মুসলিম পোর্ট

দখলদার ইসরায়েল সরকার জেনারেল রোমান গফম্যান-কে নতুন মোসাদ প্রধান হিসেবে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে; যা দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এই নিয়োগকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সন্ত্রাসী দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর অনুমোদনে এই নিয়োগ কার্যকর হয় এবং জ্যেষ্ঠ নিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটিও তা সমর্থন করে। গফম্যান ২ জুন ২০২৬ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। বর্তমান মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নি তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে পদত্যাগ করবে।

এই পরিবর্তনকে শুধু নেতৃত্ব বদল হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি এমন একটি ইঙ্গিত বহন করে যে, ইসরায়েল তার গোয়েন্দা কাঠামোকে আরও বেশি সামরিক-সমন্বিত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তুলতে চায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তপারের গোপন অভিযান, সাইবার অপারেশন এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃদ্ধির কারণে গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্বে সামরিক অভিজ্ঞতা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অভিবাসী পটভূমি থেকে উত্থান

রোমান গফম্যান ১৯৭৬ সালে বেলারুশের Mozir শহরে জন্মগ্রহণ করে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সে পরিবারসহ ইসরায়েলে পাড়ি জমায়। সেই সময়কার বৃহৎ অভিবাসন ঢেউ ইসরায়েলের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলে, এবং গফম্যান সেই প্রজন্মেরই একজন প্রতিনিধি, যারা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়।

ইসরায়েলে এসে পরে সে দ্রুত নিজেকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় এবং ১৯৯৫ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তার ক্যারিয়ার শুরু হয় একেবারে নিচের স্তর থেকে—একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির সেনাবাহিনীতে তার দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তাকে দ্রুত উচ্চপদে নিয়ে যায়।

সামরিক ক্যারিয়ার: মাঠ থেকেই নেতৃত্ব

গফম্যানের সামরিক জীবন মূলত আর্মর্ড (সাঁজোয়া) ইউনিটকেন্দ্রিক। সে ৭ম আর্মর্ড ব্রিগেডে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, যা ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইউনিট। এরপর গফম্যান ৩৬তম ডিভিশনের অপারেশন অফিসার হিসেবে কাজ করে, যেখানে কৌশলগত পরিকল্পনা ও যুদ্ধ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল তার ওপর।

পরবর্তীতে এটজিয়ন ব্রিগেড এবং গোলান হাইটস অঞ্চলের উত্তর ফ্রন্টে দায়িত্বপ্রাপ্ত ২১০তম ডিভিশনের কমান্ডার হন। এই দায়িত্বগুলো তাকে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা দেয়—দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত থেকে শুরু করে গাজা ও পশ্চিম তীর পর্যন্ত।

বিশেষ করে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চলাকালে তার ভূমিকা তাকে একজন অভিজ্ঞ ও বাস্তবমুখী কমান্ডার হিসেবে পরিচিতি দেয়। ফলে তিনি প্রচলিত গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতো বিশ্লেষণধর্মী না হয়ে বরং মাঠ-নির্ভর ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।

৭ অক্টোবরের পর নতুন অধ্যায়

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে, এবং এই ঘটনার পরই গফম্যান জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। গাজা সংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে অংশগ্রহণের সময় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন—হাঁটুতে আঘাত পেয়ে তিনি উচ্চপদস্থ আহত কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন।

এই ঘটনার পর চিকিৎসা শেষে তিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে এসে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত হন। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়—একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রতিদিনের নিরাপত্তা বৈঠকে অংশ নিয়ে ইসরায়েলের সবচেয়ে গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। তিনি মোসাদ এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করেন, যা তাকে গোয়েন্দা কাঠামোর ভেতরের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয়।

মোসাদের সামনে নতুন বাস্তবতা

গফম্যান এমন এক সময়ে মোসাদের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোসাদ বিভিন্ন গোপন অভিযান, টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড এবং কৌশলগত গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে।

ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী, লেবানন থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে সংস্থাটির সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গফম্যানের নেতৃত্ব একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—তিনি কি তার মাঠ পর্যায়ের সামরিক অভিজ্ঞতাকে একটি জটিল, বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্বে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন?

রোমান গফম্যানের নিয়োগ আসলে দখলদার ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির পদোন্নতি নয়, বরং একটি বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন—যেখানে সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো ক্রমশ একীভূত হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র আর গোয়েন্দা অপারেশনের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেখানে গফম্যানের নেতৃত্ব মোসাদের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।