মুসলিম পোর্ট

বায়াং যুদ্ধ ও পাদাং কারবালা | মুসলিম পোর্ট
বিশেষ প্রতিবেদন · মে ২০২৬ · ইতিহাস ও রাজনীতি
ঐতিহাসিক প্রতিবেদন · মোরো মুসলিম সংগ্রাম

বায়াং যুদ্ধ ও পাদাং কারবালা

উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের ময়দান থেকে বাংসামোরোর বর্তমান বাস্তবতা — এক শতকেরও বেশি সময় ধরে চলা মোরো মুসলিম জাতির অসম লড়াইয়ের পূর্ণাঙ্গ আখ্যান

১৯০২যুদ্ধের বছর
২–৩ মেযুদ্ধের তারিখ
১৯০২–১৯১৫মোরো-আমেরিকান যুদ্ধ
BARMMবর্তমান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল

ভূমিকা: একটি মুসলিম জাতির অস্তিত্বের লড়াই

ফিলিপাইনের দক্ষিণ দ্বীপ মিন্দানাওয়ের লানাও দেল সুর প্রদেশের ছোট শহর বায়াং। প্রতি বছর মে মাস এলে এই শহরে এক গভীর বেদনার স্মৃতি জেগে ওঠে। এই দুঃসহ স্মৃতিকে আসলে কোনো সাধারণ যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে গণ্য করলে ঠিক হবে না; বরং মোরো মুসলিম জনগণের অস্তিত্বের লড়াই, সম্মানের লড়াই এবং নিজ ভূমি রক্ষার লড়াই হিসেবেই একে বিবেচনা করতে হবে।

১৯০২ সালের ২ ও ৩ মে সংঘটিত বায়াং যুদ্ধ, যা স্থানীয়ভাবে “পাদাং কারবালা” নামে পরিচিত, মোরো মুসলিম জনগণের কাছে কেবল একটি পুরনো যুদ্ধের স্মৃতি নয়—এটি তাদের ইসলামি পরিচয়, আত্মসম্মান এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়।

এই প্রতিবেদনে সেই যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে, যুদ্ধের মাঠের বাস্তবতা, মুসলিম জাতিসত্তা ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব, “পাদাং কারবালা” নামকরণের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং আজকের বাংসামোরো রাজনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছু বিশদভাবে তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

“যে জাতি তার ইতিহাস মনে রাখে না, সে জাতি আবার সেই একই ভুলের শিকার হয়। মোরো মুসলিম জনগণ তাদের পাদাং কারবালা মনে রাখে—এটাই তাদের শক্তি।”

— মারানাও প্রবীণ নেতার উক্তি

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মিন্দানাও থেকে মার্কিন শাসন

বায়াং যুদ্ধকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে আরও পেছনে যেতে হবে। লুজোন ও ভিসায়াসের অধিকাংশ অঞ্চলে স্পেন তুলনামূলক সহজেই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও মিন্দানাও ও সুলু দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম জনগণ সেই আধিপত্য কখনো মেনে নেয়নি। মারানাও, তাউসুগ, মাগুইন্দানাও সহ বিভিন্ন মোরো মুসলিম গোষ্ঠীর সুলতানরা শতাব্দীর পর শতাব্দর ধরে স্পেনীয় বাহিনীকে প্রতিহত করে এসেছেন। তাই স্পেন কখনো মিন্দানাও পুরোপুরি দখল করতে পারেনি।

১৮৯৮ সালে স্পেন-আমেরিকান যুদ্ধ এবং পরবর্তী প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ফিলিপাইনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ—মিন্দানাও সহ—যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মোরো মুসলিম জনগণের মতামত বা সম্মতির কোনো প্রশ্নই উঠল না। তারা মাত্র ২ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিময়ে এক সাম্রাজ্যিক শক্তির কাছ থেকে আরেক সাম্রাজ্যিক শক্তির হাতে “হস্তান্তরিত” হয়ে গেল।

১৫৬৫–১৮৯৮

স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসনের যুগ। মোরো মুসলিম সুলতানরা বারবার স্পেনীয় বাহিনীকে প্রতিহত করেন। মিন্দানাও কখনো পুরোপুরি স্পেনের অধীনে আসেনি।

১৮৯৮

স্পেন-আমেরিকান যুদ্ধ ও প্যারিস চুক্তি। ফিলিপাইনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যায়। মোরো মুসলিম জনগণের কোনো সম্মতি নেওয়া হয়নি।

১৯০১

“মোরো প্রদেশ” গঠন করা হয়। সামরিক গভর্নরের অধীনে মিন্দানাওকে প্রত্যক্ষ মার্কিন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। মোরো মুসলিম সুলতানদের ক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করে।

১৯০২

বায়াং যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মোরো-আমেরিকান যুদ্ধের সূচনা হয়, যা ১৯১৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

১৯০৩–১৯১৩

বাদ বাতো, বুড দাজো ও বুড বাগসাকে আরও ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। হাজার হাজার মোরো মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হন।

মার্কিন প্রশাসন “সভ্যতার মিশন” এবং “শান্তিপূর্ণ শাসন” প্রতিষ্ঠার অজুহাতে আসলে একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আনার চেষ্টা করছিল। সুলতানদের ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতা সংকুচিত করা হলো, নতুন করের বোঝা চাপানো হলো এবং ইসলামি আইনের পরিবর্তে আমেরিকান আইন চালু করার প্রয়াস শুরু হলো। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় মারানাও মুসলিম সুলতান ও নেতারা প্রতিরোধ সংগঠিত করলেন।

যুদ্ধের বিবরণ: অসম শক্তির মুখোমুখি মোরো মুসলিম যোদ্ধারা

১৯০২ সালের ২ মে ভোরের আলো ফোটার আগেই মার্কিন ২৭তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সৈনিকরা বায়াং এলাকায় অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কমান্ডে ছিলেন কর্নেল ফ্র্যাঙ্ক বাল্ডউইন। তাঁর লক্ষ্য ছিল লানাও হ্রদের তীরে অবস্থিত মোরো মুসলিম কটা বা দুর্গগুলো দখল করে এই অঞ্চলে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

বিপরীত দিকে ছিলেন মারানাও মোরো মুসলিম যোদ্ধারা। তাঁদের হাতে ছিল কেবল ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র—কাম্পিলান তরবারি, বর্শা, ঢাল এবং কিছু পুরনো মাস্কেট বন্দুক। বিপরীতে মার্কিন বাহিনী ছিল আধুনিক স্প্রিংফিল্ড রাইফেল ও হাউইটজার কামান সজ্জিত।

⚔ দুই পক্ষের তুলনামূলক চিত্র

মার্কিন বাহিনী

  • ২৭তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, সুশিক্ষিত পেশাদার সেনা
  • আধুনিক স্প্রিংফিল্ড রাইফেল ও হাউইটজার কামান
  • উন্নত যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা
  • মার্কিন সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ সামরিক সহায়তা

মোরো মুসলিম যোদ্ধারা

  • কয়েকশো মারানাও মুসলিম স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা
  • কাম্পিলান তরবারি, বর্শা, ঢাল ও পুরনো মাস্কেট
  • ঐতিহ্যবাহী কটা দুর্গের মধ্যে প্রতিরক্ষা অবস্থান
  • আত্মার জোর ও মাতৃভূমি রক্ষার দৃঢ় ঈমানি সংকল্প

দুই দিনব্যাপী এই যুদ্ধে মোরো মুসলিম যোদ্ধারা অসীম সাহস ও বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। অনেকে জানতেন যে আধুনিক কামানের বিরুদ্ধে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে জেতার সম্ভাবনা নেই। তবুও তারা পিছু হটেননি, কারণ সত্যের জন্য শহীদ হওয়াকে তারা পরাজয়ের চেয়ে অনেক মহৎ মনে করেছেন।

বায়াং যুদ্ধ ছিল দীর্ঘস্থায়ী মোরো-আমেরিকান যুদ্ধের (১৯০২–১৯১৫) সূচনা। পরবর্তী বছরগুলোতে বাদ বাতো (১৯০৩), বুড দাজো (১৯০৬) এবং বুড বাগসাক (১৯১৩) যুদ্ধে আরও ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। বুড দাজোতে একটি মাত্র দিনে প্রায় ৯০০ থেকে ১,০০০ মোরো মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হন—যা মার্কিন সামরিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়।

মুসলিম জাতিসত্তা ও সাম্রাজ্যবাদী লড়াই

বায়াং যুদ্ধকে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত হিসেবে বিশ্লেষণ করলে এর প্রকৃত গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মারানাও মোরো মুসলিমদের কাছে এই লড়াই ছিল একই সঙ্গে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং জাতিগত অস্তিত্বের সংগ্রাম।

ইসলাম মিন্দানাওয়ে এসেছিল চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে—স্পেনীয়রা ফিলিপাইনে আসারও আগে। শতাব্দীর পর শতাব্দর ধরে ইসলাম মোরো মুসলিম জনগণের জীবন, সংস্কৃতি, আইন ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে ছিল। সুলতানি শাসন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক নয়—এটি ইসলামি নেতৃত্বের স্থানীয় রূপ। দাতু নেতারা কেবল গোষ্ঠীপ্রধান নন—তারা ইসলামি মূল্যবোধ ও শরিয়ার রক্ষক।

মার্কিন ঔপনিবেশিক নীতির প্রকৃত রূপ

ভূমি নীতি: মোরো মুসলিমদের জমিগুলো “পাবলিক ল্যান্ড” হিসেবে ঘোষণা করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সেগুলো খ্রিস্টান ফিলিপিনো ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে শুরু করে।

