মুসলিম পোর্ট

আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ফিলিপাইনের বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হতে চলেছে। এই দিনেই অনুষ্ঠিত হবে অঞ্চলটির প্রথম নিয়মিত পার্লামেন্ট নির্বাচন; এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন এক প্রবীণ যোদ্ধা-রাজনীতিবিদ আহোদ ইব্রাহীম, যিনি বিশ্বের কাছে পরিচিত আলহাজ মুরাদ ইব্রাহীম নামে।

একটি সংগ্রামের শিকড়

বাংসামোরো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস মূলত প্রতিরোধ ও অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্প্যানিশ, আমেরিকান ও জাপানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় রক্ষা করে এসেছে এই জনগোষ্ঠী। স্বাধীন ফিলিপাইন রাষ্ট্র গঠনের পরও প্রান্তিকীকরণ, ভূমিহারা হওয়া এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হতে থাকে তারা, যা পরবর্তীতে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্ম দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭০-এর দশকে মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (MNLF) এবং পরবর্তীতে মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।

১৯৭০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (MNLF)

হাজী মুরাদ ইব্রাহীম ছিলেন সেই প্রজন্মের একজন, যিনি তরুণ বয়সেই এই সংগ্রামে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে MILF-এর নেতৃত্বে উঠে আসেন। প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদ হাশিম সালামাতের মৃত্যুর পর তিনি সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শান্তি আলোচনার এক দীর্ঘ, কঠিন পথে সংগঠনকে নেতৃত্ব দেন।

MILF- এর প্রতিষ্ঠাতা উস্তাদ হাশিম সালামাতের সাথে তরুন যোদ্ধা হাজী মুরাদ ইব্রাহীম

অস্ত্র থেকে আলোচনার টেবিলে

মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF)-এর দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান হিসেবে হাজী মুরাদ দশকের পর দশক ধরে বাংসামোরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ভূমি এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের জন্য লড়াই করে এসেছেন। অস্ত্রের পথ থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের বাংসামোরো কাম্প্রিহেনসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট (CAB)-এর মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে পৌঁছানো পর্যন্ত, তার নেতৃত্বই মূলত সেই রূপান্তরের ভিত্তি রচনা করেছে যা আজকের বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (BARMM)-কে বাস্তবে পরিণত করেছে।

ফিলিপাইন সরকারের সাথে বছরের পর বছর ধরে চলা কঠিন, ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া আলোচনার মধ্য দিয়ে তিনি এমন একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন, যা কেবল অস্ত্রবিরতিই নয়, বরং প্রকৃত রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের পথ প্রশস্ত করে। ২০১৯ সালে গণভোটের মাধ্যমে বাংসামোরো অর্গানিক ল অনুমোদিত হওয়ার পর BARMM প্রতিষ্ঠা তারই এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার এক ঐতিহাসিক পরিণতি।

২০১৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তিনি অঞ্চলটির প্রথম অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক এমন সময়ে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূমিকে শাসনব্যবস্থার একটি কার্যকরী কাঠামোয় রূপান্তর করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সময়পর্বে তাকে একদিকে যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্বাসন, অন্যদিকে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার দ্বৈত দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে । এমন এক কাজ, যার জন্য প্রয়োজন ছিল যোদ্ধার দৃঢ়তা এবং রাষ্ট্রনায়কের ধৈর্য উভয়েরই।

এক কঠিন অধ্যায়, এক নতুন প্রতিজ্ঞা

২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে অপসারিত হওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের একটি কঠিন ও বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি নিজে বারবার স্পষ্ট করেছেন যে এটি তার স্বেচ্ছা পদত্যাগ ছিল না, বরং তাকে সরানো হয়েছিল । এবং এই সিদ্ধান্ত MILF কেন্দ্রীয় কমিটির আনুষ্ঠানিক পরামর্শ ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। এই আকস্মিক পরিবর্তন MILF-এর অভ্যন্তরে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, এবং অনেকের কাছেই তা মনে হয়েছিল বাংসামোরোর দীর্ঘদিনের ঐক্য ও পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

তবে এই ধাক্কার মুখেও হাজী মুরাদ পিছু হটেননি। বরং তিনি সেই একই নীতিতে অবিচল থেকেছেন, যা তাকে দশকের পর দশক ধরে বাংসামোরো সংগ্রামের অগ্রভাগে রেখেছিল। তা হলো- সংঘাত নয়, সংলাপ; একতরফা সিদ্ধান্ত নয়, জনগণের রায়। ইউনাইটেড বাংসামোরো জাস্টিস পার্টি (UBJP)-এর সভাপতি হিসেবে তিনি এখন আসন্ন সেপ্টেম্বর নির্বাচনে দলের শীর্ষ প্রার্থী, যেখানে তার সাবেক সহযোদ্ধা আবদুলরাউফ মাকাকুয়ার বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশিত। এপ্রিলে UBJP কমিশন অন ইলেকশনস-এ ৪০ জন প্রার্থীর যে তালিকা জমা দেয়, তাতে মুরাদ নিজে শীর্ষে, তার সাথে রয়েছেন মোহাগের ইকবাল ও আলী সোলাইমানের মতো পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম।

বুলেট থেকে ব্যালট

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক অর্থে বাংসামোরো সংগ্রামেরই এক নতুন অধ্যায় । যেখানে অস্ত্রের বদলে ব্যালট, আর সংঘাতের বদলে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাই এখন প্রধান মাধ্যম। মুরাদ নিজেই বহুবার বলেছেন, প্রার্থিতা তালিকায় নাম লেখানো কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং তা “বুলেট থেকে ব্যালটে, সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে নির্বাচনী সংগ্রামে” রূপান্তরের প্রতীক। যে মানুষটি একদিন বন্দুক হাতে নিজের জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করেছেন, আজ তিনিই সেই একই জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়িয়েছেন। এই রূপান্তরই বাংসামোরো শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অনিশ্চয়তার ছায়া, তবু অবিচল অগ্রযাত্রা

UBJP-এর নিবন্ধন নিয়ে দায়ের হওয়া একটি অযোগ্যতার আবেদন এখনও নির্বাচন কমিশনের বিবেচনাধীন। যেখানে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ এবং বিদেশি তহবিল প্রাপ্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আইনি অনিশ্চয়তা এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এক ধরনের উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে, যা মুরাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি সমগ্র অঞ্চলের গণতান্ত্রিক উত্তরণের গতিপথকেও প্রভাবিত করতে পারে।

তা সত্ত্বেও প্রস্তুতি থেমে নেই। জাতীয় সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে এই নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। এই প্রস্তুতি নিজেই এক ধরনের স্বীকৃতি । বাংসামোরো জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আজ আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা।

চার শতাব্দীর প্রতিরোধ, তিন দশকের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং আরও এক দশকের ধৈর্যশীল শান্তি আলোচনার উত্তরাধিকার বহন করে চলা হাজী মুরাদ ইব্রাহীম; এই নেতা যেভাবে অস্ত্র ত্যাগ করে ব্যালটের রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন, তা বাংসামোরো জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ যাত্রার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলোচনার টেবিল, আর আলোচনার টেবিল থেকে অবশেষে ব্যালট বাক্স পর্যন্ত এই যাত্রা কেবল একজন নেতার ব্যক্তিগত অভিযাত্রাই নয়, তা একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর মর্যাদা, ন্যায় ও স্বশাসনের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রতিচ্ছবি। এই দীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ ; জনগণের ভোটের মাধ্যমেই।