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
ফাঁস হওয়া নথি ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ রয়েছে, ওয়াগনার নেটওয়ার্ক হেমেত্তির বাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের কথাও উঠে এসেছে।
রাশিয়ার জন্য সুদানের গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো স্বর্ণ।
হেমেত্তির নিয়ন্ত্রণাধীন স্বর্ণসম্পদ এবং রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক নিয়ে বহু অনুসন্ধান হয়েছে। এই সম্পর্কের ফলে সুদানের স্বর্ণ রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলায় অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ, এখানে যুদ্ধের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সম্পর্কও জড়িয়ে গেছে।
চাদ: সীমান্তের ওপারে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সুদানের পশ্চিমে চাদের অবস্থানও এই সংঘাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দারফুরের সঙ্গে চাদের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক সুদানি শরণার্থীও সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।
একই সঙ্গে RSF-এর কাছে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর সম্ভাব্য রুট হিসেবে চাদের ভূখণ্ডের নাম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে এসেছে।
ফলে চাদ নিজেও একদিকে শরণার্থী সংকট সামলাচ্ছে, অন্যদিকে সুদানের যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাবের মধ্যে পড়েছে।
SAF-এর পেছনে কারা?
অন্যদিকে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী বা SAF-এর সঙ্গে মিশরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মিশর সুদানের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে সমর্থন করে আসছে এবং বুরহানের নেতৃত্বাধীন সামরিক কাঠামোর সঙ্গে কায়রোর সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সুদান মিশরের দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত এবং নীল নদের পানি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে কায়রোর কাছে দেশটির গুরুত্ব অনেক।
তবে যুদ্ধের সমীকরণ একেবারে সরল নয়। বিভিন্ন সময়ে একই রাষ্ট্র বা শক্তির সঙ্গে উভয় পক্ষের যোগাযোগ ও সম্পর্কের খবরও পাওয়া গেছে।
ফলে সুদানের যুদ্ধকে শুধু ‘এক দেশ এক পক্ষকে সমর্থন করছে’—এমন সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় সুদান
সুদানের অবস্থানও দেশটির সংকটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
দেশটির পূর্বদিকে লোহিত সাগর, উত্তরে মিশর, পশ্চিমে চাদ ও লিবিয়া এবং দক্ষিণে দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র।
সুদানের স্বর্ণসম্পদ, কৃষিজমি, লোহিত সাগরের উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ—সব মিলিয়ে দেশটি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সুদানের যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এটি একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই থেকে আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতের রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ
সুদানের রাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইয়ের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
চলমান এই গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে নিহত মানুষের সংখ্যা ১,৫০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ জন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন পরিস্থিতি ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল।
সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ACLED-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি বোমাবর্ষণ, ড্রোন হামলা এবং সংঘর্ষের কারণে অন্তত ৫৯,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। (সংস্থাটি জানায় যে এটি কেবল তাদের নথিবদ্ধ করা সর্বনিম্ন সংখ্যা, প্রকৃত সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি)।
আর জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর অফিশিয়াল হিসাব মতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০,০০০ জন, তবে এটি কেবল হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে নথিভুক্ত হওয়া সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
বেসরকারিভাবে হিসেবে উঠে এসেছে তীব্র খাদ্যসংকট, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার কারণে পরোক্ষভাবে আরও লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়েছেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র তীব্র অনাহার ও অপুষ্টির শিকার হয়েই ৫ লক্ষাধিক শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
পাঁচ কোটির দেশের খাদ্যসংকট
সুদানের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি।
এর মধ্যে লাখ লাখ মানুষ খাবারের জন্য সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি ছিল।
পরবর্তী আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালে সুদানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে থাকবে এবং ৪০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে পারে।
দারফুরের কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত, বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়া, খাদ্য পরিবহন বন্ধ এবং মানুষের আয় কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
দুই কোটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি
সুদানের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও যুদ্ধের কারণে কার্যত ভেঙে পড়েছে।
১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষের জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকার ৭০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্য অবকাঠামো বন্ধ বা আংশিকভাবে চালু ছিল।
বর্তমান WHO-এর হিসাবে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার: দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুরোপুরি অকার্যকর এবং ২০২৬ সালে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে WHO স্বাস্থ্যসেবার ওপর ২১৭টি হামলা যাচাই করেছে, যাতে অন্তত ২,০৫২ জন নিহত ও ৮১০ জন আহত হয়েছে।
ফলে হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই। চিকিৎসক আছে, কিন্তু ওষুধ নেই। ওষুধ আছে, কিন্তু হাসপাতাল চালানোর বিদ্যুৎ নেই।
এই অবস্থায় ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডেঙ্গু, হাম, মেনিনজাইটিস, হেপাটাইটিস-ই এবং অপুষ্টিজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে সংকট
যুদ্ধ থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ সুদানের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।
মিশর, চাদ, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সুদানি শরণার্থীদের বড় ঢল নেমেছে।
অন্তত ২০ লাখ মানুষ এসব প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার পরও সংকট শেষ হয়নি।
শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বেড়েছে।
সাহায্যের জন্য আবেদন, কিন্তু অর্থ নেই
সুদানের মানবিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বিপুল অর্থের আবেদন করেছে।
এক পর্যায়ে সুদানের জন্য ২.৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়া হলেও তার ৬ শতাংশেরও কম অর্থ পাওয়া গিয়েছিল।
এদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যাওয়া সুদানিদের সহায়তার জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ১.৪ বিলিয়ন ডলার চেয়েছিল।
পরবর্তী সময়েও অর্থের ঘাটতি কাটেনি। ২০২৬ সালের জুনে WHO-সমর্থিত Sudan Health Cluster জানায়, তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ৩৩৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সেবা কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়েছে; এর ফলে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ যেমন মানুষকে হত্যা করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতিও বহু মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
সুদানের সামনে কী আছে?
সুদানের বর্তমান সংকটকে শুধু দুই জেনারেলের ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না।
এর পেছনে রয়েছে—
দীর্ঘ সামরিক শাসন,
২০১৯ সালের গণআন্দোলন ও বশিরের পতন,
অসম্পূর্ণ বেসামরিক রূপান্তর,
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান,
SAF ও RSF-এর দ্বৈত সামরিক কাঠামো,
RSF-কে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার বিরোধ,
দারফুরের পুরোনো জাতিগত ও সামরিক সংঘাত,
স্বর্ণ ও অন্যান্য সম্পদের নিয়ন্ত্রণ,
এবং
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
সবকিছু মিলিয়ে সুদান এখন এমন এক যুদ্ধের মধ্যে আটকে আছে, যার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই।
বুরহান ও হেমেত্তি—দুই জেনারেলই সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। কিন্তু তাদের লড়াইয়ের মাঝে পড়েছে এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা কয়েক বছর আগেও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল।
আজ সেই মানুষগুলোর সামনে প্রশ্ন—তারা কোথায় থাকবে, কী খাবে, কোথায় চিকিৎসা পাবে এবং আদৌ নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে কি না।
২০২৬ সালে এসে WHO সুদানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করছে। দেশটিতে ৩ কোটি ৪০ লাখের মতো মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন এবং ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার সংকটে রয়েছে।
সুদানের যুদ্ধ তাই আর কেবল দুই জেনারেলের যুদ্ধ নয়।
এটি এখন একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ এবং একটি পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সংকট।
সুদানিরা জানেন না তাদের ভবিষ্যৎ কী। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—যতদিন বুরহান ও হেমেত্তির বাহিনীর অস্ত্রের লড়াই চলবে, ততদিন এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে থাকবে সাধারণ মানুষ।
লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান