Skip to main content

মুসলিম পোর্ট

গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর: লিবিয়ার লাভ-ক্ষতির সমিকরণ | মুসলিম পোর্ট

গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর: লিবিয়ার লাভ-ক্ষতির সমিকরণ

মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও লিবিয়ার মানুষের কোলাজ ছবি

লিবিয়ার একসময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও বিতর্কিত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। তাঁর ৪২ বছরের শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং রাজনৈতিক বিভক্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে স্থিতিশীলতার পথ খুঁজছে দেশটি। প্রশ্ন উঠছে, গাদ্দাফির পতনের পর গত ১৫ বছরে লিবিয়ায় কী পরিবর্তন এসেছে, আর কোন সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে?

২০১১ সালের ২০ অক্টোবর লিবিয়ার সিরতে শহরে আটক হওয়ার পর নিহত হন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু একজন শাসকেরই অবসান ঘটেনি, উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে ৪২ বছর ধরে চলা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থারও পতন ঘটে।

১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন গাদ্দাফি। এরপর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামোয় দেশ শাসন করেন তিনি। তবে ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। একপর্যায়ে ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের সহায়তায় গাদ্দাফির শাসনের অবসান ঘটে।

তখন লিবিয়ার সামনে নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কেবল একটি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেই শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

মুয়াম্মার গাদ্দাফির প্রতিকৃতি

গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া: বিপ্লব থেকে রাজনৈতিক বিভক্তি

গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপ্লবের সময় গড়ে ওঠা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ধীরে ধীরে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করে। ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে রাজনৈতিক বিরোধ আরও গভীর হলে দেশটি কার্যত পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন বাহিনী রাজধানী ত্রিপোলি দখলের অভিযান শুরু করলে লিবিয়া আবারও বড় ধরনের সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

২০২০ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর বড় ধরনের লড়াই কমে এলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে ত্রিপোলিভিত্তিক জাতীয় ঐক্য সরকার এবং পূর্বাঞ্চলে হাফতার-প্রভাবিত রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো দেশটির ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে।

ফলে একটি অভিন্ন সরকার, কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং ঐক্যবদ্ধ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পথ এখনো বাধাগ্রস্ত।

তেল আছে, কিন্তু সমৃদ্ধি কোথায়?

আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত রয়েছে লিবিয়ায়। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী হয়েও দেশটি এখনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি।

গাদ্দাফির শাসনামলে তেল বিক্রির আয় দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালিত হতো। এসব সেবার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। তবে দেশটির অর্থনীতি তেলনির্ভর হয়ে পড়েছিল। ফলে তেলের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও তার বড় ধরনের প্রভাব পড়ত।

২০১১ সালের পর সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বারবার তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভক্তি এবং তেলসম্পদ থেকে অর্জিত আয় বণ্টন নিয়ে বিরোধ অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করেছে।

এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনসেবায় বিঘ্ন এবং নিরাপত্তাহীনতা এখনো লিবিয়ার মানুষের জন্য বড় সমস্যা।

এখানেই দেশটির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও সেই সম্পদের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম, স্থিতিশীল ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।

গাদ্দাফির উত্তরাধিকার: শক্তিশালী রাষ্ট্র, নাকি ভঙ্গুর ব্যবস্থা?

মুয়াম্মার গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনে লিবিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা মূলত একজন শাসক ও তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তেলের আয় দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি পরিচালিত হলেও রাজনৈতিক বিরোধিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল।

গাদ্দাফির শাসনব্যবস্থা নিয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো, দীর্ঘদিন শক্তিশালী নেতৃত্বের অধীনে দেশ পরিচালিত হলেও স্বাধীন, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার উপযোগী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

২০১১ সালে তাঁর সরকারের পতনের পর যে ক্ষমতাশূন্যতা তৈরি হয়, তাতে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে দেশটি একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

এ কারণে লিবিয়ার বর্তমান সংকটকে শুধু গাদ্দাফি-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে অতীতের শাসনব্যবস্থায় তৈরি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থাৎ গাদ্দাফির উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক কেবল তাঁর শাসনামলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে ঘিরে নয়; তাঁর পতনের পর যে ক্ষমতাশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটিও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লিবিয়ার পতাকা হাতে জনতার সমাবেশ

স্বাধীনতা নাকি নিরাপত্তা—কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

লিবিয়ায় গাদ্দাফির শাসনামল নিয়ে এখনো পরস্পরবিরোধী মূল্যায়ন রয়েছে।

এক পক্ষ সে সময়ের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, জনসেবা এবং তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশের কথা তুলে ধরে। অন্য পক্ষ স্মরণ করিয়ে দেয় রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বিরোধীদের প্রতি কঠোর আচরণ এবং মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধের কথা।

গাদ্দাফির পতন দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান অতীত ও বর্তমানের তুলনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

তবে লিবিয়ার সংকটকে শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না—গাদ্দাফি ভালো শাসক ছিলেন, নাকি স্বৈরশাসক? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর পতনের পর দেশটিতে কেন একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেল না?

১৫ বছর পর আবার আলোচনায় নির্বাচন

দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচন ২০২৬ সালে আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

৩০ আগস্ট দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘৪+৪ কমিটি’ আগামী ২৪ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার প্রতিনিধি পরিষদ কমিটির সম্মতিতে তৈরি নির্বাচনী আইন অনুমোদন করে।

লিবিয়ায় জাতিসংঘ সহায়তা মিশনের সামনে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা

অক্টোবরে প্রতিনিধি পরিষদের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন নিয়েও আলোচনা সামনে আসে।

তবে নির্বাচন ঠিক কোন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনের ফলাফল সব পক্ষ মেনে নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ, শুধু ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ভোটগ্রহণের আয়োজন করলেই লিবিয়ার সংকটের সমাধান হবে না।

স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা, যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আওতায় আনা এবং বিভক্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা।

এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে নির্বাচনও নতুন করে রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

১৫ বছর পরও প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে

গাদ্দাফির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লিবিয়ায় যে নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল, তাতে দেশটির রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এক ব্যক্তির শাসনের অবসান ঘটলেই যে গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় না, লিবিয়ার গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ।

আজও দেশটিকে কয়েকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক বিভক্তির অবসান, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, জনগণের কল্যাণে তেলসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং মানুষের আস্থাভাজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—সবই এখনো অসমাপ্ত কাজ।

গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৫ বছর পরও লিবিয়া অতীতের উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন পথের সন্ধান করছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখন আর শুধু গাদ্দাফিকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো, লিবিয়ার ভবিষ্যৎ কি আবারও কোনো একক নেতা বা ক্ষমতাকেন্দ্রের হাতে নির্ধারিত হবে, নাকি জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সমঝোতা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে দেশটি একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারবে?

লিবিয়ার আগামী দিনের স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার ওপর।

মূলঃ আয়েশা সামিয়া