মুসলিম পোর্ট

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের সূচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান অপারেশন এপিক ফিউরি। যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হলেও বাস্তবে এর লক্ষ্য, কৌশল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় যতই যাচ্ছে ততই এই দোদুল্যমান অবস্থা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ঘোষণা করে, সন্ত্রাসী ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় সামরিক অভিযান শুরু করেছে ওয়াশিংটন। অভিযানের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সহযোগীকে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে ইরানের বহু সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনার ওপর ব্যাপক হামলাও চালায় মার্কিন-ইসরায়েল গোষ্ঠী।

এই হামলার জবাবে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা (বিশেষ করে ইরাক ও লেবাননের বিভিন্ন গোষ্ঠী) ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি

মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। অর্থাৎ তাদের দাবি হলো ইরান যেন ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে না পারে।

কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ট্রাম্প এর বক্তব্যে এই উদ্দেশ্যের সীমা আরও বিস্তৃত বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সে শুধু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের কথাই বলেনি; বরং ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও আকারে-ইঙ্গিতে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু অস্ত্র ধ্বংস ছিলনা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে এসেছে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা এই বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করছেন।

যদি যুদ্ধের উদ্দেশ্য শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা হয়, তাহলে অভিযানটি তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারতো। কিন্তু যদি গোটা শাসনব্যবস্থাই পরিবর্তন বা রাজনৈতিক পুনর্গঠন লক্ষ্য হয়, তাহলে যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠবে, এটা সহজেই অনুমান করা যায়; অতীতে ইরাক বা আফগানিস্তানে যেমনটা দেখা গেছে।

ট্রাম্পের একটি ভাষণে সে বলেছে, অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে এবং প্রয়োজনে মার্কিন স্থলবাহিনীও মোতায়েন করা হতে পারে। স্থলবাহিনী জড়িত হলে সংঘাতের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বাড়ে, কারণ তখন শুধু বিমান হামলা নয়, সরাসরি ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি ও দখল সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। সেই সাথে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও উত্তেজিত হতে পারে। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য কী এবং তা অর্জনের উপায় কতটা বাস্তবসম্মত, এই স্বাভাবিক প্রশ্নগু্লোই এখনো উন্মুক্ত নয়।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার। তাদের উদ্দেশ্য শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা নয়; বরং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা, আঞ্চলিক মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করা এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অনেক বেশি অস্পষ্ট ও দ্বিধাগ্রস্ত। যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেছিল, ইরানি শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত “আসন্ন হুমকি” দূর করে আমেরিকান জনগণকে রক্ষা করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই হুমকির প্রকৃতি সে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেনি।

ট্রাম্প দাবি করে-

  • যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবে না।
  • ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা হবে।
  • এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি তৈরি করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করা হবে।

তবে একই ভাষণে সে ইরানের জনগণকে তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আহ্বান জানায় যা কার্যত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সরকার উৎখাত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের মতপার্থক্য

যুদ্ধ শুরুর পরদিন ট্রাম্প বলে, সে শিগগির গঠিত হতে যাওয়া নতুন ইরানি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। কিন্তু এখানে দুটি বড় অস্পষ্টতা রয়েছে—

১. কার সঙ্গে আলোচনা?
ইরানে যদি সরকার পরিবর্তন ঘটে, সেই নতুন প্রশাসন কারা হবে, তা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধ তখনো চলমান, রাজনৈতিক কাঠামো অনিশ্চিত, ফলে আলোচনার অংশীদার কে হবে সেটাই প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলোচনা তখনই কার্যকর হয় যখন প্রতিপক্ষের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট থাকে। এখানে সেই স্পষ্টতাই তো নেই।

২. আলোচনার সময় ও শর্ত?
ট্রাম্প কখন আলোচনা শুরু হবে বা কী শর্তে আলোচনা হবে তা উল্লেখ করেনি। ফলে এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা গেলেও বাস্তব কূটনৈতিক রোডম্যাপ অনুপস্থিত।

একই সময়ে যুদ্ধের সময়কাল নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ভিন্ন বক্তব্য উঠে আসে।

ট্রাম্প বলে, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। অর্থাৎ এটি সীমিত সময়ের অভিযান হতে পারে। কিন্তু পরে আবার বলেন, প্রয়োজন হলে যতদিন দরকার ততদিন চলবে। এই দুই বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এর বিপরীতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেটে হেগসেথ বলে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং এটি সেরকম কোনো “অসীমকালীন সংঘাত” নয়। অর্থাৎ তিনি যুদ্ধকে সীমিত এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের মতো দেখাতে চান।

কিন্তু এই অবস্থান ট্রাম্পের কিছু বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না—

  • ট্রাম্প বলছে প্রয়োজনে যতদিন দরকার ততদিন যুদ্ধ চলতে পারে
  • প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলছেন এটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হবে না

ফলে প্রশাসনের ভেতরে কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এই মতপার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্তে প্রশাসনের একক বার্তা ও সমন্বয় থাকা দরকার। যখন বার্তা ভিন্ন ভিন্ন হয়, তখন আন্তর্জাতিক মহলেও একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ইরান কী লক্ষ্য করছে, যুদ্ধ কতদিন চলবে, এবং কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আছে কিনা এসব প্রশ্ন ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।

কুর্দি শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরাকের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ফোনে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে কুর্দি বাহিনীকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরোয়ান-এর অবস্থান এই পরিকল্পনার বড় বাধা।

যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি ও বাস্তবতা

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক যুক্তি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ইরান গোপনে আবার পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করেছে
  • তারা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে
  • এবং তারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আগাম হামলার পরিকল্পনা করছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা International Atomic Energy Agency এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে এসব দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা Defense Intelligence Agency-ও জানিয়েছে, ইরান আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কোনো প্রকল্প শুরু করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন নীতি সম্ভবত ২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো-কে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় অনুপ্রাণিত। তবে ইরান ভেনেজুয়েলার মতো নয়; এটি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র, যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনেক বড় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আসলে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকটগুলোর একটি তৈরি করেছে।

ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে শাসনব্যবস্থা পতনের ফলে আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, অন্যদিকে ক্ষমতার শূন্যতা থেকে আরও কঠোর ও প্রতিশোধপরায়ণ শক্তির উত্থান ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে।

ফলে এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকেই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকেও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।