Skip to main content

মুসলিম পোর্ট

মুসলিম পোর্ট লোগো
মুসলিম পোর্টসর্বাগ্রে উম্মাহ
প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা

স্টারলিংক থেকে স্টারশিল্ড: ইলন মাস্কের সামরিক উপগ্রহ সাম্রাজ্য!

✍️ লিখেছেন: মেহেদী হাসান

একসময় মহাকাশ ছিল মূলত রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও পরে চীন সহ বড় শক্তিগুলোই মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানো, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রধান খেলোয়াড় ছিল। কিন্তু সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শুধু মহাকাশে ব্যবসা করছে না; তারা রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেট উৎক্ষেপণ ও ইলন মাস্ক

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি ইলন মাস্কের স্পেসএক্স। সাধারণ মানুষের কাছে স্পেসএক্সের সবচেয়ে পরিচিত প্রকল্প স্টারলিংক হাজার হাজার উপগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সরবরাহের ব্যবস্থা, কিন্তু স্টারলিংকের আড়ালে একই প্রযুক্তিগত ভিত্তিকে ব্যবহার করে আরও একটি শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে— আর সেটি হলো স্টারশিল্ড (Starshield)।

স্টারশিল্ড শুধু ইন্টারনেট সরবরাহের জন্য তৈরি কোনো বাণিজ্যিক সেবা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য তৈরি একটি বিশেষায়িত মহাকাশ অবকাঠামো। আর এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামরিক যোগাযোগ, গোয়েন্দা নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান শনাক্তকরণ, লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য সরবরাহের সক্ষমতা।

ফলে স্টারলিংক থেকে স্টারশিল্ডে স্পেসএক্সের যাত্রা কেবল একটি ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদযাত্রা।

স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ যেভাবে এলো

স্টারশিল্ডের পেছনে মূল প্রযুক্তি হলো স্টারলিংক। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit—LEO) বিপুলসংখ্যক ছোট উপগ্রহ স্থাপন করে দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করেছে স্পেসএক্স। প্রচলিত বড় ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক উপগ্রহের পরিবর্তে অনেকগুলো ছোট উপগ্রহ ব্যবহার করার এই পদ্ধতি মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ও নজরদারির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এই প্রযুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করার পথ আরও স্পষ্ট হয় ২০২১ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিকনাইস্যান্স অফিস (NRO) স্পেসএক্সের সঙ্গে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করে। এর লক্ষ্য ছিল শত শত উপগ্রহ নিয়ে একটি শ্রেণিবদ্ধ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করা। আর এই প্রকল্পের সঙ্গেই স্টারশিল্ড যুক্ত হয়।

এর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর প্রায় যেকোনো অঞ্চলের ওপর দ্রুত নজরদারি চালানো, বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলো দ্রুত ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। উপগ্রহগুলোর মধ্যে লেজার যোগাযোগব্যবস্থা থাকায় একটি উপগ্রহ থেকে অন্য উপগ্রহে সরাসরি তথ্য পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে সব তথ্যকে প্রতিবার মাটির স্টেশনে নামিয়ে আবার পাঠানোর প্রয়োজন কমে যায়।

এটি সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েক মিনিট বা কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানও অনেক সময় একটি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা এবং সেটিতে আঘাত হানার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

স্পেসএক্সের উপগ্রহ মহাকাশে মুক্ত হচ্ছে

স্টারশিল্ডের চোখ কতটা শক্তিশালী?

স্টারশিল্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত উপগ্রহব্যবস্থা নয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে।

এর মধ্যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অপটিক্যাল ক্যামেরা, রাডারভিত্তিক ছবি সংগ্রহের প্রযুক্তি, সংকেত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার মতো প্রযুক্তি রয়েছে।

অপটিক্যাল সেন্সর দিয়ে দিনের আলোতে ভূপৃষ্ঠের অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি সংগ্রহ করা যায়। রাডারভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সুবিধা হলো, মেঘ বা অন্ধকারের মধ্যেও নির্দিষ্ট ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। অন্যদিকে সংকেত গোয়েন্দা প্রযুক্তি রেডিও, যোগাযোগ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সংকেত পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে।

