মুসলিম পোর্ট

গত ১৫ মাস যাবত অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার মানুষদের তীব্র প্রতিরোধ, বীরত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ সম্ভাষণ এবং অবিচল অবস্থানের প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহু সরকারের হাজারোর্ধ ফিলিস্তিনি বন্দীমুক্তির সিদ্ধান্তটি স্পষ্টতই যুদ্ধে ইজরায়েলের শোচনীয় পরাজয়কে প্রমানিত করে। 

যুদ্ধবিরতির চুক্তির পর খান ইউনুসে উচ্ছ্বসিত ফিলিস্তিনিরা। ১৫ জানুয়ারী, ২০২৫। ছবিঃ এএফপি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা হতে ঐতিহাসিক অপারেশন আল আক্বসা তুফান পরিচালনা করে  হামাস। এরপর হতেই হামাসকে অঞ্চলটি থেকে নির্মূল করার নামে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করে আসছে ইজরায়েলের  প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছিল যে, গাজার জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতায় তার কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। এই গণহত্যামূলক অভিযানে নেতানিয়াহু তার নাগরিকদের আশ্বস্ত করে আরো বলেছিল, “সম্পূর্ণ বিজয়” না আসা পর্যন্ত এই অভিযান চলবেই। পরবর্তীতে ইজরায়েলি বন্দীদের মুক্তির দাবীতে তেলআবিবে আন্দোলন শুরু হলে নেতানিহু তার জনগনকে এভাবে শান্ত রাখে যে, শুধুমাত্র ধারাবাহিক সামরিক চাপ প্রয়োগ করেই ইজরায়েলি বন্দীদের মুক্তি নিশ্চিত করা হবে। এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও নেতানিয়াহু বারবার ঘোষণা করেছে, তার লক্ষ্য হচ্ছে- হামাস, ইসলামিক জিহাদ এবং অন্য সকল প্রতিরোধ আন্দোলন সমূহকে যেকোনো মূল্যে পরাজিত, চূর্ণ, ধ্বংস ও বিনাশ ঘটানো। সে দম্ভ করে তার জনগণকে এভাবেও আশ্বস্ত করেছিল, একদিন ইজরায়েলের কাছে হামাস নাকি আত্মসমর্পণ করবেই।

কিন্তু গাজাকে জঘন্যভাবে ধ্বংস করতে থাকা গণহত্যামূলক এ যুদ্ধের ৪৬৭ তম দিন পর এসে এবং ১৬ বছরের অধিক সময় ধরে মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলকে ভয়াবহ মাত্রায় শোষণ করার পরও গত ১৪ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুর নাজুক অবস্থা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনাপ্রবাহ। যেখানে তাকে স্বীকার করতে দেখা যায়- আমরা হামাসের ইতিবাচক প্রতিউত্তরের জন্য অপেক্ষমান। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যই তার পূর্বের সকল দম্ভপূর্ণ বক্তব্যকে ধ্বংস করে দেয় এবং ইজরায়েলের অসারতাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। একইসাথে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত দ্বারা সাব্যস্ত এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তিটিকেও আইনের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার রাস্তাকে সুবিন্বস্ত করে।

ব্যর্থ কৌশল

১৫ মাস পূর্বে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর শুরু থেকেই নেতানিয়াহু গাজাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মিশনে নেমেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট মদদে নেতানিয়াহু প্রতিদিনই ঘোষণা করছিল যে “সম্পূর্ণ বিজয়” অর্জনের আগ পর্যন্ত কোন বিরতিতে যাবেনা যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীটি। পাশাপাশি হামাস সহ প্রতিরোধ আন্দোলন সমূহকেও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। এলক্ষ্যেই কূটকৌশল অবলম্বন করে আসছিল ইজরায়েল।

আপাত অর্থে, গাজাকে ধ্বংস করে দেওয়ার সমস্ত পদক্ষেপই তারা গ্রহণ করেছে এবং অল্প এই ভূমিতে নিক্ষেপের জন্য শুধু গত ১৫ মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে ২২ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে। অত্যাধুনিক অস্ত্র, বোমা-বারূদ কোন কিছুরই কমতি নেই। বাইডেন তার বিদায়ী উপহার হিসেবেও নেতানিয়াহুকে ৮ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ অতিরিক্ত সামরিক সহায়তায় প্রদান করেছে।

