সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়েছে আরব দেশগুলো, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অন্যদিকে, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা, বিমানবন্দরের কর্মী ও যাত্রীদের সতর্ক করেছে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী যারা আনসারুল্লাহ আন্দোলন নামেও পরিচিত, গত ১১ অক্টোবর তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থা, বিমানবন্দরের কর্মী ও যাত্রীদের প্রতি পুনরায় সতর্কবার্তা দিয়েছে। নিজেদের হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গোষ্ঠীটি বলেছে, হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।
এর আগে ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। পরে আহত এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়ায়। ১১ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে নতুন করে হামলার ঘটনায় আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
পরপর হামলা এবং বেসামরিক বিমান চলাচলকে কেন্দ্র করে দেওয়া হুথিদের হুমকি সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা, উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

আরব বিশ্বে নিন্দা ও সংহতি
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর কাতার, মিসর, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক আরব দেশ এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশগুলোর বক্তব্যে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে রিয়াদের নিরাপত্তা রক্ষায় সৌদি সরকারের নেওয়া বৈধ পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দোহা। কাতারের মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
এদিকে মিসর হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। জর্ডান একে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং দেশটির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছে। বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সতর্ক করেছে, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আকাশপথে যাতায়াতের জন্য সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইরাক সামরিক তৎপরতা সম্পূর্ণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফিলিস্তিন সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। সিরিয়া হামলার নিন্দা জানিয়ে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন সিরীয় নাগরিকও রয়েছেন।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ মোহাম্মদ আল-আলিমি বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের নিরাপত্তা এবং দুই দেশের জনগণের স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ওপর হামলা ইয়েমেনের নিরাপত্তা ও স্বার্থকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
আরব লীগ হুথিদের ধারাবাহিক হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই রিয়াদ বিমানবন্দরে পুনরায় হামলাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করে বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কঠোর অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নিজেদের রক্ষার সক্ষমতা সৌদি আরবের রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও হামলার নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছেন, নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোতে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ হামলাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, এ ধরনের আক্রমণ সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে এবং ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন হামলাটিকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, পরিবহনকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি—যাঁর পদবি ইংরেজিতে জন ওয়েড স্ট্রিটিং নয়, বরং জন হিলি—হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তারের আশঙ্কা
রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার তাৎপর্য শুধু হতাহতের সংখ্যা কিংবা সৌদি আরবের নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিপন্ন করে। পাশাপাশি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হুমকি বাস্তবায়িত হলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা ও কূটনৈতিক সংহতি কতটা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বিস্তার ঠেকানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায় এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত করে। ফলে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জোরদার করাও জরুরি। অন্যথায়, এই সংকট সৌদি আরব ও ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।