মক্কা থেকে বদর চুক্তি: মুসলিম বিশ্বে প্রতিরক্ষা জোটের নতুন ধাপ কি মক্কার-ই ব্যর্থতা নাকি কৌশলগত সম্প্রসারণ
বুধবার (২১ অক্টোবর) দোহায় তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া “বদর সমঝোতা স্মারক” সই করেছে। এর আওতায় যৌথ সমরাস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণা ও উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। গত আগস্টে সই হওয়া মক্কা চুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই এই উদ্যোগ আসায় প্রশ্ন উঠেছে, মক্কা কি ব্যর্থ হলো বলেই বদরের প্রয়োজন পড়ল?
আসলে মক্কা চুক্তি মূলত একটা নিরাপত্তা-গ্যারান্টি। এর আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা বলে গণ্য হবে। বদর স্মারকে তা নেই। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার কোনো অঙ্গীকার নেই। একটি জোট সামরিক সুরক্ষার, অন্যটি শিল্প ও প্রযুক্তির। এক চুক্তির ফাঁক পূরণ করতে অন্যটি আসেনি; দুটির লক্ষ্য আলাদা।
নিরাপত্তা-গ্যারান্টি
একের ওপর হামলা = সবার ওপর হামলা
সামরিক সুরক্ষার জোট
শিল্প ও প্রযুক্তি সহযোগিতা
- যৌথ সমরাস্ত্র উৎপাদন
- প্রযুক্তি হস্তান্তর
- গবেষণা ও উন্নয়ন
পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার নেই
তাহলে মক্কা কি সত্যিই ব্যর্থ? যদিও বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ উল্টো ইঙ্গিত দেয়। সৌদি আরবে হুথি হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, মক্কা চুক্তি বাস্তবায়নের সময় এসেছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছিল, আরও ছয়-সাতটি মুসলিম দেশ যোগ দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও চুক্তিতে আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। তবে এখানে একটি সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতেই হবে: চুক্তিটি এখনো বাস্তব যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে পরীক্ষিত হয়নি। কার্যকারিতার প্রমাণও তাই আপাতত অপেক্ষমাণ। কেননা, জোটের সদস্যরা কিছু অবধারিত সংঘাতের মুখে অনেকটা পিঠ বাঁচাতেই যেন চুক্তিটি করেছিল, ফলে যা হওয়ার তাই হলো।
এজন্য মক্কা চুক্তির প্রাথমিক হোঁচটের প্রেক্ষিতেই কি বদর চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ধরনের দ্বিস্তরীয় কাঠামো নতুন নয়। ন্যাটো যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়, আর ইউরোপীয় দেশগুলো আলাদাভাবে যৌথ অস্ত্র উৎপাদনে সহযোগিতা করে। একই রাষ্ট্র দুই স্তরেই অংশ নেয়। তুরস্ক এখানে সেই পথই নিয়েছে: নিরাপত্তা-গ্যারান্টির জন্য মক্কা, শিল্পভিত্তির জন্য বদর।
এর পেছনে “যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভয়”-এর হিসাবও থাকতে পারে। বাধ্যতামূলক সামরিক অঙ্গীকার রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল। তাই কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের জন্য শিল্প ও প্রযুক্তিভিত্তিক সহযোগিতা তুলনামূলক নিরাপদ প্রবেশদ্বার। আবার কাতারে আগে থেকেই তুরস্কের একটি সামরিক ঘাঁটি আছে, ফলে সম্পর্কটি নতুন কিছু নয়, বরং আরও গভীর হলো।
এদিকে বৃহত্তর ভূরাজনীতির প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের মত, মক্কা চুক্তি ইরান যুদ্ধের পর সৃষ্ট অস্থিরতায় অবস্থান নতুন করেই যেন সাজানোর চেষ্টা। আর বদর সেই প্রবণতাকে ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। উদ্যোগটির লক্ষ্য উপসাগর থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রতিরক্ষা ও শিল্প নেটওয়ার্ক গড়া। এতে মধ্যশক্তিগুলো পশ্চিমা অস্ত্র-সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে এগোতে পারে। এটি বহুমুখী জোটের মাধ্যমে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার, অর্থাৎ “হেজিং”-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ।
স্মারকের চতুর্থ স্বাক্ষরকারী: তুরস্ক
তাই বদর চুক্তিকে এখনই মক্কার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হিসেবে ধরা যায় না; বরং নিরাপত্তার পাশাপাশি স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও হতে পারে। মক্কার আসল পরীক্ষা হবে বাস্তব সংকটে, আর বদরের পরীক্ষা হবে কাগজের প্রতিশ্রুতি বাস্তব উৎপাদনে রূপ নেয় কি না, তার ওপর।
লিখেছেনঃ মুশফিকুর রহমান