কিছু মাস পূর্বেও যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ নিরবচ্ছিন্ন সহায়তার ফলে ইজরায়েল দম্ভগলায় ঘোষণা দিয়েছিলো- তারা শুধু হামাস নয়, গাজাকে দখলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অন্য সমস্ত প্রতিরোধ আন্দোলন সমূহকেও গাজাতে কবরস্থ করবে। এছাড়াও তারা সীমান্ত করিডর দখল, উত্তর গাজা হতে স্থানীয়দের সিনাই উপত্যকায় চূড়ান্ত সম্প্রসারণ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইজরায়েলের গ্রেট মিডল ইস্ট প্রোজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য গণমাধ্যমগুলোতে নেতানিয়াহুর প্রত্যক্ষ ছলচাতুরী; এরূপ অনেক পরিকল্পনার কথাই প্রকাশ করেছিল তেলআবিব।

কিন্তু তাদের সকল কূটকৌশল চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে তারা যেমন মিশর এবং সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের উপর গাজার স্থানীয় মানুষদের স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে চাপিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে, পাশাপাশি উত্তর গাজা থেকে  মানুষদের বিতারিত করতেও ইজরায়েল ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যেটিকে তারা “জেনারেল প্লান” হিসেবে সাব্যস্ত করে আসছিল।

বর্তমান যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী, উত্তর গাজায় স্থানীয়দের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং গাজার অভ্যন্তর ও সীমান্ত করিডর থেকে দখলদার সেনাদের চলে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাখ্যান। এর পাশাপাশি, নেতানিয়াহুর পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী বন্দী মুক্তির ক্ষেত্রে গাজার উপর সামরিক চাপ প্রয়োগ, হত্যা, বোমাবর্ষণ সকল কিছুই ব্যর্থতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। যুদ্ধবিরতির বন্দী বিনিময় শর্তে ১০০০ ফিলিস্তিনির বিপরীতে ৩৩ ইজরায়েলির বিনিময়-ই যা প্রমাণ করে।

অর্থহীন যুদ্ধ

দখলদার ইজরায়েলের এই শক্তিপ্রদর্শনের, মানুষ হত্যার এবং বিশৃঙ্খলা তৈরীর অর্থহীন যুদ্ধটি আরো আগেই শেষ হওয়া সম্ভব ছিল। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মধ্য দিয়েও আরো আগেই যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর সম্ভব ছিল, গতবছরের মে এবং জুলাই মাসে যখন হামাস যুদ্ধবিরতির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ইজরায়েল সেসময় কেবল বাইডেনের উস্কানিমূলক নীতিতে অটল থেকেছে। তবে এই ছয় মাসে ইজরায়েল কি এমন অর্জন করতে পেরেছে? গাজায় মানুষ হত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া ইজরায়েলের অর্জনের ঝুড়ি সম্পূর্ণই ফাঁকা। যা ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেছে।

ফলে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণাতেও এই যুদ্ধকে একটি অর্থহীন ও স্টুপিড যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নেতানিয়াহুকে থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ট্রাম্প বলেছিল, যতদ্রুত সম্ভব হামাসকে নির্মূল করে এই যুদ্ধ বন্ধ করে দাও! কিন্তু ব্লিঙ্কেনের সরল স্বীকারোক্তি- সামরিক প্রক্রিয়ায় হামাসকে নির্মূল করা অসম্ভব। যাইহোক,  ধরা যেতে পারে, ট্রাম্পের যুদ্ধবন্ধ নীতির ফলস্বরূপ এই যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর অনেকটা তরান্বিত হয়। কেননা, ট্রাম্প প্রশাসন ইজরায়েলকে অনর্থক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্রদানের চেয়ে অভিবাসন, কর, চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা, তুমি যুদ্ধের প্রেক্ষিতে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক  এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ঘাটতিতেই বেশি মনোযোগ দিতে চায়।

এটি বুঝতে পেরেছে যে, নেতানিয়াহু অন্তত ভৌগলিকভাবে কোন কৌশলগত বিজয় নিয়ে আসতে সক্ষম নয়। বরং কৌশলগতভাবে হামাসের কাছে ইজরায়েলের চূড়ান্ত ভরাডুবি সংঘটিত হয়েছে।

ট্রাম্প মূলত তার অভিষেক অনুষ্ঠান তথা ২০ জানুয়ারি, ২০২৫ এর আগেই এই যুদ্ধবিরতির বন্দোবস্ত করতে মরিয়া ছিল। কেননা, যুদ্ধবাজ ইজরায়েলের প্রতি তার এই হুমকি সূচক বক্তব্য ট্রাম্পের উপর থাকা চাপকে সামনে নিয়ে আসে। যেখানে ট্রাম্প বলেছিল, আমার অফিস শুরুর পূর্বেই বন্দী বিনময়ের কার্যকারিতা চাই, অন্যথায় নরক নেমে আসবে।