এর অর্থ হলো, একটি বিশাল মহাকাশ নেটওয়ার্ক একই সঙ্গে দেখতে, শনাক্ত করতে, তথ্য সংগ্রহ করতে এবং সেই তথ্য দ্রুত অন্য জায়গায় পাঠাতে সক্ষম হয়ে উঠছে।

স্টারশিল্ডের নির্দিষ্ট উপগ্রহে কোন ধরনের সেন্সর বা কতটা ক্ষমতার যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বড় অংশই প্রকাশ্য নয়। কারণ এগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সামরিক সক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

উপগ্রহ ও ভূপৃষ্ঠের নজরদারি ডেটা

কয়েকটি বড় উপগ্রহের বদলে শত শত ছোট উপগ্রহ

এখানেই স্টারশিল্ডের প্রকৃত শক্তি।

প্রচলিত সামরিক মহাকাশব্যবস্থায় কয়েকটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী উপগ্রহের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা ছিল। একটি উপগ্রহ নষ্ট হলে বা শত্রুপক্ষ সেটিকে অকার্যকর করতে পারলে পুরো ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু স্টারশিল্ডের মতো বিস্তৃত নেটওয়ার্কে শত শত উপগ্রহ একসঙ্গে কাজ করে।

একটি উপগ্রহ ধ্বংস হলেও অন্যগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নজরদারির প্রয়োজন হলে একাধিক উপগ্রহ সেই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে। ফলে পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে অকার্যকর করা অনেক কঠিন। এই ধারণাকে বলা হয় বহুসংখ্যক উপগ্রহভিত্তিক বা ছড়িয়ে থাকা মহাকাশ নেটওয়ার্ক। আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

২০২৬ সালের আগস্ট নাগাদ স্টারশিল্ড নেটওয়ার্কে প্রায় ২৪৫টি উপগ্রহ থাকার কথা সামনে এসেছে এবং এর বড় একটি অংশ মাত্র গত আট মাসে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটির সম্প্রসারণের গতি অত্যন্ত দ্রুত।

আর এই উপগ্রহগুলোর অনেকগুলোই স্টারলিংকের নতুন প্রজন্মের ভারী উপগ্রহ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে একই ধরনের ভিত্তি ব্যবহার করছে। ফলে বাণিজ্যিক ও সামরিক মহাকাশ অবকাঠামোর মধ্যে প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে।

তৈরি হচ্ছে সামরিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক

স্টারশিল্ডের পাশাপাশি স্পেসএক্স আরও বড় একটি সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো MILNET।

মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় MILNET হচ্ছে নিম্ন কক্ষপথে থাকা বিপুলসংখ্যক উপগ্রহের একটি সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। এর আকার প্রায় ৪৮০টি উপগ্রহ পর্যন্ত হতে পারে।

এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য আদান-প্রদান, ড্রোন পরিচালনা, নৌবাহিনীর যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সামরিক প্ল্যাটফর্মের মধ্যে তথ্য সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।

অর্থাৎ একটি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা, বিমান, নৌবাহিনী, ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের সেন্সর যে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি করবে, সেই তথ্য দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য মহাকাশে একটি বিশাল যোগাযোগের জাল তৈরি হচ্ছে।

এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি ড্রোন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করল। সেই তথ্য যদি কয়েক মিনিটের মধ্যে কমান্ড সেন্টারে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধবিমান বা অন্য কোনো অস্ত্রব্যবস্থার কাছে চলে যায়, তাহলে লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

এই ধারাবাহিকতাকেই সামরিক ভাষায় “সেন্সর-টু-শুটার” (Sensor-to-Shooter) ব্যবস্থা বলা হয়। স্টারশিল্ড ও MILNET-এর মতো নেটওয়ার্কের লক্ষ্য হচ্ছে এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও স্বয়ংক্রিয় করে তোলা।

মহাকাশ থেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের লক্ষ্য শনাক্তকরণ

