মুসলিম পোর্ট

ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, তা স্বাধীনতার পর দিল্লির ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাগুলোর একটি। তিন দিনের এই সহিংসতায় বহু পরিবার চিরতরে ভেঙে পড়ে, বহু মানুষ প্রাণ হারায়, আর শত শত পরিবার আজও সেই ক্ষতচিহ্ন বহন করে চলছে। ছয় বছর পার হলেও এই দাঙ্গার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। কিন্তু এই প্রতিবেদনে কেবলই একটি দাঙ্গার বাইরে গিয়ে এর পেছনের শিকড় এবং সেই শিকড় থেকে গজিয়ে ওঠা আজকের বাস্তবতার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

পটভূমি: নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ও প্রতিবাদ আন্দোলন

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA) পাস করে, যা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা ছয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভিবাসীদের ত্বরিত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়, কিন্তু এই তালিকায় ইসলাম ধর্মকে রাখা হয়নি। জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (NRC) সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই আইনকে ভারতের মুসলিমরা তাদের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। ফলে দেশজুড়ে, বিশেষত দিল্লির শাহীনবাগে, ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মূলত মুসলিম নারীরা। তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি সারা ভারতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য একটি রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দাঙ্গার সূচনা ও তিন দিনের সহিংসতা

২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি পরাজিত হয়। এর কিছুদিন পরই, ২৩ ফেব্রুয়ারি, বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র জাফরাবাদে চলমান সিএএ-বিরোধী অবস্থান কর্মসূচি সরিয়ে নেওয়ার জন্য পুলিশকে চরমপত্র দেন এবং ব্যর্থ হলে নিজেই “রাস্তায় নামার” হুমকি দেন। এই উসকানিমূলক বক্তব্যের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তী তিন দিন ধরে অব্যাহত থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মোতাবেক, হিন্দু জনতার দল তলোয়ার, লাঠি ও পেট্রোল বোমা হাতে মুসলিম পাড়াগুলোতে ঢুকে বাড়িঘর, দোকানপাট ও মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলাকারীরা ভুক্তভোগীদের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে বেছে বেছে হামলা চালায় বলে একাধিক স্বাধীন অনুসন্ধানে উঠে আসে। দিল্লির অগ্নিশমন বিভাগ জানায়, শুধু ২৪ ফেব্রুয়ারি একদিনেই উত্তর-পূর্ব দিল্লি থেকে ৪৫টি আগুনের ডাক আসে, এবং আগুন নেভাতে যাওয়া একটি ইঞ্জিনেও পাথর ছোড়া হয়, আরেকটি ইঞ্জিন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সেদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার জরুরি ফোন আসে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের মাঝেই যখন দিল্লির এক প্রান্ত জ্বলছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদি মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে রাষ্ট্রীয় বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন।

ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান

মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই সহিংসতায় মোট ৫৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ জন ছিলেন মুসলিম; নিহতদের মধ্যে একজন পুলিশ কর্মী ও একজন সরকারি কর্মকর্তাও ছিলেন। দুই শতাধিক মানুষ আহত হন, যাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। দিল্লির নিউ মুস্তাফাবাদের আল-হিন্দ হাসপাতালে সেই সময় একমাত্র ডাক্তার হিসেবে কাজ করছিলেন একজন দন্তচিকিৎসক, যিনি স্বেচ্ছায় সাহায্যে এসেছিলেন কিন্তু আগে কখনো গুলির ক্ষত চিকিৎসা করেননি। অশোক নগর ও ব্রিজপুরীতে মসজিদ আগুনে পোড়ানো হয়; একটি মসজিদের মিনারে হনুমান পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হয় এবং কুরআনের পাতা ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। বহু বাড়ি, দোকান ও স্কুল ধ্বংস হয়, হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি রুপিতে গিয়ে পৌঁছায়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী তরুণ।

ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি

পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা মানুষের কষ্টের গল্পগুলোই এই দাঙ্গার আসল চিত্র তুলে ধরে।

মল্লিকার স্বামী মুশাররাফকে জনতা তার নিজের ঘরের সামনেই নির্মমভাবে পিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারে। প্রতিবেশী একটি হিন্দু পরিবার তাদের গেট বন্ধ করে দেওয়ায় পালানোর সুযোগও ছিল না। দুই শতাধিক মানুষের জনতার সামনে তিনি স্বামীকে বাঁচাতে অক্ষম ছিলেন। হাতে অস্ত্র নিয়ে ঘেরা মবের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই অসহায়তার স্মৃতি প্রতিটি রাতে তাকে তাড়া করে ফেরে। তার সন্তানরা আজ এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যে পৃথিবী তাদের কাছ থেকে বাবাকে কেড়ে নিয়েছে।

