Skip to main content

মুসলিম পোর্ট

একটি ক্ষেপণাস্ত্র হঠাৎ করে ভারত মহাসাগরের প্রত্যন্ত একটি ব্রিটিশ ঘাঁটিতে আঘাত হানল। আরেকটি ড্রোন সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় এমনভাবে আঘাত করল, যা সামান্য ভিন্নভাবে ঘটলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের তীর গেল ইরানের দিকে।

কিন্তু সরকারি শিরোনামের আড়ালে তাকালে প্রশ্ন ওঠে এসব হামলার পেছনে আসলেই কি ইরান, নাকি অন্য কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের ওপর দোষ চাপিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ভয় ও উদ্বেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে?

আমরা আজ নজর দিব ইসরায়েলের এই ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ছদ্মবেশী অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে। কেননা গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল এমন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগের মুখে পড়েছে, যেখানে কোনো হামলার দায় অন্য পক্ষের ওপর চাপিয়ে বহুবার রাজনৈতিক বা সামরিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।

ল্যাভন অ্যাফেয়ার: পুরোনো কৌশলের প্রথম বড় নজির

১৯৫৪ সালের গ্রীষ্মে মিশরে একটি গোপন অভিযান চালায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান (AMAN)। ‘অপারেশন সুসান্না’ নামে পরিচিত এই অভিযানে মিশরের ইহুদি নাগরিকদের নিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলার পরিকল্পনা করা হয়।

অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মিশরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এবং হামলার দায় মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো স্থানীয় সংগঠনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে ব্রিটেনকে মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করা এবং সুয়েজ খাল এলাকা থেকে ব্রিটিশ সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঠেকানোই ছিল মূল লক্ষ্য বলে অভিযোগ ওঠে।

সে সময় সুয়েজ খাল ছিল ব্রিটিশ স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যকার কৌশলগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। কিন্তু পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি।

১৯৫৪ সালের ২৩ জুলাই আলেকজান্দ্রিয়ার একটি সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণের চেষ্টা চালানোর সময় এক এজেন্টের পকেটেই বিস্ফোরক আগেভাগে বিস্ফোরিত হয়। ওই এজেন্ট গ্রেপ্তার হওয়ার পর গোটা গোপন নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। এরপর শুরু হয় গ্রেপ্তার ও বিচার।

অভিযানে জড়িত দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আরও দুজন কারাগারে আত্মহত্যা করেন এবং অন্যদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিনহাস ল্যাভনকে পদত্যাগ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাই ‘ল্যাভন অ্যাফেয়ার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দেয়।

পুরোনো কৌশল, নতুন লক্ষ্য

কয়েক দশক পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলেও ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযানের অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে।

২০২৬ সালের মার্চে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ব্রিটিশ-মার্কিন ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবর প্রকাশিত হয়। হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হলেও তেহরান সরাসরি তা অস্বীকার করে।

ইরানের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রয়োজনীয় পাল্লা দেশটির ঘোষিত সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরের ওই ঘাঁটিতে আঘাত হানতে যে পাল্লা দরকার, তা ইরানের প্রকাশ্যভাবে স্বীকৃত সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।

এমনকি ন্যাটোর শীর্ষ নেতৃত্বও ইরানকে দায়ী করার দাবির সরাসরি সমর্থন করেনি বলে ইরানি পক্ষ দাবি করে।

তেহরানের বক্তব্য ছিল আরও গুরুতর— ইসরায়েলই নাকি হামলাটি সাজিয়েছে, যাতে ইরানকে একটি বৃহৎ হুমকি হিসেবে তুলে ধরা যায় এবং যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধের মধ্যে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলা যায়।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রমাণ এখনো প্রশ্নের বিষয়।

তুরস্কের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র

একই সময়ে, ২০২৬ সালের মার্চে তুরস্কের আকাশসীমায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দেওয়ার খবরও ইরানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

তেহরান আবারও অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ অভিযান’ বলে আখ্যা দেয়।

ভিয়েনায় ইরানি দূতাবাসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, এর উদ্দেশ্য ছিল তুরস্ক ও ইরানের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করা এবং ওই অঞ্চলে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের জন্য একটি নতুন অজুহাত তৈরি করা।

ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই উসকানির নেপথ্যে ছিল ইসরায়েল। অর্থাৎ, অভিযোগের কাঠামোটি আগের মতোই—একটি হামলা, একটি নির্দিষ্ট পক্ষের ওপর দোষারোপ এবং এরপর সেই দোষারোপকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সামরিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপের পরিবেশ তৈরি।

রাস তানুরা: আরব বিশ্বকে ইরানের বিরুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ

২০২৬ সালের মার্চে সৌদি আরবের রাস তানুরা এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনাও একই ধরনের অভিযোগের জন্ম দেয়। ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামলাটি ইসরায়েলই চালিয়েছিল এবং পরে এর দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। তেহরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি হামলার কারণে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।

একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করা হয়। অর্থাৎ, হামলাটি যদি সত্যিই ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ হয়ে থাকে, তাহলে এর লক্ষ্য কেবল একটি স্থাপনা ধ্বংস করা নয়; বরং গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তন করাও হতে পারে।

বারাকাহ পারমাণবিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা

২০২৬ সালের ১৭ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বহিরাগত জেনারেটরে ড্রোন আঘাত হানে।

ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে কারণ ড্রোনটি যদি স্থাপনাটির মূল পারমাণবিক অবকাঠামোতে আঘাত করতে পারত, তাহলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বড় ধরনের তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হতে পারত। সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করে, ড্রোনটি ইরাক থেকে এসেছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—ইরাক থেকে উড্ডয়ন করে সৌদি আরবের ওপর দিয়ে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একটি ড্রোন কীভাবে কোনো রাডার শনাক্তকরণ ছাড়াই বারাকাহ পর্যন্ত পৌঁছাল? তাদের দাবি, এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বিষয়টি সন্দেহজনক এবং সমুদ্রভিত্তিক কোনো উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ড্রোনটি পাঠানো হয়ে থাকলে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখানেও একই অভিযোগ সামনে আসে—হামলার প্রকৃত উৎস আড়াল করে ইরানের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে।

ফলস ফ্ল্যাগের মূল কৌশল

‘False flag’ বলতে সাধারণভাবে এমন একটি গোপন অভিযানকে বোঝায়, যেখানে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠন নিজে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেও তার দায় অন্য কোনো পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেয়।

এর উদ্দেশ্য হতে পারে—

  • কোনো প্রতিপক্ষকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা;
  • সামরিক অভিযানের জন্য জনসমর্থন তৈরি করা;
  • তৃতীয় কোনো দেশকে সংঘাতে টেনে আনা;
  • মিত্রদের আরও সক্রিয় করা;
  • অথবা কোনো নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপের রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করা।

ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ১৯৫৪ সালের ল্যাভন অ্যাফেয়ার ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ একটি ঘটনা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হামলা ও নাশকতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।

তবে ২০২৬ সালের দিয়েগো গার্সিয়া, তুরস্ক, রাস তানুরা কিংবা বারাকাহ-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: এগুলোর সবকটিকে ইসরায়েলের ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযান হিসেবে প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা বলা যায় না। এগুলোর কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগের ভিত্তি মূলত ইরানি বক্তব্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি।

তবু অভিযোগগুলোর মধ্যে যে রাজনৈতিক প্যাটার্নটি দেখা যাচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—

কোনো হামলার পরপরই যে পক্ষকে দায়ী করা হচ্ছে, সেটিই কি সত্যিই হামলার নেপথ্যে ছিল? নাকি হামলাটিই ছিল বৃহত্তর কোনো কৌশলের অংশ?

১৯৫৪ সালের কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়ার গোপন অভিযান থেকে ২০২৬ সালের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা—এই প্রশ্নটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আজও প্রাসঙ্গিক।

লিখেছেনঃ মেহেদী হাসান