অনেক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক যদিও ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে হামাসের জন্য অশনি সংকেত মনে করেছিল, তবে হামাসের উপর আক্রমণের এমন কোন পন্থা আর বাকি নেই যার কারনে তাদের সতর্ক করবে ট্রাম্প। বরং এই হুমকি স্বয়ং নেতানিয়াহুর প্রতিই ছুড়েছে ট্রাম্প।

এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মূলত সেই একই চুক্তি, যা গত বছরের মে মাস থেকেই তেলআবিব অস্বীকার করে আসছিল এবং হামাস কঠোরভাবে সেই চুক্তি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ছিল। ইজরায়েলি মন্ত্রী ইতামান বেন গবীরও বিষয়টির স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

তবে ধারণা করা যাচ্ছে, যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুকে গাজা গণহত্যা থামানোর জন্য ট্রাম্প কিছু লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছে। যেমন, সৌদি আরবের সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, আসাদ সরকারকে উৎখাতের পর সিরীয় অঞ্চলে নতুন করে ইজরায়েলের দখলকৃত অঞ্চল সমূহের স্বীকৃতি দেওয়া, এমনকি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা গুলিতে সামরিক হামলার প্রস্তাবও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এছাড়াও, ইজরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী সঙ্গী বেজালেল স্মোতরিচকে পশ্চিম তীরের উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন করে দখলে নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করছে ট্রাম্প।

আর ট্রাম্পের সম্ভাব্য এসকল নীতি সমূহ স্পষ্টভাবেই গণমাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দাতা সমর্থক মারিয়াম এ্যাডালসন। এ্যাডালসন এর পূর্বেও ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। এমনকি ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী করার প্রকল্পেও ৪০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছিল এই মারিয়াম এ্যাডালসন।

চুক্তির শর্তাবলি

এ বিষয়টি স্পষ্ট যে গত ১৫ মাসের যুদ্ধে নেতানিয়াহু কৌশলগতভাবে পরাজিত হয়েছে এবং হামাস ও অন্যান্য প্রতিরোধ আন্দোলন সমূহ সম্মানজনক বিজয় অর্জন করেছে। যুদ্ধের পুরো সময় জুড়েই হামাস তার নীতিতে অকাট্যভাবে অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং কোনো মূল্যেই দ্বিচারিতার পরিচয় দেয়নি। হামাস শুরু থেকেই যুদ্ধ বিরোধী কার্যকরের লক্ষ্যে কিছু শর্ত প্রদান করে আসছিল এবং চূড়ান্তভাবে তারা তা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। যেমন, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের সমাপ্তি ছাড়াও গাজা থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার বিপন্ন মানুষদের জন্য ব্যপক সহায়তা পাঠানো, গাজার পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন এবং হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীর সম্মানজনক মুক্তি যাদেরকে কারাগারে মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে।

যেহেতু ঐতিহাসিকভাবেই দখলদার ইজরায়েলের চুক্তিভঙ্গের ও দ্বিচারিতার আশ্রয় নেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুতরাং হামাস আশঙ্কা করছিল যে ইজরায়েল ৪২ দিনের মধ্যে ৩ ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা চুক্তিটি যদি ১ম ধাপের পরই ইজরায়েল লঙ্ঘন করে পুনরায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে ১৯ বছরের নিচে থাকা শিশু ও ৫০ বছরের উপরে থাকা বৃদ্ধদের মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এজন্য প্রধানত আমেরিকা, মিশর ও কাতার মুচলেকা প্রদান পূর্বক হামাসকে আশ্বস্ত করেছে। যেটিও হামাসের মর্যাদাপূর্ণ বিজয়ের একটা অংশ। এখানে হামাসকে এভাবেও আস্বস্ত করা হয়েছে যে, এই প্রক্রিয়ার পরই চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতির পথে হাটবে তারা।