নার্গিস তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তার স্বামী মুরসালিন কাজে গিয়ে আর ফেরেননি; পরে তার ভয়াবহভাবে বিকৃত লাশ পাওয়া যায়। শিববিহারের সরু গলিতে তিন সন্তান নিয়ে একা সংগ্রাম করে চলা নার্গিসের মেয়ে আজও রাতে কাঁদে; এক বাবার জন্য, যাকে সে কখনো দেখার সুযোগই পায়নি। বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ হিসেবে নার্গিসতার সন্তানদের মুখের দিকে তাকান।

জাহিরার ছোট কিন্তু সুখী সংসার ছিল। স্বামীকে হারানোর পর সেই ঘরের নিরাপত্তা ও শান্তি চিরতরে মিলিয়ে গেছে। দাঙ্গার পর স্বামীর মরদেহের খোঁজে তার যে বিভীষিকাময় অনুসন্ধান চলেছিল—হাসপাতাল থেকে মর্গ, মর্গ থেকে থানা, সেই স্মৃতি আজও তাকে ঘুমাতে দেয় না। তার সন্তানরা বাবা ছাড়াই বড় হচ্ছে, এবং প্রতিদিন সেই অনুপস্থিতির ভার বহন করছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে আসা আরও বহু মানুষের গল্পও এই একই বেদনার সুতোয় গাঁথা—বৈদ্যুতিক দোকানদার আশফাক, যিনি সন্ধ্যায় ফিরে আসেননি; রাজমিস্ত্রি কুরাইশি, যার গলা কাটা লাশ হাসপাতালের মর্গে পাওয়া গেছে; ওয়েল্ডার শাওয়ান, যাকে তার পরিবার তিনটি দিন ধরে খুঁজেছে। প্রত্যেকের পরিবার আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।

পুলিশের ভূমিকা ও বিচারহীনতা

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২২ সালের প্রতিবেদন মোতাবেক, দিল্লি পুলিশের তদন্তে পক্ষপাত, দীর্ঘসূত্রতা, অসম্পূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ ও পদ্ধতিগত ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দিল্লি পুলিশ সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়, যার প্রধান ছিলেন বিজেপি নেতা অমিত শাহ; যা তদন্তে নিরপেক্ষতার ন্যূনতম প্রত্যাশাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। দিল্লি সংখ্যালঘু কমিশনের নিজস্ব অনুসন্ধানে বলা হয়, এই সহিংসতা “পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক” ছিল এবং কিছু পুলিশ সদস্য সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিল।

একাধিক আদালত পুলিশের তদন্তকে “ছিদ্রময়”, “উদাসীন” ও “হাস্যকর” বলে মন্তব্য করেছেন। বিচারক বিনোদ যাদব দাঙ্গা-সংক্রান্ত তদন্তে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ করেন; কিছুদিনের মধ্যেই তাকে বদলি করা হয়। অন্যদিকে, যে কর্মী ও সংগঠকরা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—উমর খালিদ, খালিদ সাইফি, শারজিল ইমাম, গুলফিশা ফাতিমাসহ অনেকে—তাদের কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে বছরের পর বছর বিনাবিচারে আটক রাখা হয়। প্রায় পাঁচ বছর কারাবাসের পর অনেকের মামলার শুনানিই শুরু হয়নি, আর যখন শুরু হয়েছে তখন বিচারক মাঝপথে বদলি হয়ে গেছেন বা নিজেই সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সময়ে, সহিংসতায় উসকানিদাতা হিসেবে অভিযুক্ত কপিল মিশ্র ২০২৫ সালে দিল্লিতে বিজেপির নতুন সরকার গঠনের পর আইন ও বিচার মন্ত্রীর পদে শপথ নেন।

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব

দাঙ্গার ক্ষত শুধু শারীরিক নয়, তা গভীর মানসিক দাগ রেখে গেছে। জীবিত স্বজনেরা রাতের পর রাত দুঃস্বপ্নে সেই আর্তনাদ আর সহিংসতার দৃশ্য ফিরে পান। প্রতিবেশীদের প্রতি যে বিশ্বাস ছিল, সহিংসতার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া গেটের কাছে সেই বিশ্বাস থেমে গেছে। সরকারি ক্ষতিপূরণ ও সাহায্য থাকলেও তা পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় অপ্রতুল বলে ভুক্তভোগীরা বারবার অভিযোগ করেছেন। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নিম্ন আয়ের এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অসচেতন, ফলে দীর্ঘ বিচারিক লড়াই চালানোর সামর্থ্যও তাদের সীমিত। সন্তানরা, যারা বাবাকে হারানোর সময় খুব ছোট ছিল, আজও সেই অনুপস্থিতির বোঝা বহন করে চলেছে। পরিবার চালানোর দায় এসে পড়েছে নারীদের কাঁধে, যারা একই সাথে শোক, গরীবি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দিল্লি দাঙ্গাকে বিচ্ছিন্ন একটি সাম্প্রদায়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পেছন ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি ছিল ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রকল্পের এক দৃশ্যমান প্রকাশ। সেই দাঙ্গার আগুন নেভার পরেও আগুন থামেনি। শুধু তার রূপ বদলে গেছে।

বুলডোজার রাজনীতি ও সম্পত্তি ধ্বংস

দাঙ্গার পরবর্তী বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিম বাড়িঘর, দোকানপাট ও উপাসনালয় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে নতুন কৌশল চালু হয়েছে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাকে “বুলডোজার জাস্টিস” বলে চিহ্নিত করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্তে দেখা যায়, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে আসাম, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা মুসলিমদের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য কর্তৃপক্ষ এই ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে; কমপক্ষে ৬১৭ জন মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারান। ২০২৪ সালে মধ্যপ্রদেশের মান্ডলায় ১১টি মুসলিম বাড়ি কেবল এই অভিযোগে ভেঙে দেওয়া হয় যে তাদের রেফ্রিজারেটরে গরুর গোশত পাওয়া গেছে, অথচ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অন্য বাড়িগুলো অবৈধ নির্মাণ হওয়া সত্ত্বেও অক্ষত রাখা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে আহমেদাবাদের চান্দোলা হ্রদ এলাকায় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকরা জানান, ১০,০০০-এরও বেশি কাঠামো—বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদসহ,মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হন।

ঘৃণার রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রচারণা

২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুসলিমদের বারবার “অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে চিত্রিত করেন, দাবি করেন মুসলিমদের “বেশি সন্তান” জন্মদানের প্রবণতা আছে এবং হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কা ছড়িয়ে দেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রচারসভায় হুমকি দেন যারা মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পথ অনুসরণ করে, তাদের “বুলডোজার দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হবে।” হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মোদির প্রচারণা ধারাবাহিকভাবে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বিদ্বেষ ও সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে। ২০২৫ সালে এসে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্রতিটি নতুন বৈষম্যমূলক ঘটনা আগেরটির চেয়ে কম আলোড়ন তৈরি করছে—যা একসময় জাতীয় বিবেককে নাড়া দিত, তা এখন প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা বা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

ওয়াকফ সংশোধন আইন ২০২৫: আইনের মোড়কে সম্পদ কেড়ে নেওয়া

২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতীয় সংসদ ওয়াকফ সংশোধনী আইন পাস করে, যা মুসলিম সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় ও দাতব্য উদ্দেশ্যে যে সম্পদ আলাদা করে রেখেছে তার নিয়ন্ত্রণ কার্যত রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়। ভারতে আনুমানিক ৮ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, যার মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা ও শতবর্ষী মাজার অন্তর্ভুক্ত। এই আইনে এমন কোনো শর্ত নেই যা হিন্দু মন্দির ট্রাস্ট বা খ্রিস্টান চার্চ কমিটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অথচ মুসলিম ওয়াকফ বোর্ডে অ-মুসলিম সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজেদের ধর্মীয় বিষয় পরিচালনার অধিকার দেয়—সমালোচকরা বলছেন, এই আইন সেই মৌলিক সাংবিধানিক গ্যারান্টিকে সরাসরি আঘাত করেছে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই আইনের কিছু ধারায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিলেও মূল আইন এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে বিদ্যমান। আইনটির বিরুদ্ধে সারা ভারতে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন হয়েছে, যাতে অন্তত তিনজন নিহত ও দেড় শতাধিক গ্রেপ্তার হয়েছেন।

একটি সম্প্রদায়ের দাঁড়ানোর জায়গা সংকুচিত হচ্ছে

ভারতে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ১৪.২ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় ১৭ কোটি ২২ লক্ষ—বিশ্বের মোট মুসলিম জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশ। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন মোতাবেক, ভারতীয় মুসলিমরা প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্পদ ও ভোগমাত্রার দিক থেকে সবচেয়ে নিচে। এই বিশাল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমাজের প্রান্তে টিকে থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

মল্লিকা, নার্গিস, জাহিরার মতো নারীরা যে পৃথিবীতে আজ বেঁচে আছেন, সেটি ২০২০ সালের চেয়ে নিরাপদ হয়নি—বরং সহিংসতার অস্ত্র কেবল বদলে গেছে। আগে ছিল তরোয়াল আর পেট্রোল, এখন আছে বুলডোজার আর আইনের খসড়া। আগে মসজিদ জ্বালানো হতো আগুনে, এখন ওয়াকফ সংশোধনীর কলমে তার ভিতের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যে সন্তান বাবা হারিয়েছে সে এখন বড় হয়ে এমন এক দেশে বাস করছে, যেখানে তার পরিচয়টাই তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে রাষ্ট্রের সন্দেহের তালিকায় রাখা হচ্ছে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির সেই তিন দিনের দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু সেই দাঙ্গার মূলে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প ছিল, তা থামেনি। বরং তা প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, ভোটে বৈধতা পেয়েছে, আইনের লেবাস পরেছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিধ্বস্ত গলিগুলোর কথা মনে রাখা শুধু স্মরণের বিষয় নয়, এটি এখন সতর্কতার দায়।

লিখেছেনঃ মুয়াজ বিন মুসলিম