২০২৬ সালে স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের কাছ থেকে প্রায় ৪.১৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় চুক্তি পায়। প্রকল্পটি Space-Based Advanced Moving Target Indicator বা SB-AMTI নামে পরিচিত।

এর উদ্দেশ্য হলো মহাকাশ থেকে বিশ্বব্যাপী চলমান আকাশীয় লক্ষ্য শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা। বিশেষ করে বিমান বা অন্যান্য উড়ন্ত হুমকি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করলে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বিমান বা অন্য কোনো আকাশীয় লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর সেটির অবস্থান, গতিপথ ও গতিবিধির তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট সামরিক ব্যবস্থায় পাঠানো সম্ভব হবে।

ফলে মহাকাশে থাকা উপগ্রহ, মাটিতে থাকা রাডার, আকাশে থাকা ড্রোন ও বিমান এবং দূরপাল্লার অস্ত্র সবগুলোকে একই তথ্যব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর এটাই হবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের অন্যতম বড় পরিবর্তন।

পৃথিবীর কক্ষপথে সংযুক্ত উপগ্রহ নেটওয়ার্ক

পৃথিবীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিশাল নজরদারি ব্যবস্থা

স্টারশিল্ডের শক্তি শুধু একটি উপগ্রহের ক্ষমতায় নয়; বরং পুরো নেটওয়ার্কের সম্মিলিত ক্ষমতায়।

একটি উপগ্রহ হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময় একটি এলাকার ওপর দিয়ে যায়। কিন্তু শত শত উপগ্রহ থাকলে একই অঞ্চলের ওপর বারবার নজরদারি চালানো যায়। ফলে কোনো সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজ, বিমানঘাঁটি কিংবা চলমান সামরিক ইউনিটের অবস্থান পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

আর উপগ্রহগুলোর মধ্যে লেজার যোগাযোগ থাকলে সংগৃহীত তথ্য দ্রুত নেটওয়ার্কের অন্য অংশে পৌঁছে দেওয়া যায়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গতি।

আগে কোনো গোয়েন্দা ছবি সংগ্রহ করার পর সেটি বিশ্লেষণ করে সামরিক কমান্ডে পাঠাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারত। এখন লক্ষ্য হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়কে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। যুদ্ধক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, যে পক্ষ আগে দেখতে পাবে, আগে বুঝতে পারবে এবং আগে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তার সুবিধা বাড়বে।

স্পেসএক্সের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কতটা?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। স্পেসএক্স এখন শুধু একটি উৎক্ষেপণকারী কোম্পানি নয়। একই প্রতিষ্ঠান রকেট তৈরি করছে, উপগ্রহ তৈরি করছে, উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করছে, ইন্টারনেট দিচ্ছে, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করছে এবং গোয়েন্দা ও নজরদারি নেটওয়ার্কের অবকাঠামোও তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় এই নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার জন্য উৎক্ষেপিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপগ্রহ স্পেসএক্সের তৈরি বা সরবরাহ করা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেছে। ওই বিশ্লেষণে এমনও উঠে এসেছে যে নির্দিষ্ট ওই সময়পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের উৎক্ষেপিত উপগ্রহগুলোর একটি বড় অংশ স্পেসএক্সের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আর এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সরকারি চুক্তি। ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে স্পেসএক্সের সঙ্গে শত শত ফেডারেল চুক্তির তথ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর সম্ভাব্য মোট মূল্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর সবগুলো সামরিক চুক্তি নয়; নাসা ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার প্রকল্পও এর মধ্যে রয়েছে।

তারপরও সামগ্রিক চিত্রটি স্পষ্ট যে, মার্কিন সরকারের মহাকাশ অবকাঠামোর একটি বড় অংশেই এখন স্পেসএক্সের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।

লেজার সংযোগে যুক্ত সামরিক উপগ্রহ

কেন যুক্তরাষ্ট্র স্পেসএক্সের ওপর এত নির্ভর করছে?

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, স্পেসএক্স দ্রুত উপগ্রহ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, একই কোম্পানি নিজস্ব রকেট ব্যবহার করে সেগুলো মহাকাশে পাঠাতে পারে।

তৃতীয়ত, ফ্যালকন ৯-এর মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট ব্যবহারের ফলে উৎক্ষেপণের খরচ ও সময় উভয়ই কমেছে।

চতুর্থত, স্টারলিংকের কারণে স্পেসএক্স ইতিমধ্যেই পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে হাজার হাজার উপগ্রহ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

ফলে যে কোম্পানি একই সঙ্গে উপগ্রহ বানাতে, উৎক্ষেপণ করতে এবং একটি বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে পারে, সামরিক মহাকাশ কর্মসূচির জন্য সেটি স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় অংশীদার হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সও এখন বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রযুক্তিকে সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করছে।

কিন্তু এর মধ্যে ঝুঁকিও আছে

একটি দেশের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ যদি একটি বেসরকারি কোম্পানির অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোম্পানির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যবস্থাপনা কাঠামো তখন জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই প্রশ্নটি সবচেয়ে আলোচিত হয় ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্টারলিংক ব্যবহার করেছে। কিন্তু ক্রিমিয়া এলাকায় স্টারলিংক ব্যবহারের একটি অনুরোধ নিয়ে ইলন মাস্কের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মাস্কের বক্তব্য ছিল, ক্রিমিয়ার কাছে স্টারলিংক সক্রিয় করলে সেটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের আক্রমণে সহায়তা করতে পারে এবং তিনি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাননি। এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যদি কোনো বেসরকারি কোম্পানির হাতে থাকে, তাহলে সেই কোম্পানির সিদ্ধান্ত কতটা সামরিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে?

এটি শুধু স্টারলিংক বা স্পেসএক্সের প্রশ্ন নয়। ভবিষ্যতে বেসরকারি কোম্পানির মহাকাশ অবকাঠামো যত বেশি সামরিক ব্যবস্থার অংশ হবে, এই প্রশ্ন তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইলন মাস্ক ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পরিচালনা করেন। স্পেসএক্স একটি সরকারি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব কমান্ড কাঠামো রয়েছে। এমনকি মাস্কের কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সব ধরনের অতি-সংবেদনশীল তথ্যও থাকে না।

সমস্যাটি বরং আরও গভীর, একটি রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কতটা বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে স্টারশিল্ড

স্টারশিল্ডের ব্যবহার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্য প্রকাশ্যে জানায় যে তারা স্পেসএক্সের স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহার করছে। ব্রিটেন প্রায় ৪ কোটি ডলার ব্যয়ে স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট সেবা নিয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার স্টারশিল্ড ও ৫০০ স্টারলিংক টার্মিনাল সংগ্রহ করেছে।

স্টারশিল্ড টার্মিনালগুলো উন্নত এনক্রিপশন এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক যোগাযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্তরাজ্যই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এমন একটি দেশ, যারা প্রকাশ্যে স্টারশিল্ড ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে। অর্থাৎ স্টারশিল্ড ধীরে ধীরে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহাকাশ অবকাঠামো নয়; মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা যোগাযোগব্যবস্থারও অংশ হয়ে উঠছে।

সামরিক উপগ্রহ থেকে ‘ডেটা যুদ্ধ’

ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধজাহাজের যুদ্ধ হবে না, বরং এটি হবে তথ্যেরও যুদ্ধ।

কোথায় শত্রুর সেনা আছে, কোন জাহাজ কোন দিকে যাচ্ছে, কোন বিমান কোথায় উড়ছে, কোন ক্ষেপণাস্ত্র কোথা থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছে, এই তথ্য যত দ্রুত পাওয়া যাবে, সামরিক সিদ্ধান্ত তত দ্রুত নেওয়া যাবে। এ কারণে মহাকাশের উপগ্রহ এখন যুদ্ধক্ষেত্রের চোখ ও কান হয়ে উঠছে।

স্টারশিল্ডের মতো ব্যবস্থা এই চোখ ও কানকে একটি বিশাল নেটওয়ার্কে পরিণত করছে। একদিকে রয়েছে নজরদারি উপগ্রহ। অন্যদিকে রয়েছে সামরিক যোগাযোগের উপগ্রহ। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ড্রোন, যুদ্ধবিমান, রাডার, নৌবাহিনীর প্ল্যাটফর্ম এবং স্থলভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থা। সবশেষে এই তথ্য চলে যাচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে।