এছাড়াও প্রথম ধাপেই গাজার সব বাসিন্দাকে কোন প্রকার ইজরায়েলি হস্তক্ষেপ ও চেকপোস্ট  ছাড়াই তাদের এলাকায় ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীকে সীমান্তের ৪০০-৭০০ মিটার দূরে অবস্থান নিতে হবে। নেটজারিম ক্রসিং ধ্বংস করতে হবে এবং ফিলাডেলফি করিডর প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এই শর্তগুলো হামাস পূর্বেও প্রদান করেছিল এবং একই শর্ত তারা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। সেই সাথে রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়া ও প্রতিদিন ৬০০ মালবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকবে, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ছাড়াও ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মাধ্যমে পুনর্গঠিত হবে গাজা উপত্যকা। চুক্তির মধ্যস্ততাকারী দেশগুলো আস্বস্ত করেছে যে, আগামী ১২ সপ্তাহ পরই চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত হবে।

গত ১৫ মাসে ফিলিস্তিনিদের অভূতপূর্ব কষ্টের পর এই বন্দীদের মুক্তি ইজরায়েলের গণহত্যামূলক অভিযানের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী ও বাস্তবিক বিজয়। যেখানে, তরুণ, অসুস্থ, বৃদ্ধ ও নারী প্রাধান্যক্রমে ৩৩ জন ইজরায়েলি নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিও মুক্তি পাবে।

উল্লেখ্য, এতে শুধু সেই ব্যক্তিরাই অন্তর্ভুক্ত নয় যাদের ইজরায়েল ৭ অক্টোবর ২০২৩ এর পর আটক করেছে। বরং আরও হাজার হাজার ফিলিস্তিনিও রয়েছে, যাদের ইজরায়েল আরো আগে থেকেই আটক করে রেখেছে, এর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি নারী ও শিশু, প্রায় ২৫০ জন ফিলিস্তিনি যাদের আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, এবং কয়েকশ’ অন্যান্য ব্যক্তি যারা আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত; এমন অনেক ফিলিস্তিনিও মুক্তি পাবে এই যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুসারে৷

বলা যায়, প্রথম ধাপে ৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দী মুক্তির জন্য আশা করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় ধাপে, অবশিষ্ট ইজরায়েলি পুরুষ সেনাদের মুক্তির জন্যও আলোচনা হবে যেখানে বন্দী বিনিময়ের অনুপাত সাধারণ নাগরিকদের জন্য ৩০:১ এবং প্রথম ধাপে মুক্তি পাওয়া ইজরায়েলি নারী বন্দীদের জন্য ৫০:১ ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। বলা হচ্ছে, আজীবন কারাদণ্ড পাওয়া ৩০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিলে এই অনুপাত আরো বাড়ানে হামাস।

স্বাধীন গাজা

এমন একটি চুক্তির মধ্যে নিঃসন্দেহে ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষত যেখানে যখন সামরিক শক্তির ভারী অস্ত্রাগার ইজরায়েলের কাছেই রয়েছে। কিন্তু এই ঝুঁকি শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্যই নয়, তা পুরো বিশ্বকেই গ্রহণ করতে হবে। যদি ইজরায়েল তার বন্দীদের মুক্তির পর আবারও এই গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু করে, তবে এটি কেবল আরেকটি স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তরিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

স্বাধীনতা ও আত্মনির্ধারণের সংগ্রামে যেকোন জাতিই সাধারণত বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে থাকে। আর গাজার ক্ষেত্রে এই ত্যাগে মাত্রা পৃথিবীর ইতিহাসে স্পষ্ট নজিরবিহীন!  গত এক শতাব্দীকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের এই প্রতিরোধ থেকে একটা বিষয়ই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে পাহাড় সমান ত্যাগ, যন্ত্রণা এবং কষ্ট থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের দৃঢ়তা, অনড় ও অটুট অবস্থান শেষ পর্যন্ত শত্রুর অহংকার ও নিষ্ঠুরতাকে পরাজিত ও চূর্ণবিচূর্ণ করবেই।

এমন একটি বিখ্যাত উক্তির মধ্য দিয়ে শেষ করি। যেটি আমেরিকানরা গর্বের সাথে সবসময় স্মরণ করে। আমেরিকান দেশপ্রেমিক প্যাট্রিক হেনরি’র লেখা, যিনি ১৭৭৫ সালের আমেরিকান বিপ্লবের সময় ঘোষণা করেছিলেন “আমাকে স্বাধীনতা দাও, অথবা আমাকে মৃত্যু দাও।”

আমি বলবো, এই উক্তিটি পৃথিবীর যেকোনো জাতির চেয়ে গাজার মানুষেরা গাজাকে তাদের সম্মান ও ইজ্জতের প্রতিক হিসেবেই সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।

প্রফেসর ড. সামী আল আরিয়ান

অনুবাদঃ মুশফিকুর রহমান