শিক্ষা নীতি: ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার প্রবর্তন এবং ইসলামি শিক্ষার সংকোচন করা হয়। মোরো মুসলিম শিশুদের তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস চলে।

শাসন নীতি: সুলতানদের কর আদায়ের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। শরিয়া আদালতের পরিবর্তে মার্কিন আইনি ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করা হয়।

অস্ত্র নীতি: মোরো মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র বহনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা তাদের কাছে মুসলিম পুরুষত্ব ও সম্মানের প্রতীক।

তাই বায়াং যুদ্ধ মোরো মুসলিমদের কাছে ছিল একটি সভ্যতার লড়াই—মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের “অগ্রগতি ও সভ্যতা”র বিরুদ্ধে মোরো মুসলিম জনগণের ইসলামি জীবনধারা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম। অস্ত্র তুলে নেওয়া তাদের কাছে শুধু রাজনৈতিক প্রতিরোধ নয়—এটি ছিল তাদের ঈমান ও সংস্কৃতি রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালন।

কেন “পাদাং কারবালা”? নামের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

এই যুদ্ধক্ষেত্রটি কেন “পাদাং কারবালা” বা “কারবালার ময়দান” নামে পরিচিত হলো, তা বুঝতে হলে ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়টির দিকে ফিরে তাকাতে হবে।

৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মুহররম। ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মাঠে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় নাতি হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর পরিবার ও সত্তরেরও কম সঙ্গী নিয়ে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হন। তাঁরা জানতেন এই লড়াইয়ে বাঁচার সম্ভাবনা নেই। তবুও অন্যায় ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি।

কারবালা (৬৮০ খ্রি.)

  • সংখ্যায় কম, অস্ত্রে দুর্বল হুসাইন (রা.) ও সঙ্গীরা
  • ইয়াজিদের বিশাল অন্যায় বাহিনীর মুখোমুখি
  • আত্মসমর্পণ না করে শাহাদাত বরণ
  • চিরকালের জন্য ন্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠা

বায়াং (১৯০২ খ্রি.)

  • সংখ্যায় কম, অস্ত্রে দুর্বল মোরো মুসলিম যোদ্ধারা
  • মার্কিন সাম্রাজ্যিক বাহিনীর মুখোমুখি
  • আত্মসমর্পণ না করে লড়াই করে শহীদ হওয়া
  • মোরো মুসলিম প্রতিরোধের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠা

মারানাও মোরো মুসলিমরা এই গভীর মিলটি অনুভব করেছিলেন। তাঁদের যোদ্ধারাও ছিলেন সংখ্যায় কম, অস্ত্রে দুর্বল। তারাও জানতেন পরিণতি কী হবে। তবুও তারা পিছু হটেননি। কারণ তারা যে সত্যের জন্য লড়ছিলেন—নিজেদের ভূমি, ইসলাম ও সম্মান রক্ষার জন্য—সেই সত্য পরাজয়ের চেয়ে বড়।

“কারবালায় হুসাইন (রা.) শহীদ হয়েছিলেন কিন্তু ইসলামকে বাঁচিয়ে গেছেন। বায়াংয়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা শহীদ হয়েছিলেন কিন্তু মোরো মুসলিম জাতির আত্মাকে বাঁচিয়ে গেছেন।”

— মারানাও মুসলিম যুবনেতা আবদুল আসমানা উমপাত

এই নামকরণ মোরো মুসলিম জনগণের ইসলামি পরিচয়ের গভীরতা প্রকাশ করে। তারা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে ইসলামি ইতিহাসের মহাকাব্যিক আখ্যানের সাথে একসূত্রে গেঁথে দেখেন। বায়াং যুদ্ধ তাদের কাছে কেবল একটি স্থানীয় সংঘর্ষ নয়—এটি সেই বৈশ্বিক সংগ্রামের অংশ যেখানে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, স্বাধীনতা ও দাসত্ব মুখোমুখি হয়।

স্মৃতি যেভাবে বেঁচে থাকে: মুসলিম জাতির প্রতিবছরের স্মরণ

এক শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বায়াং যুদ্ধের স্মৃতি মোরো মুসলিম জনগণের মধ্যে একটুও ম্লান হয়নি—বরং প্রতি বছর তা নতুন করে জেগে ওঠে। প্রতি মে মাসে বায়াং শহরে বিশেষ স্মরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠান কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়—এটি বর্তমানের জন্য একটি ইসলামি ও রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।

অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকে যুদ্ধের পুনরাভিনয়, শহীদদের স্মরণে কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-মাহফিল, ইতিহাসবিদ ও সাংস্কৃতিক নেতাদের বক্তব্য এবং স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ।