অর্থাৎ সেন্সর → তথ্য → বিশ্লেষণ → সিদ্ধান্ত → অস্ত্র—পুরো ব্যবস্থাকে একটি দ্রুতগতির নেটওয়ার্কে পরিণত করাই হচ্ছে লক্ষ্য।

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মহাকাশ প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়

এই পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো চীন ও রাশিয়ার মহাকাশ সক্ষমতার দ্রুত উন্নয়ন। চীন নিজস্ব উপগ্রহ নেটওয়ার্ক, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মহাকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। রাশিয়াও মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি উপগ্রহবিরোধী প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, বড় কয়েকটি উপগ্রহের ওপর নির্ভরশীল পুরোনো ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তার পরিবর্তে দ্রুত উৎক্ষেপণযোগ্য, সংখ্যায় অনেক এবং একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত উপগ্রহ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। সেই জায়গাতেই স্পেসএক্সের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করছে।

স্টারলিংক থেকে স্টারশিল্ড: তারপর কোথায়?

স্টারলিংক শুরু হয়েছিল বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প হিসেবে।

কিন্তু এখন এর প্রযুক্তিগত ভিত্তি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে আরও বড় একটি কাঠামো—

স্টারলিংক → স্টারশিল্ড → সামরিক যোগাযোগ → গোয়েন্দা নজরদারি → লক্ষ্য শনাক্তকরণ → সামরিক সিদ্ধান্ত → যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ।

এখানে স্পেসএক্সের ভূমিকা আর শুধু রকেট উৎক্ষেপণ বা ইন্টারনেট সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে মহাকাশযান তৈরি করছে, রকেট তৈরি করছে, সেগুলো উৎক্ষেপণ করছে, হাজার হাজার উপগ্রহ পরিচালনা করছে, বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করছে এবং সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো সরবরাহ করছে। এটাই বর্তমান মহাকাশ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি।

আসল প্রশ্নটি ইলন মাস্ককে নিয়ে নয়

স্টারশিল্ডের উত্থানকে শুধু ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত ক্ষমতার গল্প হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না।

আসল পরিবর্তনটি হচ্ছে, রাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো এবং বেসরকারি প্রযুক্তি অবকাঠামোর সীমারেখা দ্রুত মুছে যাচ্ছে।

একসময় সামরিক উপগ্রহ তৈরি করত সরকার। এখন সরকার বেসরকারি কোম্পানির তৈরি উপগ্রহ ব্যবহার করছে।

একসময় সামরিক যোগাযোগের জন্য আলাদা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হতো। এখন বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রযুক্তির একই ভিত্তি থেকে দুটি পৃথক নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে।

একসময় মহাকাশে কয়েকটি অত্যন্ত মূল্যবান উপগ্রহ ছিল। এখন শত শত বা হাজার হাজার উপগ্রহ নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল নেটওয়ার্ক।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো ব্যবস্থায় তথ্যের গতি বাড়ছে।

যে পক্ষ দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে, দ্রুত তা বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং দ্রুত অস্ত্রব্যবস্থার কাছে পৌঁছে দিতে পারবে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে তার সুবিধা বাড়বে।

এই বাস্তবতায় স্টারশিল্ড কেবল আরেকটি স্যাটেলাইট প্রকল্প নয়। এটি এমন একটি নতুন সামরিক মহাকাশ অবকাঠামোর অংশ, যেখানে যোগাযোগ, গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ – সবকিছু একই মহাকাশ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

আর সেই কারণেই স্টারলিংক থেকে স্টারশিল্ডে স্পেসএক্সের বিবর্তন শুধু একটি কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের গল্প নয়; এটি আগামী দিনের যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মহাকাশে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলে যাচ্ছে; তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

মুসলিম পোর্ট
লিখেছেনমেহেদী হাসান
মুসলিম পোর্ট • সর্বাগ্রে উম্মাহ