কোয়াডকপ্টার ড্রোনঃ গাজার আকাশে ভেসে বেড়ানো মৃত্যুদূত
যুদ্ধ মানেই গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমান; এমন ধারণাই দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। এখন আকাশে উড়ে বেড়ানো ছোট একটি ড্রোনও মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইজরায়েলের ব্যবহৃত কোয়াডকপ্টার ড্রোন সেই বাস্তবতারই একটি ভয়ংকর উদাহরণ। একসময় মূলত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত এসব ড্রোন এখন বেসামরিক মানুষের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের কাছে এই ড্রোন এখন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকার এক নির্মম বাস্তবতার নাম। বাড়ির সামনে, সরু গলিতে, ধ্বংসস্তূপের পাশে কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাইরে বের হলেও কখন আকাশ থেকে হামলা নেমে আসে, সেই আতঙ্ক তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা এখানে শুধু বোমা হামলা কিংবা গোলাবর্ষণের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই; বরং মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনও পরিণত হয়েছে মৃত্যুর ঝুঁকিতে।
কোয়াডকপ্টার ড্রোন কী এবং কেন এতো ভয়ংকর?
কোয়াডকপ্টার হলো একধরনের ছোট চালকবিহীন উড়োজাহাজ, যা সাধারণত চারটি রোটরের সাহায্যে আকাশে উড়ে। দূর থেকে একজন অপারেটর এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এতে উন্নত ক্যামেরা ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তি যুক্ত করা সম্ভব। ফলে মাটিতে অবস্থান না করেও দূর থেকে মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা যায়। সামরিক বাহিনী এসব ড্রোন ব্যবহার করে কোনো এলাকার পরিস্থিতি দেখা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অনুসরণ করা এবং সামরিক অভিযানের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
কিন্তু গাজায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নজরদারির পাশাপাশি কোয়াডকপ্টার থেকে সরাসরি গুলি চালানো হচ্ছে। ছোট আকারের হওয়ায় এসব ড্রোন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সরু গলি, বাড়ির আশপাশ কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের কাছাকাছি উড়তে পারে। ফলে প্রচলিত যুদ্ধবিমানের তুলনায় এগুলো অনেক নিচু দিয়ে মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করতে সক্ষম। মানুষের গতিবিধি অনুসরণ করে হামলা চালানোর এই সক্ষমতা গাজার বেসামরিক জনগণের মধ্যে নতুন ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে।
দৈনন্দিন জীবনেও মৃত্যুর ভয়
গাজায় মানুষের জীবন আগে থেকেই অবরোধ, খাদ্যসংকট, চিকিৎসাসেবার অভাব এবং অবিরাম হামলার কারণে বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোয়াডকপ্টার ড্রোনের ভয়। পানি সংগ্রহ করতে যাওয়া শিশু, রান্নার জন্য কাঠ কুড়ানো মানুষ কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে বাইরে বের হওয়া পরিবারের সদস্যদেরও হামলার ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
সাধারণত যুদ্ধের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা বাড়ির ভেতরে থেকে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু গাজার বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। সেখানে বাড়ির ভেতরে থাকলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। আকাশে ড্রোনের শব্দ শোনা গেলে মানুষ বুঝতে পারে না, সেটি কেবল নজরদারি করছে, নাকি যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালাতে পারে। ফলে শিশু থেকে বৃদ্ধ; সবার মধ্যে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক।
এভাবে ড্রোনের ব্যবহার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে বেঁচে থাকা, স্বাভাবিকভাবে বাইরে যেতে না পারা এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে। অর্থাৎ, এই প্রযুক্তির ভয়াবহতা শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতাকেও ধ্বংস করছে।
চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার
গাজায় কোয়াডকপ্টার ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ। গাজায় বিভিন্ন সামরিক সীমারেখা ও নিয়ন্ত্রিত এলাকার কারণে ফিলিস্তিনিদের চলাচল এমনিতেই সীমিত। এর সঙ্গে ড্রোনের নজরদারি ও হামলার আশঙ্কা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাড়িতে ফিরে যাওয়া, কৃষিজমিতে কাজ করা কিংবা ত্রাণ সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় কাজেও মানুষকে ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। কোনো এলাকায় প্রবেশ করলে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মানুষ সেখানে যেতে ভয় পায়। এভাবে সরাসরি হামলার পাশাপাশি হামলার ভয়ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের একটি উপায়ে পরিণত হতে পারে।
গাজার কথিত ‘ইয়েলো লাইন’ ও ‘অরেঞ্জ লাইন’-এর মতো সামরিক সীমারেখা ঘিরে ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব সীমারেখার কাছাকাছি যাওয়া কিংবা নিজেদের বাড়ি ও জমিতে ফেরার চেষ্টা করা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মানুষ ক্রমেই সীমিত পরিসরে আটকে পড়ছে এবং নিজেদের জীবন ও জীবিকা পরিচালনার সুযোগ হারাচ্ছে।
ভাইয়ের মরদেহও উদ্ধার করতে পারেননি হুসনি
কোয়াডকপ্টার ড্রোনের ভয়াবহতা বোঝার জন্য জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা হুসনি হিজাজি ও তাঁর ভাই মুহাম্মদ হিজাজির ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ভাই নিজেদের বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় একটি কোয়াডকপ্টার তাঁদের অনুসরণ করতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ড্রোন থেকে চালানো গুলিতে মুহাম্মদ হিজাজি নিহত হন। হামলা থেকে বেঁচে গেলেও হুসনি আরেকটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এলাকায় ড্রোনের অব্যাহত নজরদারি ও নতুন করে হামলার আশঙ্কার কারণে তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নিজের ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি যুদ্ধের মধ্যে মানুষের অসহায়ত্বের একটি নির্মম চিত্র। সাধারণ পরিস্থিতিতে কোনো মানুষ মারা গেলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা অন্তত মরদেহ উদ্ধার করে শেষবারের মতো দেখতে পারেন এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু গাজায় হামলার আশঙ্কা সেই সুযোগটুকুও কেড়ে নিচ্ছে।
একজন মানুষকে হত্যা করার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করতে না দেওয়া কিংবা স্বজনদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ হারিয়ে ফেলা মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তোলে। যুদ্ধের এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সহিংসতার শিকার মানুষের ক্ষতি শুধু মৃত্যুর মধ্যেই শেষ হয় না; এর প্রভাব তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধের আশঙ্কা
গাজায় দখলদার ইজরায়েলি হামলার ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর, আহত শিশু, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং চিকিৎসাসেবার সংকটের চিত্র সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপরও ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে।
যদি কোনো সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে উদ্ধারকর্মীরা যদি আহত মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তাহলে উদ্ধার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।
এখানে উদ্বেগের বিষয় হলো, ড্রোনের মাধ্যমে শুধু মানুষের জীবনই বিপন্ন হচ্ছে না; বরং সেই জীবনহানির ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার কাজটিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রেও বড় বাধা তৈরি হতে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যুদ্ধকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো অস্ত্র দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিংবা উন্নত ক্যামেরার সাহায্যে লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব—এসব বৈশিষ্ট্য নিজে থেকেই তার ব্যবহারকে বৈধ করে না।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা, বেসামরিক জনগণকে সরাসরি হামলা থেকে রক্ষা করা এবং সামরিক অভিযানে আনুপাতিকতার নীতি মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কোনো হামলায় বেসামরিক মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা নির্বিচার হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ কারণে কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মাধ্যমে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার অভিযোগগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। হামলার প্রকৃতি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সামরিক উদ্দেশ্যের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। অস্ত্র যত আধুনিকই হোক না কেন, তার ব্যবহারকারীরা আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে নন।
আসলে গাজায় কোয়াডকপ্টার ড্রোনের ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের এমন একটি দিক সামনে এনেছে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আতঙ্ক, নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ছোট আকারের একটি ড্রোনের উপস্থিতি মানুষের বাড়ি, রাস্তা, কর্মস্থল কিংবা আশ্রয়স্থল—কোনোটিকেই নিরাপদ বলে অনুভব করতে দিচ্ছে না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। শিশুরা নিরাপদে পানি সংগ্রহ করতে পারছে না, পরিবারগুলো নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারছে না, স্বজনেরা নিহত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করতে পারছেন না, আর সাংবাদিকেরা ঝুঁকি নিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরছেন।
প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখে, যখন তা মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। সেই প্রযুক্তি যদি বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার কিংবা তাঁদের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা জরুরি। গাজার আকাশে ঘুরে বেড়ানো কোয়াডকপ্টার তাই কেবল একটি যুদ্ধাস্ত্রের নাম নয়; এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক আইনের কার্যকর প্রয়োগ, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কারণ যুদ্ধের ময়দানেও মানুষের জীবন ও মর্যাদার মূল্য অস্বীকার করা যায় না।