মারানাও মুসলিম যুবনেতা আবদুল আসমানা উমপাত বলেন: “পাদাং কারবালার শিক্ষা শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়, এটি বাস্তবে ধারণ করার বিষয়। আমাদের পূর্বপুরুষরা মাথা নত করেননি—আমাদেরও করা উচিত নয়। তবে আমাদের লড়াই এখন বন্দুকে নয়, ভোটে, শিক্ষায় ও ইসলামি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে।”

বর্তমান বাংসামোরো: মুসলিম জাতির রূপান্তরের মাঝে অসমাপ্ত প্রশ্ন

আজকের মিন্দানাও ১৯০২ সালের মিন্দানাওয়ের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। দশকের পর দশক রক্তক্ষয়ী সংঘাত, শান্তি আলোচনা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর ২০১৯ সালে বাংসামোরো অর্গানিক ল (BOL) পাস হয় এবং বাংসামোরো অটোনোমাস রিজিয়ন ইন মুসলিম মিন্দানাও (BARMM) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নিঃসন্দেহে মোরো মুসলিম জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক ফসল।

কিন্তু এই অর্জন কতটা সম্পূর্ণ? কতটুকু বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে মোরো মুসলিম জনগণের সেই স্বপ্ন—প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং ইসলামি সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির স্বপ্ন?

BARMM: অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক অর্জন: ২০১৯ সালে BARMM প্রতিষ্ঠা। মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (MILF)-এর সাথে ব্যাপক শান্তি চুক্তি। আসন্ন সেপ্টেম্বরে প্রথম পার্লামেন্টারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা: BARMM এখনও ফিলিপাইনের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি। ঔপনিবেশিক যুগের ভূমি সংকট পুরোপুরি সমাধান হয়নি। মোরো মুসলিম জনগণ উন্নয়নের সুযোগ থেকে এখনো বঞ্চিত।

সামাজিক চ্যালেঞ্জ: ইসলামি শিক্ষা, মাদ্রাসা ব্যবস্থা ও শরিয়া আদালতের পূর্ণ স্বীকৃতি এখনো অসম্পূর্ণ। ক্ষুদ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয়।

“শান্তি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে কোনো পূর্ণাঙ্গ আরোগ্য হয়নি। যে ক্ষত ১৯০২ সালে তৈরি হয়েছিল, সেই ক্ষত সারাতে হলে শুধু রাজনৈতিক কাঠামো নয়, সত্য অনুসন্ধান, ক্ষতিপূরণ এবং কার্যকর সংস্কার দরকার।”

— অধ্যাপক তিরমিজি আবদুল্লাহ, মিন্দানাওয়ের ইতিহাসবিদ

আগামী সেপ্টেম্বরে BARMM-এর প্রথম পার্লামেন্টারি নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা—এই নির্বাচনী ব্যবস্থা কি মোরো মুসলিম জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে পারবে? নাকি প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের দাবিকে আবারও পিছনে ঠেলে দেবে? তরুণ প্রজন্মের মোরো মুসলিম নেতারা ক্রমেই রাজনীতি, শিক্ষা ও সুশীল সমাজে সক্রিয় হচ্ছেন—পাদাং কারবালার চেতনা বুকে ধারণ করে, তবে নতুন পথে।

উপসংহার: একটি চলমান মুসলিম সংগ্রামের আখ্যান

বায়াং যুদ্ধ তাই কেবল ১৯০২ সালের একটি সামরিক সংঘর্ষের নাম নয়। এটি একটি চিরন্তন প্রশ্নের মূর্তিমান প্রতীক—একটি মুসলিম জাতি কতটা অবিচার সহ্য করতে পারে, এবং তার পরও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে কিনা।

“পাদাং কারবালা” নামটি সেই চেতনার সংকেত বহন করে যেখানে পরাজয়ও হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস। কারবালায় হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত যেমন ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়ের আলোকবর্তিকা, তেমনি বায়াংয়ের মোরো মুসলিম যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ মোরো মুসলিম জাতিসত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে আছে।

এক শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে মোরো মুসলিম জনগণের লড়াই থামেনি—কেবল রূপ বদলেছে। রণাঙ্গন এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সংসদে, আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং প্রতিটি মোরো মুসলিম মানুষের বুকের ভেতরে। পাদাং কারবালা স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলামি আদর্শ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য অধিকারের সংগ্রাম তখনই শেষ হয়, যখন তা সত্যিকার অর্থে অর্জিত হয়। সেই দিন এখনো আসেনি। তাই সংগ্রামও চলছে।

মোরো মুসলিম ইতিহাস বায়াং যুদ্ধ পাদাং কারবালা মিন্দানাও BARMM ইসলামি সংগ্রাম
মুসলিম পোর্ট · মে ২০২৬