মুসলিম পোর্ট

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের হুমকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতাও আবার পরীক্ষা হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন এবং দ্রুতগামী নৌযানের মাধ্যমে “অননুমোদিত চলাচল” বন্ধ করে কার্যত প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রণালীর সর্বনিম্ন প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল এবং নৌ চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে ২ মাইলে নেমে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বড় যুদ্ধজাহাজ সেখানে প্রবেশ করাতে পারেনি। ফলে জাহাজগুলোকে ওমান উপসাগর বা আরও দক্ষিণে অবস্থান নিতে হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে যায় এবং লজিস্টিক খরচ ও আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম বেড়ে যায়। ইরান কিছু তেলবাহী জাহাজ থেকে উচ্চ ট্রানজিট ফি দাবি করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর চলাচল বন্ধ করে দেয়। ৪০ দিনের যুদ্ধে তারা প্রণালী বন্ধ রেখে ডজনখানেক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের কিছু বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, মিনি সাবমেরিন ও মাইনের মতো অসমমিত সক্ষমতা ব্যবহার করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ আলোচনা

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রণালীতে অবরোধের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এটিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা শুরু হয়।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই আলোচনা ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেমস ডেভিড ভ্যান্স, আর ইরানের পক্ষে সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ একটি বড় প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। আলোচনা ২১ ঘণ্টা ধরে চলে এবং রাতভর অব্যাহত থাকে।

বিরোধ, অতিরিক্ত দাবি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস

আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, লেবাননে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার “অপরিবর্তনীয় প্রতিশ্রুতি” দাবি করে। ইরান জানায়, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তারা ছাড়বে না। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়।

ইরান যুদ্ধক্ষতিপূরণ না পেয়ে প্রণালী দিয়ে চলাচলের ওপর টোল আরোপের মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে প্রণালী পরিচালনার প্রস্তাব দিলেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের “অতিরিক্ত ও পরিবর্তনশীল দাবি” আলোচনার ব্যর্থতার জন্য দায়ী। কালিবাফ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখনো তেহরানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।” তিনি যুদ্ধের শুরুতে নিহত শিশুদের ছবি দেখিয়ে গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেন। আরাঘচিও বলেন, চুক্তির খুব কাছাকাছি গিয়েও অতিরিক্ত দাবির কারণে সমঝোতা সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ হুমকি

আলোচনা ভেঙে পড়ার পর ১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবরোধের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করা সব জাহাজ অবরোধ করবে। ইরানের পাতা মাইন ধ্বংস করা হবে এবং যারা ইরানকে ফি দেবে, তাদের আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকে দেওয়া হবে। যেকোনো হামলার “কঠোর পরিণতি” হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, ১৩ এপ্রিল থেকে অবরোধ কার্যকর হবে। তবে সরু জলপথে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হওয়ায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এই অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হানতে পারে, কারণ তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই প্রণালী দিয়ে হয়।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক প্রভাব

ইরান এই অবরোধকে “কাল্পনিক” বলে উল্লেখ করে। তারা হুঁশিয়ারি দেয়, সামরিক জাহাজ কাছে এলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করে, প্রণালী “মারণ ঘূর্ণিতে” পরিণত হবে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী জাহাজ আটকায়, তাহলে চীনসহ তেল আমদানিকারক দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীন প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল ইরান থেকে আমদানি করে। সরবরাহ বন্ধ হলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ১০০ ডলারের বেশি হতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতি সৃষ্টি করবে। ভারতসহ অন্যান্য দেশও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইরান যদি হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় বা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।

সবশেষে, আলোচনা ভেঙে পড়ার পর শুরু হওয়া এই নতুন পরিস্থিতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে, তবে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেই।