চলতি বছরের মার্চ মাসে হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারো পাহাড়। সেখানে অবস্থিত স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদের “বাংলাদেশি” তকমা দিয়ে এক বড় ধরনের সহিংসতা শুরু করে সেখানকার উপজাতিবাদী এক দল। যে সহিংসতার ফলে ৩০টিরও বেশি মুসলিম মালিকানাধীন দোকান-পাট ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং দুইজন মুসলিম যুবক প্রাণ হারান। কিন্তু এই সহিংসতার পেছনে শুধু সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নয়, রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, রয়েছে পাঁচশো বছরের পুরনো ইতিহাসের সুচিন্তিত বিকৃতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার মরিয়া লড়াই।
ঘটনার সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৬ সালের ৯ মার্চ গারো হিলস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল বা GHADC-এর আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে তুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে যান ফুলবাড়ি সমভূমির সাবেক বিধায়ক ও তৃণমূল কংগ্রেস নেতা এস. জি. এসমাতুর মোমিনিন। সেখানে একদল উপজাতীয় প্রার্থী তাঁকে বাধা দেয় এবং মারধর করে মুখে গুরুতর আঘাত করে। “তুমি এখানে কেন এসেছ? তোমার এখানে কী কাজ? আমরা অ-আদিবাসীদের নির্বাচনে দাঁড়াতে দেব না” — এই বলে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
ওই দিন সন্ধ্যায় মুসলিম প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন চিবিনাং বাজার এলাকায় বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন ৩০টিরও বেশি দোকান ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। তুরার জামে মসজিদে হামলা চালিয়ে ইমামকে মারধর করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, পাশের হিন্দু মন্দির অক্ষত রেখে কেবল মুসলিম সম্পত্তি লক্ষ্য করে আক্রমণ পরিচালিত হয়।
১০ মার্চ ভোরের আগে থেকেই বহু মুসলিম পরিবার এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী আসাম রাজ্য অথবা কাছের গ্রামে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। মহিলা ও শিশুদের আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, “দোকান পুড়ে গেছে, বাড়ি পুড়ে গেছে। হাতে কিছু নেই। শুধু ভয় নিয়ে বের হয়েছি।”
ওই দিনই চিবিনাং-এর দীর্ঘদিনের বাসিন্দা দুই মুসলিম যুবক খায়রুল ইসলাম ও আশরাফুল ইসলাম নিহত হন। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, একজন দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে ও অন্যজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যান। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর প্রাথমিক দাবি পোস্টমর্টেম প্রতিবেদনে নাকচ হয়।
সহিংসতা ১১ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পূর্ব ও পশ্চিম গারো পাহাড়সহ পাঁচটি জেলায় সার্বক্ষণিক কারফিউ জারি করা হয়। ৪৮ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়, যে কারণে অনেক বাসিন্দা কারফিউর বিষয়ে সময়মতো জানতে পারেননি। সেনাবাহিনী ও সিআরপিএফ মোতায়েন করে ফ্ল্যাগ মার্চ পরিচালনা করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি: নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি আপাত নিয়ন্ত্রণে এলেও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ এখনও এলাকায় ফেরেনি। সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে মার্চ মাসেই GHADC-এর এক বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সংশোধনী পাস হয়, যাতে তফশিলি উপজাতি বা ST সার্টিফিকেট ছাড়া নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। মেঘালয়ের রাজ্যপাল সি. এইচ. বিজয়াশঙ্কর সেই সংশোধনীতে স্বাক্ষর করেন। প্রতিষ্ঠার ৭৪ বছর পর প্রথমবারের মতো GHADC নির্বাচনে অ-আদিবাসীদের প্রার্থিতার পথ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
“বাংলাদেশি” তকমা ও গারো পাহাড়ে বাঙালির পাঁচশো বছরের ইতিহাস
সহিংসতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে একজন গারো নেতাকে বলতে শোনা যায়, “এ জমি তোমার নয়। এখানে ‘আল্লাহু আকবর’ চলবে না।” পশ্চিম গারো পাহাড়ের বাঙালি মুসলমানদের “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে চিহ্নিত করার এই বয়ান নতুন নয়, কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে এর সরাসরি সংঘাত রয়েছে।

পাঁচশো বছর আগের শিকড়:
এই অঞ্চলে বাঙালির সুসংগঠিত উপস্থিতির সূচনা ১৪৯৮ সালে। বাংলা সালতানাতের সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজি ওই বছর কামতা রাজ্যের খেন রাজবংশকে পরাজিত করেন। সুলতানি বাহিনী হাজো পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। হুসেন শাহ নিজের মুদ্রায় নিজেকে “কামরূপ ও কামতার বিজেতা” হিসেবে ঘোষণা করেন। ওই অভিযানের সঙ্গে আসা বাংলাভাষী সৈনিক, প্রশাসক ও বণিকদের একটি অংশ এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
পরবর্তীতে মুঘল আমলে প্রশাসনিক কাজ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের খাতিরে সেখানে বসতি স্থাপনঅব্যাহত থাকে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে চা-বাগানের শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসায়ী হিসেবে আরও বাঙালি এই অঞ্চলে আসেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত বহু মুসলিম পরিবার বাংলাদেশে এসে স্থায়ী হন। তবুও বহু বাঙালি মুসলমানই মেঘালয়ের পাহাড়ের এলাকায় রয়েই যায়।

সংখ্যার বাস্তবতা: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সমগ্র মেঘালয়ে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ৪.৪ শতাংশ। গারো হিলস অঞ্চলে এই হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং পশ্চিম গারো পাহাড় জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা মোট ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৬ জনের মধ্যে ৮৭ হাজার ৬৭১ জন, অর্থাৎ ১৭.৬৫ শতাংশ। পশ্চিমে আসামের ধুবড়ি জেলা ও দক্ষিণে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় উপজাতীয় সংগঠনগুলো এই পরিসংখ্যানকে অনুপ্রবেশের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
তবে তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এই মুসলিম পরিবারগুলোর সবার কাছেই ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড রয়েছে। মেঘালয়ের ৬০ আসনের বিধানসভায় পশ্চিম গারো পাহাড় থেকে দুজন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। মেঘালয়ের অ-ST জনগোষ্ঠীর ২৯ শতাংশই মুসলিম। বর্তমানে GHADC-তে দুজন বাঙালি-মুসলিম পরিষদ সদস্যও রয়েছেন।
সহিংসতার পেছনে লুকিয়ে থাকা গোপন রাজনীতি
এই সংঘর্ষকে শুধু আদিবাসী-অ-আদিবাসী দ্বন্দ্ব হিসেবে বিশ্লেষণ করলে ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা অনুপস্থিত থেকে যায়। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির সুনির্দিষ্ট স্বার্থ।
NPP-এর অবস্থান পরিবর্তন: সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ও NPP-এর জাতীয় সভাপতি কনরাড সাংমার ভূমিকা। সহিংসতার আগে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, নির্বাচকমণ্ডলীর তালিকা সংশোধন না করে ST সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা আইনসিদ্ধ নয়। কিন্তু সহিংসতার পর দলটির অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী নতুন সংশোধনীকে “ঐতিহাসিক মাইলফলক” বলে বর্ণনা করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে রাজ্যপালকে ধন্যবাদ জানান। NPP বিষয়টিকে দলীয় অর্জন হিসেবে প্রচার করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন যে, সহিংসতার আগে যা “আইনগতভাবে সম্ভব নয়” বলা হয়েছিল, তা সহিংসতার পর এত দ্রুত বাস্তবায়িত হলো কীভাবে?

