ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট – হামাস
শারম আল-শেখে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক মাস পর দখলদার বাহিনীর লঙ্ঘন সম্পর্কিত বিবৃতি
বিবৃতির শুরুতে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট – হামাস ভ্রাতৃপ্রতিম মধ্যস্থতাকারী দেশসমূহ, নৈতিক অবস্থান নেওয়া আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশ্বের স্বাধীন জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে, যারা গাজায় দখলদার সরকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিয়েছেন। আমরা মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করছি, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
আন্দোলন ও প্রতিরোধ শক্তিগুলো চুক্তির বাস্তবায়নে তাদের জাতীয় ও মানবিক দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছে। হামাস মধ্যস্থতাকারী, গ্যারান্টর রাষ্ট্র, এবং সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানায়, তারা যেন দখলদার সরকারকে চাপ প্রদান করে এসব পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘন ও চুক্তিভঙ্গ বন্ধে বাধ্য করে। এই লঙ্ঘনগুলো স্পষ্টতই চুক্তিকে দুর্বল ও ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রথমত: হামাসের পূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি
শারম আল-শেখে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রতিরোধ শক্তিগুলো চুক্তির সব শর্ত যথাযথভাবে পালন করেছে। চুক্তির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামাস ২০ জন ইজরায়েলি বন্দিকে জীবিত অবস্থায় হস্তান্তর করে এবং মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ে নিহতদের দেহাবশেষ শনাক্তে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখে।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, গাজার ভূচিত্র পরিবর্তন, অবকাঠামোর ধ্বংস, দখলদার বাহিনীর ৬০% এলাকায় নিয়ন্ত্রণ এবং বিস্ফোরিত না হওয়া গোলাবারুদের ঝুঁকি সত্ত্বেও হামাস অভিযান অব্যাহত রাখে। এসব জটিলতা আরও বেড়েছে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা, বন্দি পাহারায় থাকা যোদ্ধাদের শাহাদাত, অসংখ্য শহীদের দেহাবশেষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া, এবং কিছু দখলদার বন্দির একই পরিণতির সম্ভাবনার কারণে।
তবুও হামাস ২৮টির মধ্যে ২৪টি দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং অবশিষ্ট দেহাবশেষের অবস্থানও মধ্যস্থতাকারী ও রেড ক্রসের মাধ্যমে জানিয়েছে। হামাস তার অঙ্গীকারের পূর্ণতা কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করেছে।
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ৩১ দিন পর দখলদার বাহিনীর লঙ্ঘনসমূহ
চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই দখলদার সরকার পরিকল্পিতভাবে এটি লঙ্ঘন করে চলেছে। তাদের লঙ্ঘনসমূহের মধ্যে রয়েছে—
১. বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা:ইজরায়েলি হামলায় ২৭১ ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন, যাদের ৯১% বেসামরিক। নিহতদের মধ্যে ১০৭ শিশু, ৩৯ নারী এবং ৯ প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন।
২. আহত:৬২২ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন, যাদের ৯৯% বেসামরিক; এদের মধ্যে ২২১ শিশু, ১৩৭ নারী এবং ৩৩ প্রবীণ ব্যক্তি।
৩. গ্রেপ্তার: ৩৫ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে জেলেরা এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকার সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।
৪. ঘরবাড়ি ধ্বংস: দখলদার বাহিনী নিয়মিতভাবে সীমান্তের ভেতরের বাড়িঘর ধ্বংস করছে যা স্পষ্টভাবে চুক্তি লঙ্ঘন।
৫. সামরিক সীমারেখা অতিক্রম: তারা চুক্তিতে নির্ধারিত অস্থায়ী প্রত্যাহার রেখা অতিক্রম করে ৩৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে।
৬. জাতিসংঘের সাহায্য অবরোধ: ইজরায়েল UNRWA-এর মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে ৬,০০০টিরও বেশি ট্রাক আটকে আছে।
৭. ত্রাণ ও জ্বালানির ঘাটতি: চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তা ২০০-এর নিচে। জ্বালানি ট্রাকের পরিমাণও নির্ধারিত সংখ্যার ১০% এরও কম।
৮. বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না করা: চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর শর্ত থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
৯. অবকাঠামো পুনর্গঠনে বাধা: ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে দখলদার বাহিনী বাধা দিচ্ছে।
১০. রাফাহ সীমান্ত বন্ধ রাখা: চুক্তি অনুযায়ী ২০ অক্টোবর থেকে রাফাহ সীমান্ত খোলার কথা থাকলেও এটি এখনও বন্ধ রয়েছে, ফলে হাজারো মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে।
১১. যুদ্ধ পুনরায় শুরুর উসকানি: দখলদার নেতারা প্রতিদিনই প্রকাশ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর হুমকি দিচ্ছেন।
১২. শহীদদের মরদেহ বিকৃতকরণ: ইজরায়েল বিকৃত অবস্থায় বহু ফিলিস্তিনি মরদেহ ফেরত দিয়েছে যা যুদ্ধাপরাধের শামিল।
১৩. বন্দি ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা গোপন: এক মাস পার হলেও ইসরায়েল পূর্ণ বন্দি তালিকা দেয়নি; বহু নাম পুনরাবৃত্ত বা বাদ রাখা হয়েছে।
উপসংহার ও দাবি
ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট – হামাস ও প্রতিরোধ বাহিনী শারম আল-শেখ চুক্তির প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করছে এবং দখলদার সরকারের চলমান লঙ্ঘনের দায়ভার তার ওপরই বর্তায় বলে ঘোষণা করছে।
হামাস আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী, রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়—
১. চুক্তির সব শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২. গাজায় হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা।
৩. নির্ধারিত সীমারেখা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা।
৪. চুক্তি অনুযায়ী ত্রাণ ও জ্বালানি প্রবেশ নিশ্চিত করা।
৫. UNRWA-কে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা।
৬. রাফাহ ও জিকিম সীমান্ত তাৎক্ষণিকভাবে উন্মুক্ত করা।
৭. জরুরি আশ্রয়ের জন্য ৩ লক্ষ তাঁবু প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।
৮. অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।
৯. গাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
১০. সকল ফিলিস্তিনি বন্দি ও নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা।
১১. চিকিৎসা, মানবিক ও গণমাধ্যম মিশনের প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা।
ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট – হামাস
১০ নভেম্বর ২০২৫