গত রাতে ক্রিটের উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপের মুখে পড়ে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার জাহাজগুলো। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই ফ্লোটিলা পরে ইতালির সিসিলি থেকে আরও কিছু জাহাজ যুক্ত করে এবং ২৬ এপ্রিল পুনরায় পথ ধরে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নেমে আসে দুর্যোগ।
কারা ছিলেন ফ্লোটিলায়?
ফ্লোটিলার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বহরে ৩৯টি ভিন্ন দেশের ৩৪৫ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের মধ্যে তুরস্কের নাগরিকরাও রয়েছেন। হস্তক্ষেপের ঘটনাটি গাজা থেকে কয়েকশো নটিক্যাল মাইল দূরে এবং গ্রিক আঞ্চলিক জলসীমার কাছাকাছি সংঘটিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাতের অন্ধকারে ঘেরাও
রাতের প্রথম প্রহরে জানা যায়, ফ্লোটিলার জাহাজগুলো যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে, যেগুলো ইসরায়েলের বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্রিটের পশ্চিমে গ্রিক আঞ্চলিক জলসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর এই বহরকে অবরুদ্ধ করে সামরিক নৌযান জাহাজগুলোর দিকে এগিয়ে যায়।

বহরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাহাজে থাকা সৈন্যরা নিজেদের ইসরায়েলি বলে পরিচয় দেয়। কিছু জাহাজে লেজার ও অস্ত্র তাক করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের জাহাজের সামনের অংশে হাঁটু গেড়ে বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সময় বহু জাহাজের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং জরুরি চ্যানেলগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভোরের আলোয় স্পষ্ট হয় চিত্র
ভোরের দিকে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় ২১টি জাহাজ আটক করেছে। এদিকে ১৭টি জাহাজ হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গ্রিক আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে, এবং আরও ১৪টি জাহাজ সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বলে জানানো হয়।
হস্তক্ষেপের সময় “তাম তাম” নামের একটি জাহাজ ইঞ্জিন বিকল হয়ে সাগরের বুকে আটকে যায়। তবে জাহাজে থাকা নাবিক ও কর্মীরা সুস্থ ছিলেন বলে জানা গেছে। জাহাজটিকে নিকটতম তীরে নিরাপদে নিয়ে যেতে গ্রিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

ইসরায়েলের বিবৃতিতে বলা হয়, ২০টিরও বেশি জাহাজ থেকে প্রায় ১৭৫ জন কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তবে ফ্লোটিলার কর্মকর্তারা জানান, আটককৃত জাহাজে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের সঠিক অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। যেসব জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, সেগুলোতে থাকা যাত্রীদের ভাগ্য সারাদিন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
“জলদস্যুতা” বলে নিন্দা বহর কর্তৃপক্ষের
ফ্লোটিলার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই হস্তক্ষেপকে কঠোরভাবে নিন্দা জানিয়ে একে “জলদস্যুতা” বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী গাজার উপকূল থেকে শত শত মাইল দূরে বেসামরিক নাগরিকদের বহনকারী জাহাজ আটক করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে।
বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, এই ঘটনাটি কোনো সীমান্তে নয়, বরং উন্মুক্ত সাগরে ঘটেছে। ফ্লোটিলার প্রতিনিধিরা বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার কোনো রাষ্ট্রের নেই এবং আটককৃত বেসামরিক নাগরিকদের মুক্তির দাবি জানান তারা।
১৮ তুর্কি নাগরিক আটক
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় যুক্ত তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত রাতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হামলায় ১৮ জন তুর্কি নাগরিকসহ ১৭০ জনেরও বেশি কর্মী আটক হয়েছেন।
আটককৃত ১৮ জন তুর্কি নাগরিক ও তাদের জাহাজের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো: মুস্তাফা এনেস তোপাল (সাফ সাফ), মুহাম্মদ ওজদেম (সাফ সাফ), আলি দেনিজ (এস্পলাই), ইউনুস কাভা (এস্পলাই), শাহিন ইয়াসলিক (সাফ সাফ), মুস্তাফা আরসলান (সাফ সাফ), আবদুলসেলাম দেমির (ফ্রেইয়া), নেভজাত ওয়লেক (এস্পলাই), নেভজাত গুজেল (ফ্রেইয়া), হালিল এরদোউমুশ (এস্পলাই), আবদুল্লাতিফ ফাসলি (ফ্রেইয়া), হুসেইন শুয়াইব অর্দু (সাফ সাফ), মাহমুত আকাই (সাফ সাফ), গোরকেম দুরু (ঘেয়া), মেহমেত আতলি (ঘেয়া), মুকরেমিন কোসে (ফ্রেইয়া), রামাজান তেকদেমির (ফ্রেইয়া) এবং মাহমুত চাগাতাই ইয়াভুজ (ইরোস ১)।
তুরস্কের তীব্র প্রতিক্রিয়া
তুরস্কের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতেও এই হস্তক্ষেপকে “জলদস্যুতার কাজ” বলে অভিহিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গঠিত গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার উপর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি বাহিনীর এই হামলা একটি জলদস্যুতামূলক কার্যক্রম।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস বুয়েনোর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর বেআইনি হস্তক্ষেপ নিয়ে মতবিনিময় হয়।
প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরান ও সংসদ স্পিকার কুর্তুলমুশ এই হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন। জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, এই হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সবচেয়ে দীর্ঘ উপকূলরেখার অধিকারী দেশ হিসেবে তুরস্ক পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, “আগের মতোই মানবিক সহায়তা ও সমর্থনের কাঠামোর মধ্যে তুর্কি সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিচার মন্ত্রণালয় কাজ করছে এবং ইস্তাম্বুল প্রধান সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় ইসরায়েলের আগের হামলার বিষয়ে আইনি কার্যক্রম শুরু করেছে।
গ্রিসের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
এই ঘটনার পর গ্রিসের অবস্থান নিয়েও বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হস্তক্ষেপটি গ্রিক আঞ্চলিক জলসীমার অত্যন্ত কাছে সংঘটিত হওয়ায় কিছু কর্মী এথেন্স সরকারের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। গ্রিসের কিছু কর্মী গোষ্ঠী দাবি করেছে, জাহাজগুলো থেকে বিপদসংকেত পাঠানো সত্ত্বেও কোস্টগার্ড পর্যাপ্ত সাড়া দেয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন দেশে রাজনীতিক ও কর্মী গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজ আটকে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে। সারাদিন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আটককৃত কর্মীদের পরিস্থিতি এবং সাগরে আটকে থাকা জাহাজগুলোর নিরাপত্তা।
বহর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু জাহাজের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং গ্রিক আঞ্চলিক জলসীমায় পৌঁছে যাওয়া জাহাজগুলো দ্বিতীয় দফা হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
এই সংকট কেবল গাজায় মানবিক সহায়তার প্রচেষ্টাকেই আবার আলোচনার সামনে নিয়ে আসেনি, বরং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌচলাচলের স্বাধীনতা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ভূমধ্যসাগরে এখতিয়ারগত বিরোধ নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।