ভূমিকা: একটি ভোটের মূল্য কতটুকু?
ইসলাম উদ্দিন, বয়স পঞ্চান্ন বছর। আসামের হাইলাকান্দি জেলার কাটিগড়া বিধানসভা কেন্দ্রের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। প্রতিটি নির্বাচনের মৌসুমে তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের নির্বাচনের আগে তাঁর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন তাঁর ভোটের কি আর কোনো অর্থ আছে?

২০২৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন আসামের সংসদীয় ও বিধানসভা আসনগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়ার পর কাটিগড়া আসনের ভোটের গণিত আমূল বদলে গেছে। এই আসনে আগে হিন্দু ও মুসলিম ভোটার প্রায় সমান সমান ছিলেন। প্রতিবেশী আসন থেকে প্রায় ৪০,০০০ হিন্দু ভোটার কাটিগড়ায় যুক্ত করার পর এটি এখন হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে পরিণত হয়েছে। ফলে মুসলিম প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
কাটিগড়া একা নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যটিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ খর্ব করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষক ও বিরোধীরা দাবি করছেন।
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠী: পরিসংখ্যান ও ইতিহাস
আসাম ভারতের একটি অনন্য রাজ্য, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত দেশের অন্য যেকোনো পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের তুলনায় সর্বোচ্চ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩৪.২২ শতাংশ মুসলিম। শুধুমাত্র জম্মু-কাশ্মীর এবং লাক্ষাদ্বীপে মুসলিম অনুপাত বেশি, তবে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়।
আসামের মুসলিমরা মূলত দুটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত। এক, আসামিয়া ভাষাভাষী মুসলিম, যারা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাস করেন এবং ঐতিহাসিকভাবে এই ভূখণ্ডের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। দুই, বাংলাভাষী মুসলিম, যারা বরাক উপত্যকা এবং নিম্ন আসামে বাস করেন। এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীকে ‘মিয়া মুসলিম’ নামে পরিচিত করা হয়েছে, যে শব্দটি ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রায়ই অবজ্ঞার সুরে ব্যবহার করে থাকে।

২০২৩ সালে নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে ১২৬ আসনের বিধানসভায় প্রায় ৩৫টি আসনে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, ১৪টি লোকসভা আসনের মধ্যে ছয়টিতে তাদের নির্ণায়ক ভূমিকা ছিল এবং সাধারণত ৩০ থেকে ৩১ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হতেন।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ: বিজেপির ঘাঁটিতে আসন বাড়লো, মুসলিম এলাকায় কমলো
২০২৩ সালের আগস্টে নির্বাচন কমিশন আসামের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ আদেশ প্রকাশ করে। মোট আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা হয় , ১৪টি লোকসভা ও ১২৬টি বিধানসভা আসন। কিন্তু সংখ্যার এই স্থিরতার আড়ালে ঘটে গেছে এক গভীর রদবদল। যাদের পক্ষে আসন বাড়লো, তারা বিজেপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মিত্র। আর যাদের ক্ষেত্রে কমলো, তারা মুসলিম ভোটারপ্রধান এলাকা।
বিজেপির নির্বাচনী ঘাঁটিতে আসন বৃদ্ধি:
কার্বি আংলং স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের অধীনে আসন চার থেকে বেড়ে পাঁচ হয়েছে। কার্বি আংলং আসামের একটি পার্বত্য জেলা, যেখানে মূলত কার্বি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস। বিজেপি এই অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এবং কার্বি আংলং অটোনোমাস কাউন্সিলে দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছে। একটি অতিরিক্ত আসন এই অঞ্চলে তাদের বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব আরও পোক্ত করেছে।
বোডোল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়নে (BTR) আসন ১২ থেকে বেড়ে ১৫ হয়েছে, যা একলাফে তিনটি আসন বৃদ্ধি। বোডোল্যান্ড আসামের উত্তরাংশের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যেখানে বোডো জনগোষ্ঠীর আধিপত্য। ২০২০ সালে বিজেপি বোডো পিপলস ফ্রন্টের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং সেই থেকে বোডোল্যান্ড কার্যত বিজেপির জোটের অঙ্গ হয়ে যায়। তিনটি অতিরিক্ত আসন দিয়ে এই মিত্রতাকে নির্বাচনী পুরস্কারে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

এর বিপরীতে, উপরের আসামের কিছু অসমিয়া জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত জেলায়ও একটি করে আসন বাড়ানো হয়েছে, যেখানে বিজেপি ও তার মিত্র আসম গণপরিষদ (AGP) ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় আসন হ্রাস:
বাংলাভাষী বরাক ভ্যালিতে আসন ১৫ থেকে কমে ১৩ হয়েছে, যেখানে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলায় একটি করে আসন কাটা গেছে।
বরপেটা, গোয়ালপাড়া ওয়েস্ট ও নওবৈচা, এই তিনটি মুসলিম-প্রভাবশালী আসন তফশিলি জাতি ও উপজাতি প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে, ফলে মুসলিম প্রার্থীরা এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ হারিয়েছেন।
অর্থাৎ প্যাটার্নটি অত্যন্ত স্পষ্ট — বিজেপির রাজনৈতিক মিত্র যেখানে, সেখানে আসন বেড়েছে। মুসলিম যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে আসন কমেছে বা মুসলিম প্রার্থীর পথ বন্ধ করা হয়েছে। সামগ্রিক ফলাফলে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন প্রায় ৩৫ থেকে কমে ২০-তে এসেছে এবং মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ৩০ থেকে কমে ২৩-এ দাঁড়িয়েছে।
‘কমিউনাল জেরিম্যান্ডারিং’ — তিনটি কৌশলে কীভাবে হলো?
বিশিষ্ট নির্বাচন বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এই আসাম মডেলকে ‘কমিউনাল জেরিম্যান্ডারিং’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, এটিকে ১৮শ শতকের আমেরিকার বর্ণবাদী জেরিম্যান্ডারিংয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে নির্বাচনী সীমানা বদলে প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রভাব কমানো হতো।
তিনটি কৌশল একযোগে প্রয়োগ করা হয়েছে:
ক্র্যাকিং (Cracking): মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাকে একাধিক হিন্দু-প্রধান আসনে ভাগ করে দেওয়া। নওবৈচা আসনে আগে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৪১ শতাংশ এবং সবসময় মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন। সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর মুসলিম এলাকাগুলো তিনটি আলাদা প্রতিবেশী আসনে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, ফলে এখন কোনো আসনেই মুসলিমরা নির্ণায়ক ভূমিকায় নেই।
প্যাকিং (Packing): একাধিক মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা একটিই আসনে ঢুকিয়ে দেওয়া। বরপেটার তিনটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের ধুবড়িতে ঠেলে দিয়ে সেটিকে ‘মুসলিম ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বানানো হয়েছে, আর বরপেটা হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেছে।
স্ট্যাকিং (Stacking): হিন্দু-অধ্যুষিত ছোট ছোট এলাকা একটি আসনে জুড়ে সেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা। হাইলাকান্দিতে আলগাপুর ও কাটলিছেরা থেকে হিন্দু-অধ্যুষিত পকেট কেটে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আসনটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত হয়।
জনসংখ্যার অসাম্য: মুসলিম ভোটের মূল্য কম কেন?
সীমানা পুনর্নির্ধারণে আরও একটি গভীর অসঙ্গতি আছে। উপরের আসামের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধানসভা আসনে ভোটার সংখ্যা ১.৪ লক্ষ থেকে ১.৮ লক্ষের মধ্যে। অথচ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বরপেটা জেলায় চারটি আসনে গড়ে ২.৪ লক্ষ করে ভোটার রাখা হয়েছে।
এর অর্থ হলো একজন হিন্দু-প্রধান আসনের ভোটারের ভোটের ওজন একজন মুসলিম-প্রধান আসনের ভোটারের চেয়ে কার্যত বেশি।
লোকসভা পর্যায়ে এই বৈষম্য আরও চরম। ধুবড়ি লোকসভা আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ২৬.৪৩ লক্ষ, যেখানে রাজ্যের গড় লোকসভা আসনে ১৭.৩৫ লক্ষ ভোটার। অন্যদিকে, ডিফু আসনে ভোটার মাত্র ৯ লক্ষ। কংগ্রেস নেতা গৌরব গোগোই সংসদে এই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এক আসনে ১৪ লক্ষ আর আরেকটিতে ২৬ লক্ষ, এটি সাংবিধানিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।

২০০১ বনাম ২০১১ আদমশুমারি: পুরনো তথ্য কেন ব্যবহার হলো?
এই সীমানা পুনর্নির্ধারণে ২০১১ সালের পরিবর্তে ২০০১ সালের আদমশুমারি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ জম্মু-কাশ্মীরের সীমানা পুনর্নির্ধারণে ২০১১ সালের আদমশুমারি ব্যবহার করা হয়েছিল।
কারণটি রাজনৈতিক। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্ন আসামের জেলাগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। ২০১১ সালের আদমশুমারি ব্যবহার করা হলে নিম্ন আসামে আট থেকে দশটি নতুন আসন যুক্ত হতো এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন ২২ থেকে বেড়ে ৩৪ হতো — যা বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর হতো।
বরপেটা: ইতিহাসের সঙ্গে বেইমানি
বরপেটা লোকসভা আসনটি ১৯৬৭ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর এই আসনের মুসলিম ভোটার ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
কীভাবে? বরপেটার তিনটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধানসভা কেন্দ্র — জানিয়া, বাঘবর ও চেঙাকে ধুবড়ি লোকসভা আসনে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাদের বদলে বরপেটায় যুক্ত করা হয়েছে নলবাড়ি ও ভবানীপুর-সরভোগের মতো অসমিয়া হিন্দু-প্রধান এলাকা।
বরপেটার বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে তারা বরপেটা শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে থাকেন, অথচ তাদের ধুবড়ি আসনে যুক্ত করা হয়েছে যা তাদের গ্রাম থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বরপেটায় কোনো বড় দলই মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। বিজেপির মিত্র আসম গণপরিষদের প্রার্থী ২,২২,৩৫১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে।
বরাক ভ্যালি: ১৭ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্বের সংকট
বরাক ভ্যালি আসামের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের বাংলাভাষী মুসলিমদের মূল আবাসস্থল। ১৭ লক্ষেরও বেশি মুসলিম এখানে বাস করেন। সীমানা পুনর্নির্ধারণের আগে এখানে ১৫টি বিধানসভা আসন ছিল।
আলগাপুর, হাইলাকান্দি ও কাটলিছেরায় হিন্দু ও মুসলিম পকেটগুলো এমনভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে যে আগে যেখানে তিনটি আসনে মুসলিম প্রার্থীরা জিততেন, এখন সেখানে হিন্দু ভোটাররাই নির্ণায়ক। সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর বরাক ভ্যালির মোট আসন ১৫ থেকে কমে ১৩ হয়েছে।
ধুবড়ি: মুসলিম ভোটের ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’
ধুবড়ি লোকসভা আসন এখন রাজ্যের সবচেয়ে বড় আসন — ভোটার ২৬.৪৩ লক্ষ। বরপেটার তিনটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্র ঢুকিয়ে দিয়ে এটি আরও বেশি মুসলিম-ভারী করা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এটি মূলত মুসলিম ভোটারদের একটি ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ — এখানে একটি আসন দেওয়া হয়, বিনিময়ে বাকি আসনগুলোতে তাদের প্রভাব শূন্যে নামিয়ে আনা হয়।
এমনকি বিজেপির নিজস্ব চারবারের সাংসদ রাজেন গোহাঁই অভিযোগ করেছেন যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর নগাঁও আসন বিজেপির পক্ষে জেতা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, কারণ হিন্দু ভোটার সরিয়ে সেখানে মুসলিম এলাকা যুক্ত করা হয়েছে। এই অভিযোগ তুলে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

ভৌগোলিক নিয়মের লঙ্ঘন
নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব নির্দেশিকায় বলা আছে, সীমানা নির্ধারণে ভৌগোলিক সংলগ্নতা মানতে হবে। কিন্তু আসামে বারবার এই নিয়ম ভাঙা হয়েছে:
- কাটিগড়া আসনে বরাক নদীর ওপার থেকে বাদারপুরের হিন্দু এলাকা যুক্ত করা হয়েছে
- মাঙ্গলদৈয়ে ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত নয় এমন এলাকাও একই বিধানসভায় ঢোকানো হয়েছে
- ধুবড়ি লোকসভা আসন ব্রহ্মপুত্রের দুই তীর জুড়ে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বিস্তৃত — সম্পূর্ণ এলাকা ভ্রমণে দিনের পর দিন লাগে।
বিজেপির ব্যাপক মুসলিম-বিরোধী নীতির অংশ
সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
উচ্ছেদ অভিযান: ২০১৬ সাল থেকে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘সরকারি জমি উদ্ধার’ অভিযানে ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে মোরিগাঁওয়ে প্রায় ৮,০০০ বাংলাভাষী মুসলিমকে রেলওয়ের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর, একটি মাদ্রাসা ও একটি মসজিদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
NRC ও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল: ১৯৭০-এর দশকে আসাম আন্দোলনের ফলে NRC প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৬ সালে বিজেপি ক্ষমতায় এসে এই প্রক্রিয়া জোরদার করে। আপডেটেড NRC থেকে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছেন, যাদের বড় অংশ বাংলাভাষী মুসলিম। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বিচারের ভার উল্টে দেওয়া হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় না যে কেউ বিদেশি; বরং ব্যক্তিকে নিজেই নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয়।
রাজনৈতিক বক্তৃতার সহিংসতা: ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি একটি AI-নির্মিত ভিডিও শেয়ার করে যেখানে মুখ্যমন্ত্রী শর্মাকে দুই মুসলিম ব্যক্তির ছবিতে গুলি করতে দেখা যায়, পরে সেটি মুছে ফেলা হয়। জানুয়ারি ২০২৬-এ শর্মা প্রকাশ্যে মানুষকে মিয়া মুসলিমদের ‘যেকোনো উপায়ে কষ্ট দিতে’ বলেন এবং মন্তব্য করেন যে ‘এটি আমার কাজ।’
বিজেপির স্বীকারোক্তি
এই পুনর্নির্ধারণে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে তা ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতারা নিজেরাই স্বীকার করে নিয়েছেন।
বরপেটায় নির্বাচনী প্রচারে আসামের মন্ত্রী জয়ন্ত মল্লবরুয়া প্রকাশ্যে বলেছেন, “আমরা এমনভাবে সীমানা নির্ধারণ করেছি যে ‘মিয়া’দের এবার জেতার কোনো চেষ্টা করার মানেই হয় না।”
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ “আসামের ভবিষ্যৎ দুই দশকের জন্য সুরক্ষিত করতে পারে।” তিনি আরও বলেছেন যে এই প্রক্রিয়ায় বিধানসভায় “দেশীয় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ১০৩টি আসনে নিশ্চিত হয়েছে।”
আইনি লড়াই ও বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
নয়টি বিরোধী দলের দশজন নেতা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়া ‘স্বেচ্ছাচারী’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ এবং নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক পদ্ধতি মানেনি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে অস্বীকার করেছে।
এআইইউডিএফ প্রধান আজমল বলেছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ ১০-১১টি মুসলিম আসন কমিয়ে দিয়েছে। বরপেটার সাংসদ আব্দুল খালেক বলেছেন, “তারা আহোম বনাম অ-আহোম, মুসলিম বনাম অ-মুসলিম, বাঙালি বনাম অ-বাঙালি — এই বিভাজনের রাজনীতি করছে।”
উপসংহার: ভোটের অধিকার কি শুধু কাগজে?
আসামে যা ঘটছে তার একটি সামগ্রিক ছবি দাঁড়ায় এভাবে — বিজেপির রাজনৈতিক মিত্র বোডো ও কার্বি অধ্যুষিত অঞ্চলে আসন বাড়ানো হয়েছে; অসমিয়া হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে ভোটার কম রাখা হয়েছে যাতে প্রতিটি ভোটের মূল্য বেশি থাকে; মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে ভোটার বেশি ঠেসে দেওয়া হয়েছে যাতে প্রতিটি ভোটের কার্যকর মূল্য কমে; এবং ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম-প্রতিনিধিত্বশীল আসনগুলো হয় সংরক্ষিত করা হয়েছে, না হয় হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আসাম হলো বিজেপির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতির পরীক্ষাগার। এখানে যা কাজ করেছে, জাতীয় পর্যায়ের সীমানা পুনর্নির্ধারণে সেই মডেল প্রয়োগের আশঙ্কা প্রবল।
ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের সমান ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু আসামে সেই নীতি আজ গভীর সংকটে। কাটিগড়ার ইসলাম উদ্দিন বলেছেন, “আমাদের রাজনৈতিকভাবে খোজা করা হয়েছে।” আসামের ১১ মিলিয়ন মুসলিম আজ শুধু একটি নির্বাচনের জন্য নয়, তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্যই লড়ছেন।
লিখেছেনঃ মুয়াজ বিন মুসলিম