BJP-এর ভূমিকা: মেঘালয় বিজেপির বার্নার্ড মারাকের নেতৃত্বে দলটিই সর্বপ্রথম GHADC নির্বাচনে অ-আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধের দাবি তোলে। জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” আখ্যানের সাথে এই অবস্থান সঙ্গতিপূর্ণ। রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো মেঘালয়ে বিজেপির একক সরকার গঠনের সামর্থ্য নেই এবং NPP-এর সাথে জোট বজায় রাখা দলটির জন্য অপরিহার্য। ফলে এই ইস্যুতে NPP-কে সমর্থন দেওয়া বিজেপির জন্যও কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।
ষষ্ঠ তফসিলের রাজনৈতিক ব্যবহার: GHADC ১৯৫২ সালে ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আদিবাসীদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে গঠিত হয়েছিল। এই সাংবিধানিক কাঠামোকে ব্যবহার করে ২০০৮ সালেও কংগ্রেস সরকারকে চাপে ফেলা হয়েছিল। এবার পরিকল্পনা শুরু হয় আরও আগে থেকে। সহিংসতার এক মাস আগে ফেব্রুয়ারিতেই AHAM নামের একটি গারো সংগঠন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে অ-আদিবাসীদের ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। পরবর্তী সহিংসতা সেই দাবিকে “জনআকাঙ্ক্ষা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো এই নজির ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে। মেঘালয়ের GHADC-এর এই সিদ্ধান্তের ধারায় আসামের কার্বি আংলং-সহ অন্যান্য ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত এলাকায় একই ধরনের দাবি উঠতে পারে, যেখানে বাঙালি হিন্দু ও উত্তর ভারতীয় সম্প্রদায়ও একই পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
গারো পাহাড়ের বাঙালিদের ভবিষ্যৎ: তিনটি পথ, সবই কণ্টকাকীর্ণ
নতুন সংশোধনী কার্যকর হওয়ার পর পশ্চিম গারো পাহাড়ের বাঙালি মুসলমানদের সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা রয়েছে, তবে প্রতিটিতেই উল্লেখযোগ্য বাধা বিদ্যমান।
আইনি লড়াই: মেঘালয় হাইকোর্ট এর আগে ST সার্টিফিকেট সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করেছিল। কিন্তু এবার GHADC-এর বিশেষ অধিবেশনে পাস হওয়া সংশোধনী এবং রাজ্যপালের অনুমোদন — এই দুটি মিলিয়ে আইনি অবস্থান আগের চেয়ে অনেক মজবুত। উচ্চতর আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল এবং ফলাফল অনিশ্চিত। সম্পদ হারানো ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পক্ষে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া বাস্তবিকভাবে কঠিন।
বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব ধরে রাখা: GHADC থেকে বাদ পড়লেও মেঘালয়ের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীরা এখনও অংশ নিতে পারবেন। পশ্চিম গারো পাহাড় থেকে বর্তমানে দুজন মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন। তবে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ হলো জমি বরাদ্দ, বন ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব হারানো। রাজ্য বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই জনগোষ্ঠীর অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।
স্থায়ী স্থানান্তর: ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর একটি অংশ আসামে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার না করে এবং ভিটেমাটি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়াটাই যদি কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে কোনো আনুষ্ঠানিক বিতাড়ন ছাড়াই ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠী এই অঞ্চল ছেড়ে যাবে।
মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বলেছেন, “আমি নিশ্চিত আমাদের অ-আদিবাসী বন্ধুরা বুঝবেন যে এই কাউন্সিল সবসময় আদিবাসীদের জন্যই ছিল। আমরা সবাই মিলে শান্তি ও সম্প্রীতিতে এগিয়ে যাব।” তবে সম্পত্তি হারানো ও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে এই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন কতটুকু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
পাঁচশো বছর আগে বাংলা সালতানাতের অভিযানের সূত্রে যে বাঙালি এই অঞ্চলে প্রথম স্থায়ী হয়েছিল, তারপর মোঘল আমল ওব্রিটিশ আমলে যারা এখানে বসবাস শুরু করেছিল, আজ তাদের উত্তরসূরিরা নিজ ভূমিতে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আগামীতে এই জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আদালতের রায় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর।
লিখেছেনঃ মুয়াজ বিন মুসলিম